বারবার বাধায় জরুরি কাজ আর হচ্ছিল না। তবে ২৮ বছর পর বাধা কেটে গেল। নিখুঁত তথ্য-সহ আমেরিকার হাতে সমাধানসূত্র তুলে দিলেন এক বাঙালি তরুণ। ১৭ মাসের গবেষণায় আমেরিকার বিস্তীর্ণ লাল কাঠের জঙ্গল সম্পর্কে হুগলির (Hooghly) শুভম বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৈরি তথ্যপঞ্জি গ্রহণ করল হোয়াইট হাউস। তা প্রকাশিত হয়েছে ব্রিটিশ পত্রিকায়। শুভমই মূলত এই গবেষণা চালিয়েছেন। তাঁর সহযোগী ছিলেন দুই মার্কিন তরুণ এমিলি ফ্রান্সিস এবং কলিন। এত বড় সাফল্যের পর ট্রাম্প প্রশাসন তাঁকে আরও বেশি কাজ করতে আগ্রহী। ফেব্রুয়ারিতে আবারও আমেরিকা পাড়ি দিতে পারেন শুভম।
বিষয়টা ঠিক কী? কোন কাজের জন্য আমেরিকায় এত জয়জয়কার হুগলির (Hooghly) ছেলের? কাজ অতি গুরুত্বপূর্ণ। প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলবর্তী অঞ্চলে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কলোরাডো বা ওরেগন জুড়ে রয়েছে লাল কাঠের জঙ্গল, পোশাকি নাম ‘কোস্ট রেডউড’। মহামূল্যবান এই লাল কাঠের উপর নজর পাচারকারীদের। জঙ্গল থেকে কাঠ পাচারের বিষয়টি টের পেতেই তা রক্ষায় তৎপর হয়ে ওঠে প্রশাসন। সেটা ১৯৯৮ সাল। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের চেয়ারে তখন বিল ক্লিন্টন। সেই সময় থেকেই চেষ্টা চলছিল, উপগ্রহের মাধ্যমে ‘ম্যাপিং’ করে লাল কাঠের জঙ্গল সংক্রান্ত যাবতীয় নির্ভুল তথ্য পাওয়ার।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলবর্তী অঞ্চলে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কলোরাডো বা ওরেগন জুড়ে রয়েছে লাল কাঠের জঙ্গল, পোশাকি নাম ‘কোস্ট রেডউড’। মহামূল্যবান এই লাল কাঠের উপর নজর পাচারকারীদের। জঙ্গল থেকে কাঠ পাচারের বিষয়টি টের পেতেই তা রক্ষায় তৎপর হয়ে ওঠে প্রশাসন।
আমেরিকার বিস্তীর্ণ লাল কাঠের জঙ্গল। ছবি: সংগৃহীত
২০১০ সালে প্রথম হাতেকলমে কাজে নামে তারা। কিন্তু কাজ হয়নি। ২০১৬ সালে সেই পরিকল্পনা ফের ধাক্কা খায়। অবশেষে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এসে সাফল্য এল। ১৭ মাস ধরে হুগলির গবেষক শুভম বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে চলা গবেষণার তথ্যপঞ্জি গ্রহণ করল মার্কিন প্রশাসন। পরে তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে ব্রিটেনের জার্নালে। শুভমদের গবেষণা শুরু হয়েছিল জো বাইডেনের শাসনকালে। ২০২৪ সাল থেকে দফায় দফায় জঙ্গলে ঘুরে লাল কাঠ জরিপ করেছেন শুভমরা। প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে ১২টি জঙ্গলে নমুনা সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁরা খোঁজ পেয়েছেন এমন কয়েকটি লাল কাঠের, যে গাছগুলির বয়স আনুমানিক ২০০০ বছর বা তারও বেশি। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দেয় শুভমের নেতৃত্বাধীন গবেষকদের দলটি। ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে আরও খুঁটিনাটি তথ্য সংযোজনের কাজ। সম্প্রতি গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে। তবে গোপন রাখা হয়েছে বহু তথ্য। কেন এত গোপনীয়তা?
আমেরিকার জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে লালকাঠ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছেন শুভম। নিজস্ব ছবি
শুভমের কথায়, ‘‘সার্বিক ধারণা পাওয়ার জন্য প্রকাশিত গবেষণাপত্রে যা যা থাকা দরকার, সেগুলোই রয়েছে। কিন্তু আমেরিকার সরকার যে কারণে এই তথ্যপঞ্জি পেতে উদগ্রীব ছিল, সেই নির্দিষ্ট তথ্য জনসমক্ষে আনা হয়নি।’’ কারণ কী? শুভমের বক্তব্য, মার্কিন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য লাল কাঠের বৃক্ষচ্ছেদন রুখে দেওয়া। পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য প্রকাশিত হলে তা ধাক্কা খাবে। উপমা দিয়ে শুভম বলেন, ‘‘ওখানেও তো বীরপ্পনরা রয়েছে। যারা লালকাঠ পাচার করে দেয় মেক্সিকোতে।’’ ভারতে এই ধরনের গবেষণার সুযোগ কি রয়েছে? শুভমের বক্তব্য, রয়েছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। তাঁর কথায়, ‘‘শাল, সেগুন, মেহগনি নিয়ে ম্যাপিং খুব সামান্য থাকলেও সার্বিকভাবে নেই। সিঙ্গালিলা, নেওড়াভ্যালির মতো জায়গাগুলিতে রডোডেনড্রন নিয়েও ম্যাপিংয়ের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এখনও সেভাবে কোনও কাজ হয়নি।’’
ভারতে এই ধরনের গবেষণার সুযোগ কি রয়েছে? শুভমের বক্তব্য, রয়েছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। তাঁর কথায়, ‘‘শাল, সেগুন, মেহগনি নিয়ে ম্যাপিং খুব সামান্য থাকলেও সার্বিকভাবে নেই। সিঙ্গালিলা, নেওড়াভ্যালির মতো জায়গাগুলিতে রডোডেনড্রন নিয়েও ম্যাপিংয়ের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এখনও সেভাবে কোনও কাজ হয়নি।’’
শুভমের বাড়ি হুগলির চণ্ডীতলার বাকসায়। তিনি বাকসা বিএন বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, জনাই ট্রেনিং হাই স্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। তারপর উত্তরপাড়া রাজা প্যারীমোহন কলেজ থেকে প্রাণিবিদ্যায় অনার্স এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে এমএসসি পাশ করেন তিনি। কলকাতার IISER থেকে পিএইচডি-র সময়ে শুভমের বিষয় ছিল তরাই তৃণভূমির গাণিতিক মডেল তৈরি। ভারতীয় উপমহাদেশের তরাই বনাঞ্চলে গত কয়েক দশকের প্রাকৃতিক পরিবর্তনকে স্যাটেলাইট ছবি ও গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছেন শুভম। তারপর বাতলেছেন ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা। আপাতত হুগলির বাড়িতেই রয়েছেন শুভম। জানা গিয়েছে, লাল কাঠ রক্ষায় এবার কুয়াশার ম্যাপিং করাতে চায় মার্কিন প্রশাসন। ফেব্রুয়ারির শেষে ফের আমেরিকা যেতে পারেন শুভম।
