শৌনক চক্রবর্তী ও সম্বিত বসু: চন্দননগরের মানিক। ফ্রান্সের একগুঁয়ে সমর্থক। চন্দননগরেরই বাবলু নায়ার। ঠিক করেছেন, ফ্রান্স বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হলে রবিবার রাতে উদ্দাম নাচবেন। চন্দননগরবাসী আনিশ। পান-বিড়ির দোকান চালান। আজ যাঁর দোকানের সামনে লোকে লোকারণ্য হবেই টিভিতে কাপ ফাইনাল লাইভের সময়। বাঙালির মনের ব্রাজিল বিশ্বকাপ ফাইনালে যতই না থাকুক!
চন্দননগরের যে একটা আলাদা পরিচয় আছে- পরাধীন আমলে ফরাসি উপনিবেশ। চন্দননগর গত শতকের গোড়ার দিকেও ছিল ফ্রেঞ্চ কলোনি।
একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকেও চন্দননগরের মানিক-বাবলু-আনিশদের তাই ফ্রান্স-হ্যাংওভার কাটেনি! কিন্তু মানিক একবারের জন্যও তাঁর প্রিয় দলের জন্য চিৎকার করতে পারেননি ‘গোওওওওল’ বলে। তিনি বোবা। এমবাপে-গ্রিজম্যানদের জয়ের আনন্দে তিনি নাচতে পারেন, ইশারা করতে পারেন। তার বেশি কিছু নয়। তাতে অবশ্য অসুবিধের কিছু নেই। বন্ধু বাবলু ফ্রান্সের প্রতিটা জয়ে মানিকের হয়ে দ্বিগুণ চেঁচাচ্ছেন। মানিক আর বাবলু যেন ‘শোলে’ সিনেমার জয় আর বীরু। মানিকের কাউকে কিছু বোঝাতে সমস্যা হলে বাবলু এগিয়ে আসেন। বুঝিয়ে দেন।
চন্দননগরের রানিঘাটে আনিশের দোকান। দোকানের ছোট টিভিতে ফ্রান্সের খেলা দেখছেন এখানকার ‘দিন আনি দিন খাই’ মানুষরা। সমস্যার পাহাড় চারপাশে। তাতেও উৎসাহে ভাঁটা নেই। না হলে ৭৮২৮ কিলোমিটার দূরের ফ্রান্সকে সমর্থন করতে যাবেন কেন ওঁরা? রানিঘাটের আকাশে ফ্রান্সের পতাকা ওঁদেরই তোলা। মানিকের ঝালমুড়ি-পাপড়িচাটের দোকান। দোকানের গায়েও ফ্রান্সের পতাকা লাগিয়ে রেখেছেন। গঙ্গার হাওয়ায় যা বীরদর্পে উড়ছে। গোটা বিশ্বকাপ মানিক ফ্রান্সের জার্সি পরেই দোকানদারি করছেন। বিশ্বকাপ ফাইনালের কথা জিজ্ঞেস করতেই দু’আঙুল তুলে ‘ভি’ দেখিয়ে দিলেন। ফ্রান্স তাঁর কাছে ফাইনালে নামার আগেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
[বিশ্বকাপের ফাইনালে ফরাসি বিঠোভেন বনাম বলকান মোৎজার্টের লড়াই]
এককালের ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগরে ফরাসি স্থাপত্যের ঘরবাড়ি এখনও শহরতলির গঙ্গার ধারে চোখে পড়ে। তবে বহু চেষ্টা করেও কোনও ফরাসিকে খুঁজে পাওয়া গেল না। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, চন্দননগরের শেষ ফরাসি যিনি ছিলেন, তিনিও সম্প্রতি গত হয়েছেন। ফ্রান্স বিশ্বকাপ জিতলে উৎসব করবে চন্দননগর? ইশারায় মানিক বোঝানোর চেষ্টা করলেন। বাবলু যা মুখে তর্জমা করছিলেন। রবিবার সকাল থেকে ওঁরা রানীঘাট ফ্রান্সের পতাকা-পতাকায় ভরিয়ে তুলবেন। ফ্রান্সের জার্সি গায়ে চড়িয়ে সন্ধ্যায় বসবেন টিভির সামনে। মুখ-গা রাঙাবেন লাল-সাদা-নীলে। ফ্রান্সের জাতীয় পতাকার রংয়ে।
[বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখতে রাশিয়ায় অধীর! বাবুলের মতে ম্যাচ ৫০-৫০]
মানিক তো বেশি কিছু বাজিও কিনে রেখেছেন ইতিমধ্যে। পোগবারা বিশ্বকাপ জিতলেই চন্দননগরের রাস্তায় বাজি পোড়াবেন। কাস্টমারদের ফ্রি-তে ঝালমুড়ি খাওয়ানোরও ইচ্ছা আছে। আর বাবলু? তিনি ফ্রান্সের সাপোর্টার কেন? সঙ্গে সঙ্গে উত্তর, “চন্দননগরে ছোট থেকে বড় হয়েছি। বাপ-ঠাকুর্দার মুখে এখানকার ইতিহাস শুনেছি। আমি বরাবর ফ্রান্সের সাপোর্টার। ফ্রান্স বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবেই।” তাঁর থেকেই জানা গেল, ফ্রান্স বিশ্বসেরা হলে এখানকার চার্চ, কোর্ট, মিউজিয়ামের সামনের সব রাস্তায় ব্যান্ড বাজবে। চলবে এককালের ফরাসি উপনিবেশের সেলিব্রেশন। চার্চের সামনে তো বটেই, আশপাশের দু-তিনটে বাড়িতেও দেখা গেল ফ্রান্সের পতাকা টাঙানো। চন্দননগর রেল স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটা টোটোতে ফ্রান্সের ছোট সাইজের পতাকা। আশপাশের লোকজনের কথাবার্তায় বোঝা গেল, আবেগ-উত্তেজনা সেই ভাবে না থাকলেও স্থানীয় মানুষ চাইছেন ফ্রান্সই বিশ্বকাপ জিতুক।
[সম্মানের লড়াইয়েও ব্যর্থ ব্রিটিশরা, ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপে তৃতীয় বেলজিয়াম]
সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে চন্দননগরে ফরাসি সুগন্ধ ম-ম করছে। তা সে এখানকার ফরাসিদের বংশধরেরা আর না থাক এখন।
The post ফরাসি নেই, ফাইনাল ঘিরে ফরাসি সুগন্ধ আছে চন্দননগরে appeared first on Sangbad Pratidin.
