সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক: “তোমাদের সব্বাইকে খুব মিস করব…” কথা শেষ করতে পারলেন না সোনি নর্ডি। আবেগে বুজে এল গলা। চোখে জল। মাথা নিচু করে বারবার চোখের কোণ মুছছেন। পাশে বসে ক্লাবের কর্মকর্তারাও সেই মুহূর্তে বিহ্বল। শেষ কবে কোনও বিদেশির ক্লাব ছাড়া নিয়ে এমন আবেগঘন মুহূর্তের জন্ম হয়েছিল, মনে করতে পারছেন না ক্লাবের প্রবীণ সমর্থকরাও। ব্যারেটোর অবসরেও চোখের জলে ভেসেছেন সবুজ-মেরুন সমর্থকরা। কিন্তু সে তো সময়ের নিয়মে বিদায়। আর সোনির চলে যাওয়া যেন অকাল দশমী। গঙ্গাপারের ক্লাব তাঁবুতে তাই বিষাদের ছায়াপাত।
[ ডিকা ম্যাজিকে সম্মানের ডার্বির রং সবুজ-মেরুন ]
যাওয়ার আগে যেন মোহনবাগান সমর্থকদের রাঙিয়েই দিয়ে গেলেন হাইতিয়ান তারকা। বলে গেলেন, চোট সারিয়ে মোহনবাগানেই ফিরে আসব। সমর্থকদের কাছে রীতিমতো প্রতিজ্ঞা করেই বললেন সে কথা। কেন? সে উত্তরও দিলেন সোনি। জানিয়ে দিলেন, সমর্থদের থেকে যে ভালবাসা তিনি এখানে পেয়েছেন তা বোকা জুনিয়র্স বা ধানমান্ডিতে খেলেও পাননি। বিশ্বের অন্যান্য ক্লাবের সঙ্গে মোহনবাগানের তুলনা চললেও এখানকার সমর্থকদের ভালবাসার সঙ্গে কারও তুলনা চলে না। আর সেই স্রোতেই ফের পালতোলা নৌকার মাঝি হতে চান সোনি। একই সঙ্গে ক্লাবের প্রতি কৃতজ্ঞতাও ঝরে পড়ল সোনির গলায়। জানালেন, “চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত একান্তই আমার। চোটই চলে যেতে বাধ্য করছে। ক্লাব আমাকে সারিয়ে তোলার সবরকম চেষ্টা করেছে। কিন্তু আর্জেন্টিনায় গিয়ে চিকিৎসা করানো ছাড়া আর কোনও গতি নেই। তাই আমাকে যেতেই হচ্ছে। তবে আমি এখানেই ফিরে আসব।”
দেখুন ভিডিও:
[ রবিবারের ডার্বিতে যুবভারতীতে থাকবে হাজার হাজার সোনি, কীভাবে জানেন? ]
কাটসুমি দল ছাড়ার পর অধিনায়কের আর্ম ব্যান্ড তাঁর হাতেই তুলে দিয়েছিলেন কর্তারা। সোনি তার সম্মান রেখেছেন। শুধু নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে নয়, গোটা টিমটাকে অধিনায়কোচিত দক্ষতায় জাগিয়ে রাখতেন। এক্কেবারে টিমম্যান। বিপক্ষের বক্সে তাঁর পায়ে বল তুলে দিয়ে নির্ভার থাকতেন সতীর্থরা, তেমনই ড্রেসিংরুমেও যে কোনও বিপদে আপদে ভরসা একটাই, সোনি তো আছেনই। দল যত বিপদেই পড়ুক না কেন, সমর্থকদেরও ভরসা ওই একজনেই। নিজের অজান্তেই সোনি হয়ে উঠেছিলেন দলের পরিত্রাতা। দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের অধিনায়ক হওয়া যে কতখানি গুরুভার তা জানতেন সোনি। আর জানতেন বলেই বোধহয় এরকম অনাবিল দক্ষতায় মোহনবাগানের ঘরের ছেলে হয়ে উঠেছিলেন। গঙ্গাপারের ক্লাবে বিদেশি তো কম খেলে যাননি। কিন্তু সবুজ তোতা ব্যারেটোর পর সোনিই যে সমর্থকদের নয়নের মণি হয়ে উঠেছিলেন তা উল্লেখ করাও বাহুল্য মাত্র। তাই যেদিন চোটের কারণে ছিটকে গেলেন সেদিনই প্রমাদ গুণেছেন সমর্থকরা। তবু ভরসা ছিল লড়াকু সোনি ফিরে আসবেন। কিন্তু নাছোড় চোটে নাকাল হয়েই ফিরতে হচ্ছে হাইতিয়ানকে। অধিনায়ককে নায়কের মর্যাদা দিতে ভোলেনি ক্লাব ও সমর্থকরা। রবিবার ফিরতি ডার্বিতে তো একজন সোনি ছিলেন না। কিন্তু তাতে কী! মাঠে উপস্থিত ছিলেন হাজার হাজার সোনি। হ্যাঁ, আদতে মুখোশ। কিন্তু কে না জানে সত্যিকারের আবেগের মুখ আর মুখোশে কোনওদিন ফারাক হয় না!
সতীর্থদের কাছেও তিনি কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন তা গতকালই বুঝিয়ে দিয়েছেন ডিকা। ডার্বির নায়ক তাই জোড়া গোল উৎসর্গ করেছিলেন সোনিকেই। সোনির চলে যাওয়া তাই নিছক একজন ফুটবলারের ক্লাব ছেড়ে যাওয়া নয়, যেন আত্মীয় বিদায়ের মতোই বেদনাদায়ক। সোনির মুখেও শোনা গেল সে কথা। বললেন, “মোহনবাগান আমার কাছে শুধুই ক্লাব নয়। আমার পরিবারের মতোই।” সোনিকে বিদায় জানাতে এদিন এসেছিলেন স্বপনসাধন বোসও। এদিন তাঁর জন্মদিনের আগাম সেলিব্রেশনও হল। ছিলেন ক্লাবের অর্থসচিব দেবাশিস দত্ত, সহ-সচিব সৃঞ্জয় বোস-সহ অনেকেই। তবে সেরা ফ্রেম মিলল বোধহয় তখনই, যখন সমর্থকদের আবেগে কেঁদেই ফেললেন সোনি। হাইতি থেকে কলকাতার দূরত্ব কতখানি, তা পরিমাপের বিষয়। কিন্তু ভালবাসার টানে দূরত্ব যে নিমেষে মুছে যায়, আজ তাইই দেখা গেল। এদিন ক্লাব তাঁবুতে ছিল কাতারে কাতারে সমর্থক বলা ভাল সোনিপ্রেমীদের ভিড়। সকলের প্রার্থনা একটাই, সুস্থ হয়ে ওঠো সোনি। ফিরে এসো দলের প্রাণভোমরা। সমর্থকরা পা জড়িয়ে ধরলেন। আর তাঁদের বুকে তুলে নিয়ে সোনি মুছিয়ে দিলেন চোখের জল। এই আবেগের নামই যে মোহনবাগান। সরস্বতী পুজোর বাসন্তী বিকেলে কলকাতা যেন বুঝল, সবুজ-মেরুন ছাড়া আর কীই বা হতে পারে ভালবাসার রং!
দেখুন ভিডিও:
The post প্রমিস করছি, চোট সারিয়ে মোহনবাগানেই ফিরব: সোনি appeared first on Sangbad Pratidin.
