আজ শ্রাবণের শেষ সোমবার। শিবের আরাধনায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যখন মন্দিরে মন্দিরে ভক্তদের ঢল, তখন তামিলনাড়ুর এক প্রাচীন মন্দিরও নজর কাড়ে তার বিশেষ বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের জন্য। রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তির আশায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভক্তরা এখানে এসে প্রার্থনা করেন।
কোনও অসুখ থেকে মুক্তির আশায় আমরা সাধারণত চিকিৎসকের কাছে যাই। কিন্তু ভারতের এক প্রাচীন মন্দির, যেখানে অসুস্থতা থেকে আরোগ্যের প্রার্থনা জানাতে ভক্তদের ভিড় জমে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। তামিলনাড়ুর বৈদ্যেশ্বরন কোইল (Vaitheeswaran Koil Temple) তাই শুধু একটি মন্দির নয়, বিশ্বাস, পুরাণ ও প্রাচীন ঐতিহ্যের এক অনন্য মিলনস্থল।
মন্দিরটি উৎসর্গীকৃত ভগবান শিবের বিশেষ রূপ বৈদ্যনাথ বা বৈদ্যেশ্বরকে। ‘বৈদ্য’ শব্দের অর্থ চিকিৎসক বা আরোগ্যদাতা। সেই থেকেই প্রচলিত বিশ্বাস, বৈদ্যনাথ ভক্তদের রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তি দিতে পারেন। শারীরিক অসুস্থতা থেকে মুক্তি, সুস্বাস্থ্য এবং মঙ্গল কামনায় বহু মানুষ আজও এই মন্দিরে পুজো দিতে আসেন।
পবিত্র জলাধার। ছবি: সংগৃহীত
পবিত্র জলে স্নান, আরোগ্যের বিশ্বাস
বৈদ্যেশ্বরন কোইলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ সিদ্ধামৃতম তীর্থম। মন্দিরের এই পবিত্র জলাধারে ভক্তরা স্নান করেন। প্রচলিত বিশ্বাস, এই জলের রয়েছে বিশেষ আরোগ্যদায়ী ক্ষমতা। সেই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই বহু মানুষ এখানে এসে পবিত্র জলে স্নান করে দেবতার কাছে সুস্থতার প্রার্থনা করেন।
মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিভূতি এবং নানা প্রাচীন ধর্মীয় আচারও। ভক্তরা বিশ্বাসের সঙ্গে সেই আচার পালন করেন এবং নিজেদের বা প্রিয়জনের সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেন।
মঙ্গলও নাকি পেয়েছিল রোগমুক্তি!
এই মন্দিরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কাহিনিগুলির একটি জড়িয়ে রয়েছে অঙ্গারক বা মঙ্গল গ্রহের সঙ্গে। মন্দিরের পুরাণকথা অনুযায়ী, একসময় অঙ্গারক কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। পরে তিনি এই স্থানে এসে ভগবান শিবের আরাধনা করেন এবং তাঁর আশীর্বাদে রোগমুক্ত হন।
এই পুরাণকথাই বৈদ্যেশ্বরন কোইলের সঙ্গে আরোগ্যের বিশ্বাসকে আরও গভীরভাবে যুক্ত করেছে বলে মনে করা হয়। ফলে রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তি এবং সুস্থ জীবনের কামনায় আজও বহু ভক্ত এখানে প্রার্থনা করেন।
বৈদ্যেশ্বরন কোইল। ছবি: সংগৃহীত
নুন, গোলমরিচ, গুড়েও রয়েছে বিশেষ বিশ্বাস
মন্দিরের কিছু ধর্মীয় আচারও বেশ ব্যতিক্রমী। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক সমস্যার থেকে মুক্তির কামনায় ভক্তরা নুন, গোলমরিচ ও গুড় নিবেদন করেন। এই প্রথাগুলি মূলত স্থানীয় ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকাচারের অংশ এবং বহুদিন ধরে চলে আসছে।
শুধু পুজো নয়, বৈদ্যেশ্বরন কোইল আরও একটি কারণে বিখ্যাত। তা হল জ্যোতিষ। প্রাচীন তালপাতার পুঁথিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই বিশেষ ঐতিহ্যে মানুষের জীবন, অতীত এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নানা তথ্য জানার চেষ্টা করা হয়। এই প্রাচীন পদ্ধতির টানেও বহু মানুষ মন্দির সংলগ্ন এলাকায় আসেন।
বিশ্বাসের জায়গা, চিকিৎসার বিকল্প নয়
তবে এই মন্দিরকে ঘিরে থাকা আরোগ্যের দাবিগুলিকে ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের জায়গা থেকেই দেখা প্রয়োজন। সিদ্ধামৃতম তীর্থমের জল, বিভূতি, নুন, গোলমরিচ বা গুড়ের মতো ধর্মীয় আচার রোগ সারাতে পারে, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
কোনও অসুস্থতা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষের মনে ভরসা ও মানসিক শান্তি দিতে পারে, কিন্তু চিকিৎসার বিকল্প নয়।
তবু ইতিহাস, পুরাণ, আধ্যাত্মিকতা এবং বহু প্রজন্মের বিশ্বাসকে একসঙ্গে ধারণ করে থাকা বৈদ্যেশ্বরন কোইল নিঃসন্দেহে ভারতের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাচীন তীর্থস্থান। এখানে এসে কেউ খোঁজেন আরোগ্যের আশীর্বাদ, কেউ খোঁজেন আধ্যাত্মিক শান্তি, আবার কারও কাছে এই মন্দিরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তার শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস ও রহস্যময় ঐতিহ্য।
