বাড়ির ছোট্ট সন্তানের মতোই তিনি ঘরে ঘরে যত্নে পালিত হন। তিনি ননীচোরা, তিনি আনন্দঘন গোপাল। তাঁর সেবাতেই আত্মনিমগ্ন ভক্তের পরাণপ্রিয়া। শ্রীকৃষ্ণের চরণে ভক্তির অর্ঘ্য হিসেবে বহু যুগ ধরে ভক্তরা নিবেদন করে আসছেন ছাপ্পান্ন ভোগ। কিন্তু এই ছাপ্পান্ন পদের নেপথ্যে শুধুই কি রন্ধনশৈলীর বৈচিত্র? কী বলছে শাস্ত্র?
ছবি: সংগৃহীত
৫৬ ভোগের শুরুর কথা
শ্রীকৃষ্ণের এই মহাভোগের ইতিহাস জড়িয়ে আছে দ্বাপর যুগের এক অনন্য লীলার সঙ্গে। পুরাণকথা অনুযায়ী, দেবরাজ ইন্দ্রের কোপ থেকে ব্রজবাসীদের রক্ষা করতে গোবর্ধন পর্বত তুলে ধরেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। টানা সাত দিন ধরে নিজের কনিষ্ঠা আঙুলে ধারিত ছিল সেই বিশাল পর্বত। ব্রজধামে যশোদা মাতা প্রতিদিন তাঁর আদরের গোপালকে আট বার খাদ্য নিবেদন করতেন। যাকে শাস্ত্রীয় ভাষায় বলা হয় 'অষ্টপ্রহর অন্নভোগ'। কিন্তু সেই দুর্যোগের সাত দিন এক বিন্দু খাদ্যও গ্রহণ করেননি কনিষ্ঠ গোপাল।
ঝড়-ঝঞ্ঝা থামার পর যখন সংকট কাটল, তখন ভক্ত হৃদয়ের অপার আনন্দে ব্রজবাসীরা হিসেব মেলাতে বসলেন। সাত দিনের আট বেলার হিসেব (৭ × ৮ = ৫৬) কষে তাঁরা তৈরি করলেন ছাপ্পান্ন রকমের সুস্বাদু পদ। প্রেম ও বাৎসল্য রসের সেই যুগলবন্দি আজও অটুট। সেই থেকে ভাদ্রমাসের শুভ তিথিতে ছাপ্পান্ন ভোগের প্রথা প্রবাহিত হয়ে চলেছে।
ছবি: সংগৃহীত
ভোগ নিবেদনের শাস্ত্রীয় নিয়ম
পঞ্জিকা মতে, চলতি ২০২৬ সালে আগামী ৪ সেপ্টেম্বর, শুভ শুক্রবারে উদযাপিত হতে চলেছে শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র জন্মাষ্টমী। রোহিণী নক্ষত্র ও অষ্টমী তিথির এক মহীয়সী মাহেন্দ্রযোগে মধ্যরাতে অনুষ্ঠিত হবে দেবকীনন্দনের আরাধনা। তবে এই ছাপ্পান্ন ভোগ নিবেদনে কিছু কঠোর শাস্ত্রীয় নিয়ম পালন করা আবশ্যিক।
সাত্ত্বিক শুদ্ধতা: ভোগের সমস্ত পদ হতে হবে সম্পূর্ণ নিরামিষ ও তামসিকতা মুক্ত। পেঁয়াজ ও রসুনের স্পর্শ স্পর্ধার শামিল। খাঁটি গাওয়া ঘিয়ে তৈরি রন্ধনই এখানে শ্রেষ্ঠ নৈবেদ্য।
তুলসীদল সংযোগ: তুলসীপত্র ছাড়া সর্বেশ্বর কৃষ্ণ কোন শুভ ভোগ গ্রহণ করেন না। তাই প্রতিটি পদে একটি করে তুলসীদল অর্পণ করা বাধ্যতামূলক।
পবিত্র পাত্র: সোনা, রুপো, কাঁসা, পিতল, তামা কিংবা মৃৎপাত্রে এই ভোগ নিবেদন করুন। প্লাস্টিক বা স্টিলের বাসন নৈবেদ্যর অযোগ্য।
একান্ত সেবা ও প্রসাদ বণ্টন: পাশে জলপাত্র রেখে ঘণ্টা বাজিয়ে প্রভুকে আহ্বান জানান। ভোগের সময় ৫-১০ মিনিট পর্দা দিয়ে অন্তরাল সৃষ্টি করুন, যাতে ননীচোরা নিভৃতে ভোগ গ্রহণ করতে পারেন। এরপর নৈবেদ্য সরিয়ে নিয়ে সর্বজনের মাঝে প্রসাদ রূপে বিলি করে দিন।
