উত্তরবঙ্গের জল-হাওয়ায় যেন বাড়তি উদারতা মিশে থাকে। পরিবেশ-পরিস্থিতি যত আলাদাই থাক, মিলেমিশে বেঁধে বেঁধে থাকার একটা সাধারণ ছবি দেখা যায় এসব এলাকায়। কিন্তু যতটা দেখা যায়, তত ঐক্যবদ্ধ কি স্থানীয়রা? নাকি আজকের রাজনীতির ভাষায় 'আমরা-ওরা' দ্বন্দ্ব এখানে প্রকট? উত্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা কোচবিহার, একদা যা কোচ রাজবংশের গড় বলে পরিচিত ছিল। এখনও তার টুকরো নিদর্শন দেখা যায় কোচবিহারে পা রাখলে। এই জেলার রাজনীতি খুব একটা সরল পথে চলেনি কখনও। মিশ্র সম্প্রদায়ের বাসিন্দাদের মতোই বৈচিত্র্যময় এখানকার রাজনৈতিক জনসমর্থন। ছাব্বিশের ভোটে হটস্পট এই জেলার মাথাভাঙা বিধানসভা কেন্দ্রটি। শাসক-বিরোধীদের রিলে খেলা চলে যেন এই কেন্দ্রে। আসন্ন বিধানসভা ভোটে (WB Assembly Election 2026) এখানে কার পাল্লা ভারী? আসুন, মাথাভাঙার নির্বাচনী হাওয়া একটু বুঝে নেওয়া যাক।
জলঢাকা নদীর ধারে অবস্থিত মাথাভাঙা শহরটি আকারে ছোট হলেও যথেষ্ট এগিয়ে থাকা। গোটা জেলার মতো একসময়ে এখানেও রাজতন্ত্র ছিল। কোচ রাজারা দীর্ঘদিন শাসন করেছেন এই এলাকা। 'মাথাভাঙা' নামের উৎপত্তি নিয়েও নানারকম কল্পকাহিনি প্রচলিত আছে। তার মধ্যে অন্যতম, কোচবিহার লাগোয়া ভুটানে যুদ্ধের সময় নাকি কোচ সেনাদের মাথা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। সেই থেকে এ এলাকার নাম হয়ে ওঠে 'মাথাভাঙা'। পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতেও কোচ রাজবংশের প্রভাব ছিল ভালোই। কালের নিয়মে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়ে আসে গণতন্ত্র। তবে রাজবংশীদের ভোট (WB Assembly Election 2026) এখানে বেশ প্রভাব ফেলে।
ছাব্বিশের ভোটে মাথাভাঙায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হল, এসআইআরের জেরে প্রায় ২ লক্ষ নাম বাদ ও তারও আগে অসম থেকে এখানকার বাসিন্দাদের ঘনঘন এনআরসির নোটিস পাঠানো। অবশ্য এর মূল কারণ, অসম থেকে বহু মেয়ে বিয়ের পর এপারে এসেছে স্থায়ী হয়েছেন। দুই রাজ্যেই ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম রয়েছে। এসআইআরে সেই নাম বাদ, আবার এনআরসি-তে নতুন করে নাগরিকত্ব প্রমাণ। জোড়া ফলায় বিরক্ত জনতা। এর পাশাপাশি এনআরসি-র ব্যাপক প্রভাব যে আগামিদিনে এরাজ্যেও পড়তে চলেছে, তাতেও অনেকটা ভীত তাঁরা। এসব ঘটনাপ্রবাহে গেরুয়া শিবিরের উপর জনতার ক্ষোভ বেড়েছে। এর মাঝে তৃণমূল খানিকটা অ্যাডভান্টেজ পাচ্ছে রাজ্য সরকারের 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' প্রকল্পের কারণে। তফসিলি কেন্দ্র মাথাভাঙায় মাসে মাসে মহিলারা পান ১৭০০ টাকা। যা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট লাঘব করেছে অনেকটাই।
এই মুহূর্তে মাথাভাঙা কেন্দ্রে শাসকদল তৃণমূল ও বিরোধী বিজেপির মধ্যেই মূল লড়াই। এই কেন্দ্র তফসিলি অধ্যুষিত। ৫০ শতাংশের বেশি তফসিলি জনজাতি। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ভোটার তালিকার তথ্য অনুযায়ী, মাথাভাঙা বিধানসভা কেন্দ্রে মোট রেজিস্টার্ড ভোটারের সংখ্যা ২,৫৭,৮৪৪। পুরুষ ভোটার ১,৩৪,১৯৮ জন, মহিলা ১২৩,৬৪৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ জন। তবে এসআইআরের কারণে বেশ কিছু যোগ-বিয়োগের ফলে এই সংখ্যা বদল হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, কমবেশি ২১ হাজার ভোটারের নাম বাদের পথে। আর এতেই অতিষ্ঠ মাথাভাঙার মানুষজন। ছাব্বিশের ভোটে তাই মূল ইস্যু হতে চলেছে এসআইআরে নাম বাদ বনাম রাজ্য সরকারের উন্নয়ন। আর তাতে তৃণমূল খানিকটা অ্যাডভান্টেজ পাচ্ছে রাজ্য সরকারের 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' প্রকল্পের কারণে। তফসিলি কেন্দ্র মাথাভাঙায় মাসে মাসে মহিলারা পান ১৭০০ টাকা। যা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট লাঘব করেছে অনেকটাই।
মাথাভাঙার বিজেপি প্রার্থী, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক। ফাইল ছবি
গত দশ বছরে মাথাভাঙার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১১, ২০১৬ সালে পরপর দু'বার এই কেন্দ্র থেকে জিতেছিল তৃণমূল। ২০১১-এ হিতেন্দ্রনাথ বর্মন ও ২০১৬ সালে বিনয়কৃষ্ণ বর্মন। কিন্তু বিনয়কৃষ্ণর বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ ছিল। তাই ২০২১ সালে তাঁকে সরিয়ে গিরীন্দ্রনাথ বর্মনকে প্রার্থী করা হয় ঘাসফুল শিবিরের তরফে। এলাকায় তাঁর জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও সেবার হার হয় শাসক শিবিরের। ২০২১-এ মাথাভাঙার বিধায়ক হন বিজেপির সুশীল বর্মন। এখানে বরাবর বিজেপির সংগঠন ভালো। আরও উল্লেখযোগ্য, সুশীল বর্মন জেতা সত্ত্বেও তাঁকে সরিয়ে এবার মাথাভাঙায় গেরুয়া শিবির প্রার্থী করেছে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিককে (Nisith Pramanik)। আর তাতেই মাথাভাঙা জয় নিশ্চিত করতে চাইছে বঙ্গ বিজেপি। ছাব্বিশের ভোটে মাথাভাঙায় লড়াই হবে তৃণমূলের নবাগত প্রার্থী সাবলু বর্মন, বিজেপির নিশীথ প্রামাণিক, কংগ্রেসের ক্ষীতিন্দ্রনাথ বর্মন ও সিপিএমের খগেন বর্মনের মধ্যে।
নির্বাচনী লড়াইয়ের কথা গিয়ে আবার মাথাভাঙায় বিজেপি প্রার্থী নিশীথ প্রামাণিক আত্মঘাতী গোল করে বসেছেন। তাঁর কথায়, ''কোনও উন্নয়নমূলক কাজ হয়নি। কাজের নামে শুধু টাকা লুট হয়েছে।'' অথচ গত ৫ বছর মাথাভাঙায় বিজেপিরই বিধায়ক ছিলেন। তাহলে উন্নয়ন না হওয়ার দায়িত্ব তো তাঁরই!
মাথাভাঙার কংগ্রেস প্রার্থী ক্ষীতিন্দ্রনাথ বর্মন। নিজস্ব ছবি
মাথাভাঙা ছিনিয়ে আনতে তৃণমূল এবার ভোট ময়দানে এগিয়ে দিয়েছে নতুন প্রার্থী ড. সাবলু বর্মনকে। তিনি পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিনি প্রচারে বেরিয়ে দুয়ারে দুয়ারে 'ঘরের ছেলে' ইমেজ তুলে ধরছেন 'অধ্যাপক মশাই'। মনোনয়ন জমা দিতে গিয়ে সাবলু বর্মন জানালেন, ''মা-মাটি-মানুষের আশীর্বাদ আছে সঙ্গে। সবাই মাটির ছেলেকে চায়। আজ সাধারণ মানুষও আমার সঙ্গে এসেছেন। তাঁরা বহিরাগত বিসর্জন চাইছেন। যিনি ৫ বছর ধরে জনপ্রতিনিধি, এমনকী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েও মানুষের কাজ করেননি। এমন লোককে কেউ চায় না। এবার মাটির ছেলেকেই চাইছেন সকলে।''
মাথাভাঙার তৃণমূল প্রার্থী ড. সাবলু বর্মন। ছবি: বিশ্বদীপ সাহা
এনিয়ে বলতে গিয়ে আবার মাথাভাঙায় বিজেপি প্রার্থী নিশীথ প্রামাণিক (Nisith Pramanik) আত্মঘাতী গোল করে বসেছেন। তাঁর কথায়, ''কোনও উন্নয়নমূলক কাজ হয়নি। কাজের নামে শুধু টাকা লুট হয়েছে।'' অথচ গত ৫ বছর মাথাভাঙায় বিজেপিরই বিধায়ক ছিলেন। তাহলে উন্নয়ন না হওয়ার দায়িত্ব তো তাঁরই!
মাথাভাঙার সিপিএম প্রার্থী খগেন বর্মন। নিজস্ব ছবি
এসব দুর্বলতা সত্ত্বেও মাথাভাঙা গেরুয়া শিবিরের শক্ত ঘাঁটি, তাতে কোনও সংশয় নেই। কিন্তু ছাব্বিশের ভোটে বিজেপির জয় তত সহজ হবে না বলেই মনে করছে জেলার রাজনৈতিক মহল। এর নেপথ্যে বেশ কিছু হিসেবনিকেশ রয়েছে -
- প্রথমত, গত পাঁচ বছরে তৃণমূল সেখানে শক্তিবৃদ্ধি করেছে। মাথাভাঙার অন্তর্গত পঞ্চায়েত এবং পুরসভা এখন ঘাসফুল শিবিরের দখলে।
- দ্বিতীয়ত, বিজেপি বিধায়কের 'নিষ্ক্রিয়তা'য় তৃণমূলের পালে কিছু বাড়তি হাওয়া জুগিয়েছে।
- তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হল, ছাব্বিশের ভোটে মাথাভাঙায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হল, এসআইআরের জেরে প্রায় ২ লক্ষ নাম বাদ ও তারও আগে অসম থেকে এখানকার বাসিন্দাদের ঘনঘন এনআরসির নোটিস পাঠানো। অবশ্য এর মূল কারণ, অসম থেকে বহু মেয়ে বিয়ের পর এপারে এসেছে স্থায়ী হয়েছেন। দুই রাজ্যেই ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম রয়েছে। এসআইআরে সেই নাম বাদ, আবার এনআরসি-তে নতুন করে নাগরিকত্ব প্রমাণ। জোড়া ফলায় বিরক্ত জনতা। এর পাশাপাশি এনআরসি-র ব্যাপক প্রভাব যে আগামিদিনে এরাজ্যেও পড়তে চলেছে, তাতেও অনেকটা ভীত তাঁরা। এসব ঘটনাপ্রবাহে গেরুয়া শিবিরের উপর জনতার ক্ষোভ বেড়েছে।
এখন সাংগঠনিক জোরে এসব সামলে কি মাথাভাঙার গড় নিজেদের দখলে রাখতে সফল হবে বিজেপি? নাকি বিরোধীদের এসব দুর্বলতার সুযোগে তাদের ভোটব্যাঙ্কে সিঁদ কাটবে শাসকদল? উত্তর মিলবে আগামী ৪ মে।
