shono
Advertisement
Darjeeling

উন্নয়ন নাকি গোর্খাল্যান্ড ইস্যু, পাহাড়ের বাঁকে রাজনীতির চর্চা, কোন দিকে ঝুঁকবে দার্জিলিং-কালিম্পং?

পাহাড়ের রাজনীতি নাকি বৈচিত্র্যময়। একসময় ছিল জিএনএলএফ নেতা দোর্দণ্ডপ্রতাপ সুভাষ ঘিসিংয়ের শাসনকাল। পরবর্তীকালে গোর্খা নেতা বিমল গুরুংয়ের হাতে পাহাড়ের রাশ চলে যাওয়া। আর এখন কখনও বিজেপি, কখনও তৃণমূল কংগ্রেস আবার কখনও অনীত রাইয়ের রাজনৈতিক দল ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার চর্চা।
Published By: Suhrid DasPosted: 07:01 PM Mar 31, 2026Updated: 09:31 PM Mar 31, 2026

ঘূর্ণাবর্তের জেরে পাহাড়ের আকাশ কালো মেঘে ঢাকা। দিন কয়েক ধরেই মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি কার্শিয়াং, কালিম্পং-সহ দার্জিলিংজুড়ে। বেশিরভাগ সময় দূরের কাঞ্চনজঙ্ঘা ঢেকে থাকছে মেঘের চাদরে। পাহাড়ে সাধারণত সময় নাকি বয়ে যায় মেঘের মতো। কোথা থেকে বেলা গড়িয়ে যায় খেয়ালই পড়ে না। কিন্তু এখন বেলা গড়ালে চলবে না। ঘড়ি ধরে পাহাড় যেন চলছে! সামনেই যে বিধানসভা নির্বাচন। যে কোনও সময় আবহাওয়া খারাপ হতে পারে। তাই সকাল থেকেই শুরু হয়ে যায় রাজনৈতিক দলগুলির প্রচার।

Advertisement

পাহাড়ের রাজনীতির ইতিবৃত্ত:
পাহাড়ের রাজনীতি নাকি বৈচিত্র্যময়। একসময় ছিল জিএনএলএফ নেতা দোর্দণ্ডপ্রতাপ সুভাষ ঘিসিংয়ের শাসনকাল। পরবর্তীকালে গোর্খা নেতা বিমল গুরুংয়ের হাতে পাহাড়ের রাশ চলে যাওয়া। আর এখন কখনও বিজেপি, কখনও তৃণমূল কংগ্রেস আবার কখনও অনীত রাইয়ের রাজনৈতিক দল ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার চর্চা। তিস্তা নদীর অসংখ্য বাঁকের মতোই পাহাড়ের রাজনীতিতেও গত ২ দশকে প্রচুর বাঁক এসেছে।

একাধিক ইস্যুতে গত ২ দশকে জ্বলে উঠেছে পাহাড়। পাহাড়ি রাস্তা রক্তাক্ত হয়েছে আন্দোলনে। গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে আগুন জ্বলেছে মিরিক থেকে কালিম্পং, কার্শিয়াংয়ে। পরবর্তীতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৌলতে পাহাড়ের পরিস্থিতি এখন শান্ত। উন্নয়ন, বিপুল পর্যটন ব্যবসার খাতিরে পাহাড়ে এখন শান্তির পরিবেশ। গোর্খাল্যান্ড ইস্যুতে পৃথক রাজ্যের দাবি এক সময় প্রবল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের দোরগোড়ায় কোন ইস্যুতে এবার ভোট হচ্ছে শৈলশহরে? কাদের হাতে থাকবে পাহাড়ের ব্যাটন? সেই প্রশ্ন অচীরেই উঠছে। 

ভোটের প্রচারে তৃণমূল প্রার্থী গৌতম দেব। নিজস্ব চিত্র

আসন বিন্যাস:
আগে একটি জেলা হলেও প্রশাসনিক কাজকর্মের তাগিদে দার্জিলিংকে দু'টি ভাগে ভাগ করা হয়। দার্জিলিং ও কালিম্পং এখন পৃথক ২ জেলা। তবে এককভাবে কার্শিয়াং,কালিম্পং, দার্জিলিং একত্রে পাহাড় বলেই সুপরিচিত। দার্জিলিং ও কালিম্পং মিলিয়ে ছ'টি বিধানসভা কেন্দ্র। দার্জিলিংয়ে রয়েছে পাঁচটি বিধানসভা কেন্দ্র। সেগুলি হল-- দার্জিলিং, কার্শিয়াং, মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া, শিলিগুড়ি। কালিম্পং বিধানসভা কেন্দ্র মিলিয়ে ছ'টা।

রাজনীতির লড়াই:
এবার পাহাড়ে চতুর্মুখী ভোটের লড়াই হচ্ছে। পাহাড়ে আগে বামেদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। পরবর্তীতে লাল ফিঁকে হয়ে গেরুয়া হয়। পাহাড়ে ফোটে পদ্ম। এবারও বিজেপি পাহাড়ের আসনগুলি ধরে রাখতে মরিয়া। এদিকে বাংলার শাসক দলও পাহাড়ে প্রার্থী দিয়েছে। তবে জোটসঙ্গী হিসেবে অনীত থাপার দলকে তিনটি আসনে সমর্থন দিচ্ছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বামেরা শূন্যের গেরো কাটাতে মরিয়া। আলিমুদ্দিনের থেকে জোট ভেঙে এবার একা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কংগ্রেস। তারাও এবার পাহাড়ের পাঁচটি আসনে এককভাবে লড়াই করছে। আগামী ২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় পাহাড়ে ভোট। 

প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ভোট হয়। একাধিক দাবিদাওয়া উঠে আসে। তার মধ্যে অন্যতম গোর্খাল্যান্ড ইস্যু। পৃথক রাজ্যের দাবি বিমল গুরুং, রোশন গিরিরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করেছেন। পাহাড়ে ক্ষোভের আগুনে জ্বলেছে। এরপর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাধিকবার পাহাড়ে ভ্রমণ।

এবার কোন দলে প্রার্থী কারা:
ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা (BGPM) দার্জিলিঙের তিনটি পার্বত্য আসনে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। দার্জিলিং কেন্দ্রে বিজয় কুমার রাই, কার্শিয়াং কেন্দ্রে অমর লামা এবং কালিম্পং কেন্দ্রে রুডেন সাদা লেপচা লড়াই করছেন। দার্জিলিং কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী নমান রায়, ফাঁসিদেওয়ায় তৃণমূলের প্রার্থী রীণা টোপ্পো এক্কা, বিজেপির দুর্গা মুর্মু, কংগ্রেসের নবনীতা তিরকে। কার্শিয়াং আসনে বিজেপির প্রার্থী সোনম লামা, সিপিআই(এম) প্রার্থী উত্তম শর্মা, কংগ্রেসের হয়ে ভোটে লড়ছেন সরোজকুমার ক্ষাত্রী। মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী শংকর মালাকার। বিজেপির হয়ে লড়াই করছেন আনন্দময় বর্মন। সিপিএম ও কংগ্রেসের প্রার্থী ঝড়েন রায় ও অমিতাভ সরকার।

প্রচারে বেরিয়ে জনসংযোগে ব্যস্ত বিজেপি প্রার্থী শংকর ঘোষ। নিজস্ব চিত্র

বিগত বছরগুলির ভোটের ফলাফল:
২০২৪ সালের লোকসভা আসনে পাহাড়ে উড়েছিল বিজেপির বিজয় ঝান্ডা। দ্বিতীয়বারের জন্য জয়ী হয়ে দিল্লিতে সাংসদ হিসেবে গিয়েছেন রাজু বিস্তা। রাজু বিস্তা গতবার পেয়েছিলেন ৬,৭৯,৩৩১ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল কংগ্রেসের গোপাল লামার প্রাপ্ত ভোট ৫,০০,৮০৬। রাজুর জয়ের ব্যবধান ছিল ১,৭৮,৫২৫ ভোট। তবে ২০১৯ সালের তুলনায় পাহাড়ে বিজেপির ভোট কমেছিল। সেবার রাজু ৪ লক্ষের বেশি ভোটে জিতেছিলেন। ২০২৪ সালের বিধানসভার আসনভিত্তিক ফলাফলে বিজেপিই এগিয়ে আছে। পাহাড়ের ছ'টি আসনেই জয় পেয়েছে বিজেপি।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি সবক'টি আসনেই জয়ী হয়েছিল। শিলিগুড়ি আসনে জয়ী হন বিজেপি প্রার্থী শংকর ঘোষ। শংকর পেয়েছিলেন ৮৯,৩৭০ ভোট। তৃণমূল প্রার্থী ওমপ্রকাশ মিশ্র পান ৫৩,৭৮৪ টি ভোট। সিপিএমের অশোক ভট্টাচার্য ২৮,৮৩৫ টি ভোট পেয়েছিলেন। মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি কেন্দ্রে জয়ী বিজেপি প্রার্থী আনন্দময় বর্মণ। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ১৩৯,৭৮৫। তৃণমূলের রাজেন সুনদাস পান ৬৮,৯৩৭ ভোট। কংগ্রেসের শংকর মালাকার তৃতীয় স্থানে থেকে পেয়েছিলেন ২৩,০৬০ ভোট। কার্শিয়াং আসনে বিজেপির বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা জয়ী হন। ৭৩,৪৭৫ ভোট তাঁর ঝুলিতে। দুই নির্দল প্রার্থী শেরিং লামা ও নরবু লামা যথাক্রমে ৫৭,৯৬০ এবং ৩৩,০৯৪ ভোট পান।

পাহাড়ে প্রচারে অমর লামা। ছবি-সংগৃহীত

দার্জিলিং কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী নীরজ তামাং জিম্বা জয়ী হন। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ৬৮,৯০৭ টি। নির্দল প্রার্থী হিসেবে কেশব রাজ শর্মা পেয়েছিলেন ৪৭,৬৩১ ভোট। আরেক নির্দল প্রার্থী পেম্বা শেরিং পান ৩৮,২৪০ ভোট। ফাঁসিদেওয়া কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী দুর্গা মুর্মু পেয়েছিলেন ১০৫,৬৫১ ভোট। তৃণমূল প্রার্থী ছোটন কিস্কু পেয়েছিলেন ৭৭,৯৪০ টি ভোট। কংগ্রেস প্রার্থী সুনীল তিরকে পান ১২ হাজারের কিছু বেশি ভোট।

কোন ফ্যাক্টরে পাহাড়ে ভোট:
গত বছর অক্টোবর মাসের শুরুতে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল উত্তরবঙ্গ। ভুটান থেকে আসা জলে উপচে পড়েছিল তিস্তা। একাধিক এলাকা বানভাসী হয়। ধসে বিধ্বস্ত হয়েছিল কালিম্পং, মিরিক-সহ একাধিক এলাকা। ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক মাঝেমধ্যেই ধসের কারণে বন্ধ থাকে। তারও আগে পাহাড়ের ড্যাম ভেঙে তিস্তার বিধ্বংসী রূপ এখনও ভোলেনি দার্জিলিঙের সাধারণ মানুষ। কেন্দ্র এই বিপর্যয়ে কোনও আর্থিক সাহায্য করেনি। রাজ্য সরকার দুর্গতদের পাশে থাকে। রাস্তাঘাট, বাড়িঘর নির্মাণে সাহায্য করে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তরবঙ্গে গিয়ে পরিস্থিতির পর্যালোচনা করেন। নিজে উপস্থিত থেকে সব কিছুর মনিটরিং করেন। সেই বিষয় এবার ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে। সেই কথা মনে করছে রাজনৈতিক মহল। 

পাহাড়ের অন্যতম জীবিকা পর্যটন ব্যবসা। পর্যটনের হাত ধরেই ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ সারা বছরের জীবন ধারণ করেন। এছাড়াও আছে মৌসুমী ফলের চাষ ও চা বাগান। চা বাগানের পরিস্থিতি আবহাওয়াজনিত কারণে গত ছয় মাসে একাধিক সমস্যার সামনে পড়েছে।

প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ভোট হয়। একাধিক দাবিদাওয়া উঠে আসে। তার মধ্যে অন্যতম গোর্খাল্যান্ড ইস্যু। পৃথক রাজ্যের দাবি বিমল গুরুং, রোশন গিরিরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করেছেন। পাহাড়ে ক্ষোভের আগুনে জ্বলেছে। এরপর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাধিকবার পাহাড়ে ভ্রমণ। জিটিএ ইস্যুতে নেতাদের সঙ্গে বিস্তর আলাপ-আলোচনা, বৈঠক। শেষপর্যন্ত পাহাড়ের রাশ বিমল গুরুংদের থেকে সরে অমিত রায়ের কাছে যায়। বিমল গুরুং এখন পাহাড়ে বিজেপিকে সমর্থন করছে। গোর্খাল্যান্ড আশা জিইয়ে রেখে নিজেদের জায়গা বিজেপি ধরে রাখতে চায়। এদিকে গুরুংরাও মানুষের মধ্যে নিজেদের প্রভাব বাঁচিয়ে রাখতে মরিয়া। এমনই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। অন্যদিকে রাজ্য সরকার, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাইছেন পাহাড়ের শান্তি অটুট থাকুক।

শিলিগুড়িতে সিপিএমের প্রার্থী। নিজস্ব চিত্র

পাহাড়ের অন্যতম জীবিকা পর্যটন ব্যবসা। পর্যটনের হাত ধরেই ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ সারা বছরের জীবন ধারণ করেন। এছাড়াও আছে মৌসুমী ফলের চাষ ও চা বাগান। চা বাগানের পরিস্থিতি আবহাওয়া জনিত কারণে গত ছয় মাসে একাধিক সমস্যার সামনে পড়েছে। দার্জিলিং চায়ের গুণমানে ঘাটতি হয়েছে। এ কোথাও শোনা গিয়েছে। এদিকে পর্যটনকে আরও বেশি করে ঢেলে সাজাতে ইচ্ছুক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাধারণ মানুষও চায় তাদের আর্থিক রুটিরুজির জায়গা মজবুত হোক। জিটিএর মাধ্যমে পাহাড়ে উন্নয়ন চলছে। তার কাণ্ডারি মুখ্যমন্ত্রী। একথা জোর দিয়েই বলা যায়।

এবারে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ কোনদিকে তাঁদের মতামত জানাবে? হাওয়া অফিস বলছে, দিন কয়েক পরেই মেঘ কাটবে। পেঁজা তুলোর মতো মেঘের সঙ্গে সূর্যের লুকোচুরি খেলার মধ্যেই দেখা যেতে পারে সোনার পাহাড় কাঞ্চনজঙ্ঘা। বসন্তে পাহাড়ের রাস্তায়, এখানে সেখানে রডোডেনড্রন ফোটে। আর মধ্য বৈশাখে পাহাড়ে ভোট। মে মাসের শুরুতে কি পাহাড়ে পদ্মফুল ফুটবে? নাকি জোড়া ফুল?

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement