পঞ্জিকা অনুযায়ী, এ বছর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি দু’দিন ব্যাপী বিস্তৃত। জন্মাষ্টমী ব্রত ও উৎসব পালিত হবে আগামী ৪ সেপ্টেম্বর। দিনটি কেবল এক পৌরাণিক স্মৃতির উদ্যাপন নয়, বরং পরমাত্মার প্রতি জীবাত্মার আত্মসমর্পণ। কলিযুগের উদ্বেগ ও অশান্তির মধ্যে ভগবানের এই আবির্ভাব-বার্তা কীভাবে আজও মানবজাতিকে শাশ্বত মুক্তির পথ দেখায়, তা নিয়ে লিখছেন ভক্তিবেদান্ত রিসার্চ সেন্টারের ডিন ড. সুমন্ত রুদ্র।
শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল মধ্যরাতে, এক কারাগারে, এমন এক সময়ে যখন ভয় ও অন্যায় সমাজকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। অথচ সেই অন্ধকার রাতই হয়ে উঠেছিল পরম এক মুহূর্ত, যখন পরমেশ্বর ভগবান আবির্ভূত হয়েছিলেন। এটিই জন্মাষ্টমীর চিরন্তন তাৎপর্য। যখন অন্ধকার সবচেয়ে গভীর মনে হয় এবং মানুষের সকল সম্ভাবনা ম্লান হয়ে আসে, তখন আবির্ভূত হন স্বয়ং পরমেশ্বর।
ফাইল ছবি
কংসের অত্যাচারের মধ্যে দেবকী ও বসুদেবের ঘরে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল। তাঁর জন্মের সঙ্গে ছিল না কোনও পার্থিব আরাম বা নিরাপত্তা। বরং তা ঘটেছিল বিপদ ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই। অথচ সেই কারাগার থেকেই শুরু হয়েছিল এমন এক যাত্রা, যা সহস্রাব্দ ধরে ভারতের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক কল্পনাকে রূপ দিয়েছে এবং মানবতার জন্য এমন এক বার্তা রেখে গেছে, যার অনুরণন আজও রয়েছে।
শতাব্দী পরে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই প্রেমকে জাগ্রত ও বিতরণ করার জন্য আবির্ভূত হন। কৃষ্ণের পবিত্র নামের সংকীর্তনের মাধ্যমে তিনি কৃষ্ণভক্তিকে মানুষের ঘরে ও সমাজের পথে নিয়ে আসেন এবং সকলের জন্য দিব্যপ্রেমের পথকে সহজলভ্য করে তোলেন। এই অর্থে কৃষ্ণের আবির্ভাব এবং শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব একটি মহান আধ্যাত্মিক কাহিনির দুই পর্ব—পরমেশ্বর স্বয়ং আবির্ভূত হন এবং পরে সেই একই ভগবান মানবতাকে তাঁর বিস্মৃত প্রেম পুনরায় আবিষ্কার করতে শিক্ষা দেন।
শ্রীকৃষ্ণের জীবন শিক্ষা দেয় যে কেবল শক্তি দিয়ে অশুভকে পরাজিত করা যায় না; এর জন্য প্রয়োজন সাহস, জ্ঞান ও ধর্মনিষ্ঠা। কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে তিনি অর্জুনকে তাঁর কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন এবং ভয় বা ফলের প্রতি আসক্তিতে পক্ষাঘাতগ্রস্ত না হয়ে স্বচ্ছতা ও স্থিরতার সঙ্গে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ফাইল ছবি
কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ কেবল ভগবদ্গীতার শিক্ষক নন। তিনি বৃন্দাবনের কৃষ্ণ—যশোদার সন্তান, গোপবালকদের বন্ধু এবং তাঁর ভক্তদের প্রিয়তম। এখানেই কৃষ্ণের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ রূপ প্রকাশ পায়। কৃষ্ণপ্রেম—শ্রীকৃষ্ণের প্রতি নির্মল প্রেম—ভক্তির হৃদয়।
শতাব্দী পরে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই প্রেমকে জাগ্রত ও বিতরণ করার জন্য আবির্ভূত হন। কৃষ্ণের পবিত্র নামের সংকীর্তনের মাধ্যমে তিনি কৃষ্ণভক্তিকে মানুষের ঘরে ও সমাজের পথে নিয়ে আসেন এবং সকলের জন্য দিব্যপ্রেমের পথকে সহজলভ্য করে তোলেন। এই অর্থে কৃষ্ণের আবির্ভাব এবং শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব একটি মহান আধ্যাত্মিক কাহিনির দুই পর্ব—পরমেশ্বর স্বয়ং আবির্ভূত হন এবং পরে সেই একই ভগবান মানবতাকে তাঁর বিস্মৃত প্রেম পুনরায় আবিষ্কার করতে শিক্ষা দেন।
আজ এই ঘটনার তাৎপর্য বিশেষভাবে গভীর। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে বস্তুগত উন্নতি অভূতপূর্ব, অথচ ভয়, সংঘাত, একাকীত্ব ও উদ্বেগ এখনও মানবজীবনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। জন্মাষ্টমী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে গভীরতম সংকট কেবল আমাদের বাইরের জগতে নয়। সংকট হল আমাদের আধ্যাত্মিক পরিচয় এবং শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে আমাদের চিরন্তন সম্পর্ককে ভুলে যাওয়া। তাই কৃষ্ণের আবির্ভাব কেবল অতীতের কোনও ঘটনা নয়। এটি চিরন্তন তাৎপর্যের এক ঘটনা—পরমেশ্বর ভগবানের আবির্ভাব এবং মানবজীবনের সর্বোচ্চ সম্ভাবনা, অর্থাৎ ঈশ্বরের প্রতি প্রেমের প্রকাশ।
ফাইল ছবি
জন্মাষ্টমী তাই কেবল হাজার হাজার বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি জন্মের স্মরণ নয়। এটি এক চিরন্তন সত্যের উদযাপন। কৃষ্ণ নিজেকে প্রকাশ করতে এবং তাঁর সঙ্গে আমাদের বিস্মৃত সম্পর্ককে জাগ্রত করতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। জন্মাষ্টমীর প্রকৃত প্রশ্ন কেবল এই নয় যে আমরা কৃষ্ণের জন্মকে স্মরণ করি কি না, বরং আমাদের নিজেদের হৃদয়ে কৃষ্ণের প্রতি প্রেম জন্ম নিতে পেরেছে কি না। এটিই সেই আত্মবিশ্লেষণের শ্রেষ্ঠ সম্ভাবনা।
