ইট-কাঠ-পাথরের জঙ্গল। শহরে প্রতিনিয়ত টিকে থাকার লড়াই। লড়াই শুধু মানব জাতির মধ্যে নয়। সমগ্র জীবকুলেই। টিকে থাকতে মানুষ প্রতিনিয়ত লড়ছে। পাশাপাশি লড়ছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবেরাও। জীবনযুদ্ধে বেঁচে থাকতে কতটা তৎপর পক্ষীকুল তা জানলে অবাক হবেন আপনিও। শহুরে জীবনে নিজেদের মানিয়ে নিতে ক্রমশ কৌশলী হয়ে উঠছে পক্ষীজগৎ। সম্প্রতি পক্ষীবিদদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এমনই এক চমকপ্রদ তথ্য। শহরের চড়ুই, শালিক, ফিঙে প্রভৃতি ফিঞ্চ জাতীয় পাখিরা তাদের বাসা বুনতে ব্যবহার করছে মানুষের ফেলে দেওয়া সিগারেটের ফিল্টার বা অবশিষ্টাংশ। আপাতদৃষ্টিতে একে পরিবেশ দূষণের ফল মনে হতেই পারে। কিন্তু এর নেপথ্যে রয়েছে পাখিদের এক অদ্ভুত টিকে থাকার প্রবৃত্তি।
ছবি: সংগৃহীত
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, শহরের বুকে প্রাকৃতিক সুগন্ধি লতাপাতা বা ভেষজ উপাদানের অভাব প্রকট। গ্রামাঞ্চলে পাখিরা সাধারণত পরজীবী তাড়াতে ওই ধরনের শিকড়বাকড় বা লতাপাতা ব্যবহার করে। শহরে সেই অভাব মেটাচ্ছে সিগারেটের টুকরো। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সিগারেটের ফিল্টারে থাকা নিকোটিন এক ধরনের প্রাকৃতিক কীটনাশক হিসেবে কাজ করে। এটি বাসার ভেতরের ক্ষুদ্র কীট, উকুন, মাইট বা অন্যান্য ক্ষতিকারক পরজীবীদের বংশবৃদ্ধি রুখে দেয়। ফলে পরজীবীর আক্রমণে ছানাদের অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে। ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যেসব বাসায় সিগারেটের টুকরো বেশি থাকে, সেখানে পরজীবীর উপদ্রব তুলনায় অনেক কম।
কেবল স্বাস্থ্যসুরক্ষাই নয়, তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখতেও এই জঞ্জাল দারুণ কার্যকর। সিগারেটের ফিল্টারের সেলুলোজ ফাইবার বা তন্তু খুব ভালো অন্তরক হিসেবে কাজ করে। এটি রাতের ঠান্ডায় বাসার ভেতরটা গরম রাখে, যা ছানাদের দ্রুত বেড়ে ওঠার জন্য জরুরি। অর্থাৎ, নগরায়নের চাপে কোণঠাসা পাখিরা মানুষের বর্জ্যকেই তাদের ‘সুরক্ষা বর্ম’ বানিয়ে নিয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত
তবে এই মুদ্রার উলটো পিঠও আছে। নিকোটিন পরজীবী তাড়াতে সাহায্য করলেও, এর দীর্ঘমেয়াদী বিষক্রিয়া পাখির ছানাদের শরীরের কোশের ক্ষতি করতে পারে। গবেষকদের মতে, এটি এক ধরনের বিবর্তনীয় আপস। একদিকে পরজীবীর হাত থেকে তাৎক্ষণিক মুক্তি, অন্যদিকে বিষাক্ত রাসায়নিকের বিষবৃক্ষ। এই দুইয়ের মধ্যেই ভারসাম্য রেখে টিকে রয়েছে শহরের বাস্তুতন্ত্র। পাখিদের এই আচরণ প্রমাণ করে যে তারা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কতটা দক্ষ। শহরের দূষিত পরিবেশে যেখানে স্বাভাবিক রসদ অমিল, সেখানে জঞ্জাল থেকেই তারা এবার খুঁজে নিচ্ছে আগামীর দিশা।
