দিন দু'য়েক আগের কথা। গায়ে সাদা কুর্তা। গলায় অসমীয়া 'গামোছা'। চা-গাছের সবুজ সমুদ্রে দুটি পাতা-একটি কুড়ি তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পাশে লালপেড়ে শাড়ি- সাদা ব্লাউজ পরনে চা-সুন্দরীরা। সেই সমস্ত দৃশ্যের 'ব্লিৎসক্রেগ' চলছে সোশাল মিডিয়ায়। নিন্দুকরা অবশ্য বলছেন, পাতা নয়, ভোটমুখী অসমে বেছে বেছে ব্যালট তুলছেন নমো! বিষয়টা কি এতই সহজ? অসমে কংগ্রেস 'অ্যানেমিক'। ভোটবোদ্ধাদের মতে, হিমন্ত-যাদুতে এবারও বুড়া লুইতের পারে ফুটবে পদ্ম। তা হলে এহেন 'গিমিক' কেন? ডিব্রুগড়ের চা-বাগান থেকে কি বাংলার চা-বলয়কেই টার্গেট করেছেন নমো? সুদূরের স্বচ্ছলতার স্বপ্ন কি বঙ্গের চা-বলয়ে বুনে দিচ্ছে বিজেপি? গেরুয়া রাডারে কি আলিপুরদুয়ারের (Alipurduar) মতো জেলা, যেখানে অপ্রাপ্তির জ্বালা রয়েছে? মুদ্রার অন্য পিঠে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের 'উন্নয়নের পাঁচালি'। ছবি আরও ঘোরাল করেছে স্থানীয় রাজনীতির দেনা-পাওনার অঙ্ক। সবমিলিয়ে ছাব্বিশের ভোটে কী দেখে ফুল বাছবে আলিপুরদুয়ার? এই প্রতিবেদনে থাকছে সেসমস্ত বিশ্লেষণই।
আলিপুরদুয়ার জেলায় সরকারি হিসেবে মোট ৬০টি বাগান আছে। গত কয়েক বছরে অনেক বাগানই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বেতন না পেয়ে ক্ষোভও ছড়ায় শ্রমিকদের মধ্যে। পরবর্তীকালে আলোচনার প্রেক্ষিতে ফের বাগান খোলে। তথ্য বলছে, এই মুহূর্তে জেলার ৩৭টি চা বাগান স্বাভাবিকভাবে চলছে। ১৯টির অবস্থা রুগ্ন। চারটি বাগান বন্ধ হয়ে গিয়েছে। জেলার কালচিনি, কুমারগ্রাম-সহ একাধিক জায়গায় এইসব বাগান রয়েছে। চা শিল্পের সঙ্গে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক পরিবার জড়িয়ে আছে। তথ্য বলছে, জেলার প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার চা শ্রমিক পরিবারের। অর্থাৎ, এই গোটা ভোটব্যাঙ্ককে নিজেদের দিকে আনার লক্ষ্যেই জেলায় চলছে প্রচার।
প্রতীকী ছবি।
চা শ্রমিকদের জন্য উন্নয়নের বার্তা বরাবরই দিয়ে আসছে রাজ্যের শাসক দল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) উত্তরবঙ্গ সফরে গিয়ে নিজে একাধিক বার্তা দিয়েছেন। চা-বলয়ে উন্নয়ন অস্ত্র 'দিদি'র। শ্রমিকদের জন্য জমির পাট্টা বিলি হয়েছে। এছাড়াও বাংলা আবাস বাড়ি প্রকল্পে টাকা দেওয়া হয়েছে। চা সুন্দরী প্রকল্পে শ্রমিকদের ঘর, বাগানে ক্রেশ, হাসপাতাল, চা শ্রমিক পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্কুল বাস চালু-সহ একাধিক উন্নয়ন হয়েছে। বিজেপিও চা শ্রমিকদের জীবনের উন্নতির কথা প্রচার করছে। অসমে চা শ্রমিকদের মজুরি, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, একাধিক সুবিধার ব্যবস্থা করেছে বিজেপি সরকার। অসমের চা বাগানে পাতা তুলে বাংলার চা শ্রমিকদের সেই বার্তা দিলেন! বিজেপিও সেই বিষয়কে প্রচারে রেখে চা শ্রমিকদের নিজেদের দিকে রাখতে মরিয়া। আলিপুরদুয়ারে (Alipurduar) 'আচ্ছে দিনে'র স্বপ্ন বুনেছেন মোদি!
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তরবঙ্গ সফরে গিয়ে নিজে একাধিক বার্তা দিয়েছেন। চা-বলয়ে উন্নয়ন অস্ত্র 'দিদি'র। শ্রমিকদের জন্য জমির পাট্টা বিলি হয়েছে। এছাড়াও বাংলা আবাস বাড়ি প্রকল্পে টাকা দেওয়া হয়েছে। চা সুন্দরী প্রকল্পে শ্রমিকদের ঘর, বাগানে ক্রেশ, হাসপাতাল, চা শ্রমিক পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্কুল বাস চালু-সহ একাধিক উন্নয়ন হয়েছে।
একদিকে একাধিক চা বাগান, অন্যদিকে চাষাবাদের জমি। আরও উত্তরের দিকে অভয়ারণ্য। চিরসবুজ এই জেলায় রাজনৈতিক চরিত্র বদলও দেখা গিয়েছে গত এক দশকে। বাম আমলে এই জেলা ছিল লালদুর্গ। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে (West Bengal Assembly Election) তৃণমূল লালকে পর্যুদস্ত করে। পরবর্তীকালে তৃণমূলকে সরিয়ে পদ্ম ফোটে এই জেলায়। আলিপুরদুয়ার এই মুহূর্তে 'পদ্মগড়' বলাই যায়। তবে তার মধ্যেও দেখা দিয়েছে কোন্দল। প্রার্থী নাপসন্দ থেকে গুরুত্বপূর্ণ নেতার শিবির বদল। মাদারিহাট বিধানসভা কেন্দ্রে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এই মুহূর্তে কিছুটা হলেও দুশ্চিন্তায় ফেলেছে বিজেপিকে। তৃণমূল শিবিরের জন বার্লা নাকি বিজেপির বিমল গুরুং কার স্ট্র্যাটেজি কাজ করবে? কে হয়ে উঠবেন আলিপুরদুয়ারের কিং মেকার?
রাজনীতির ইতিবৃত্ত...
মূলত চা শ্রমিক ও কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত মানুষদের বাস এই জেলায়। এর সঙ্গে জেলার একটা বড় অংশে রয়েছে পর্যটন ব্যবসা। বক্সা অভয়ারণ্যের দৌলতে পর্যটন ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণেও এগিয়ে এই জেলা। একসময় বামেদের শক্ত ঘাঁটি ছিল আলিপুরদুয়ার। বিশেষত বাম শরিক দল আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রভাব দেখা যেত ব্লকে ব্লকে। এখন আর সেই 'রাজপাট' নেই। আলিপুরদুয়ারের অন্যতম রাজনৈতিক মুখ আদিবাসী বিকাশ পরিষদের নেতা জন বার্লা। একসময় বিজেপির সঙ্গে ছিলেন উত্তরবঙ্গের এই আদিবাসী নেতা। লোকসভা নির্বাচনে জিতে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রীও হয়েছিলেন।
পরবর্তীকালে বিজেপির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় তাঁর। বিজেপির দলীয় কর্মসূচিতেও তাঁকে আর দেখা যায়নি৷ পরবর্তীতে শিবির বদল। তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন তিনি৷ জন বার্লা নির্বাচনী ভোটব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে বড় ফ্যাক্টর, এমনই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। আদিবাসী বিকাশ পরিষদের এই নেতার প্রভাব কেবল আলিপুরদুয়ার নয়, ডুয়ার্সেও রয়েছে বলে মত। অতীতের লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে জন বার্লা অনেকক্ষেত্রেই নির্ণায়ক মুখ ছিলেন বলে মত রাজনীতিকদের। তবে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে কী হবে? শিবির বদলের জন্য কি ভোটবাক্সে 'এক্স ফ্যাক্টর' হয়ে উঠবেন জন? পদ্মগড়ে কি ফের নতুন করে জোড়া ফুল ফুটতে পারে? সেই চর্চা শুরু হয়েছে। শহরের এক ভোটার জানান, বিজেপির পাল্লা ভারী। তবে জন বার্লার উপস্থিতিতে তৃণমূলও লড়াইয়ে থাকতে পারে। বিজেপির মধ্যেও চাপা অশান্তি আছে এলাকায়।
প্রচারের মাঝে ময়দানে ব্যাট হাতে তৃণমূল প্রার্থী। নিজস্ব চিত্র
আসন বিন্যাস...
আলিপুরদুয়ার জেলায় লোকসভা আসন একটি। আলিপুরদুয়ার লোকসভা আসনটি গতবারও বিজেপির দখলে থেকেছে। বিধানসভার বিচারে এই জেলায় পাঁচটি আসন রয়েছে। আলিপুরদুয়ার, কুমারগ্রাম, ফালাকাটা, কালচিনি, মাদারিহাট। সাধারণত, মিনি ইন্ডিয়া বলা হয় এই জেলাকে। ১০০-র বেশি ভাষাগোষ্ঠীর মানুষের বাস এখানে। জেলার কালচিনি, কুমারগ্রাম ও মাদারিহাট এই তিন বিধানসভা সম্পূর্ণ চাবাগান অধ্যুষিত। অন্যদিকে আলিপুরদুয়ার ও ফালাকাটা কিছুটা কৃষিবলয়, শহর ও চা বাগান রয়েছে।
রাজনীতির লড়াই...
এই মুহূর্তে আলিপুরদুয়ার 'পদ্মের গড়' বলে পরিচিত। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আলিপুরদুয়ার লোকসভা আসনটি তৃণমূল জয় করে। তার দুই বছর পরে ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে জেলার আলিপুরদুয়ার, কুমারগ্রাম ও কালচিনি তিন বিধানসভাতেও জয় পায় তৃণমূল। ওই বিধানসভা ভোটেই উত্তরবঙ্গে প্রথম পদ্ম ফুটেছিল। মাদারিহাট কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন বিজেপির অন্যতম মুখ মনোজ টিগ্গা। এরপর অচীরেই জেলায় ছড়িয়ে পড়ে গেরুয়া রং। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির হয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন জন বার্লা। বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভায় জায়গাও পেয়েছিলেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও জেলার রং হয়ে যায় সম্পূর্ণ গেরুয়া। তৃণমূলকে হারিয়ে জেলার পাঁচটি বিধানসভা কেন্দ্রেই জয়ী হয় বিজেপি।
তবে পদ্মগড়ে ফের ফোটে জোড়াফুল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আলিপুরদুয়ার কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী করে মনোজ টিজ্ঞাকে। মনোজ বড় ব্যবধানে জয়ও পান। মাদারিহাট কেন্দ্রে একইসঙ্গে উপনির্বাচন হয়েছিল। দেখা যায়, বিজেপিকে হারিয়ে প্রায় ৩০ হাজার ভোটে তৃণমূল প্রার্থী জয়প্রকাশ টোপ্পো জয়ী হন। বলা ভালো সেই বছর রাজ্যের ছ'টি বিধানসভা উপনির্বাচনের আসনেই সহজ জয় পেয়েছিল তৃণমূল।
চা বাগানের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলছেন তৃণমূল প্রার্থী। নিজস্ব চিত্র
এবার কারা লড়াইয়ের ময়দানে...
এবার মূলত এই জেলায় বিজেপি বনাম তৃণমূল কংগ্রেসের লড়াই। যদিও এই জেলায় বাম ও কংগ্রেস প্রার্থীরাও রয়েছেন। এছাড়াও আছেন একাধিক নির্দল প্রার্থী। তৃণমূল জেলা সংগঠনের মুখের উপর ভরসা রেখেছে। এদিকে বিজেপিও পুরনো মুখে ভরসা রেখেছে। আবার একাধিক আসনে প্রার্থীও বদল হয়েছে। ফলে বিজেপির অন্দরে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ।
মাদারিহাট কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী জয়প্রকাশ টোপ্পো। বিজেপির হয়ে লড়ছেন লক্ষ্মণ লিম্বু। আরএসপি সুভাষ লোহার ও কংগ্রেস জয়প্রফুল্ল লাকড়াও এই কেন্দ্রে ভোটে লড়ছেন। ফালাকাটায় তৃণমূল প্রার্থী সুভাষ রায়। বিজেপির প্রার্থী দীপক বর্মন। সিপিএম কমলকিশোর রায়কে প্রার্থী করেছে। কংগ্রেসের প্রার্থী অক্ষয়কুমার বর্মন। আলিপুরদুয়ার কেন্দ্রে সুমন কাঞ্জিলালকে তৃণমূল প্রার্থী করেছে। বিজেপির প্রার্থী পরিতোষ দাস, সিপিএম শ্যামল রায়কে প্রার্থী করেছে। কালচিনি কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী বীরেন্দ্র বরা, বিজেপির বিশাল লামা, আরএসপি পাশাং শেরপা, কংগ্রেস অঞ্জন চিক বরাইক। কুমারগ্রাম কেন্দ্রে রাজীব তীরকে তৃণমূল প্রার্থী করেছে। বিজেপির প্রার্থী মনোজকুমার ওঁরাও, এই কেন্দ্রে আরএসপি কিশোর মিন্জকে প্রার্থী করেছে। কংগ্রেসের প্রার্থী সুদাম লামা।
বিগত বছরগুলিতে ভোটের ফলাফল...
গত ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আলিপুরদুয়ার কেন্দ্র থেকে জয়ী হয় বিজেপি। ওই কেন্দ্রের বর্তমান সাংসদ বিজেপির মনোজ টিগ্গা। লোকসভা নির্বাচনের ভোটের অঙ্কের নিরিখে বিধানসভার আসন ভিত্তিক ফলাফলেও বিজেপি অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে এই জেলায়। পাঁচটা কেন্দ্রেই বিজেপি জয় পেয়েছে। ২০২১ সালের ভোটেও প্রত্যেকটি আসনে জয় পেয়েছিল। তৃণমূল প্রার্থী সুমন কাঞ্জিলাল জানান, বিজেপি এলাকাতে কোনও কাজই করেনি। মানুষজনকে ভুল বোঝাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৌলতে মানুষজন রাজ্য সরকারের একাধিক ভাতা পাচ্ছেন। রাজ্য সরকার চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার উন্নতির জন্যও কাজ করছে। এবার তৃণমূল জিতবে জেলায়, জোর গলায় বলেন তৃণমূল প্রার্থী।
প্রচারে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সিপিএম প্রার্থী। নিজস্ব চিত্র
কোন ফ্যাক্টরে এবার ভোট...
এবার বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই জেলায় গেরুয়া শিবিরে অসন্তোষ দেখা গিয়েছে। মাদারিহাট কেন্দ্র নিয়ে বিজেপির অন্দরে প্রবল ক্ষোভ-বিক্ষোভ হয়েছে। বিজেপি প্রার্থীকে এবার পছন্দ হয়নি।স্থানীয় নয় বলেও অভিযোগ উঠেছে৷ উপনির্বাচনে ওই কেন্দ্রে বিজেপির হয়ে লড়াই করেছিলেন রাহুল লোহার। তিনি আশা করেছিলেন, দল এবারও তাঁকে প্রার্থী করবে। কিন্তু দল তাঁকে গুরুত্ব না দিয়ে লক্ষ্মণ লিম্বুকে প্রার্থী করেছে৷ ফলে রাহুল এই মুহূর্তে নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছেন বলেই দলের অন্দরের খবর। ওই এলাকার মণ্ডল সভাপতি আশা করেছিলেন, তিনি টিকিট পাবেন। কিন্তু তিনিও আশাহত হন। নির্দল হিসেবে ভোটে লড়বেন, সেই কথা ইতিমধ্যেই তিনি জানিয়েছেন৷ 'বহিরাগত' প্রার্থী বলে অভিযোগ উঠেছে। ক্ষোভের আগুনে বীরপাড়ার বিজেপির দলীয় কার্যালয়ও ভাঙচুর করা হয়েছে বলে অভিযোগ। বিজেপির প্রার্থী দীপক বর্মন জানিয়েছেন, ভুল ঝোঝাবুঝি মিটে সকলেই একসঙ্গে কাজ করছে। এবারে ব্যবধান বাড়ানোর জন্য লড়াই। রাজ্যেও এবার বদল হবে।
বাজারে ব্যবসায়ীদের কাছে জনসংযোগে বিজেপি প্রার্থী। নিজস্ব চিত্র
মাদারিহাট বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থী আসলে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার নেতা বিমল গুরুংয়ের। এমনই মতামত এলাকায় কান পাতলে শোনা যায়। ওই এলাকার প্রার্থীর প্রচারেও গুরুংকে দেখা যাচ্ছে বলে খবর। বিজেপির কোন্দল মেটাতে কার্যত কর্মীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছেন তিনি। তাহলে কি বলা যায় এই কেন্দ্র বিজেপি ধরে রাখতে এবার বিশেষভাবে মরিয়া? জন বার্লা বিজেপি থেকে তৃণমূল শিবিরে গিয়েছেন। তৃণমূল এবার তাঁকে নির্বাচনে লড়ার টিকিট দেয়নি। এখনও প্রচারে আদিবাসী বিকাশ পরিষদের এই নেতাকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। তাহলে কি রাজ্যের শাসক দলের উপর মনক্ষুন্ন এই নেতা? ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে জন বার্লা প্রচারে নামলে আদিবাসী ভোটব্যাংক তৃণমূলের দিকে অনেকটাই ঘুরতে পারে। তেমন হলে উপনির্বাচনে যা ফলাফল হয়েছিল, তার থেকেও বেশি ভোট তৃণমূল পেতে পারে।
স্থানীয়দের মত, ২০২১ সালে জন বার্লা বিজেপির হয়ে ভোট লড়েছিলেন বলে জেলায় ব্যাপকভাবে পদ্ম ফুটেছিল। ২০১৯ সালের লোকসভায় তো তিনিই প্রার্থী ছিলেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মনোজ টিগ্গা জিতলেও কোথাও তাল কাটে। কারণ, সেসময় দলের সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে জন বার্লার৷ মাঠে ময়দানে প্রচারে দেখা যায়নি। এরপর শিবির বদল। অন্দরের খবর, উপনির্বাচনে তৃণমূলের হয়ে ঘুঁটি সাজিয়েছিলেন তিনি।
স্থানীয়দের মত, ২০২১ সালে জন বার্লা বিজেপির হয়ে ভোট লড়েছিলেন বলে জেলায় ব্যাপকভাবে পদ্ম ফুটেছিল। ২০১৯ সালের লোকসভায় তো তিনিই প্রার্থী ছিলেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মনোজ টিগ্গা জিতলেও কোথাও তাল কাটে। কারণ, সেসময় দলের সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে জন বার্লার৷ মাঠে ময়দানে প্রচারে দেখা যায়নি। এরপর শিবির বদল। অন্দরের খবর, উপনির্বাচনে তৃণমূলের হয়ে ঘুঁটি সাজিয়েছিলেন তিনি।
অন্যদিকে আলিপুরদুয়ারেও গোর্খাল্যান্ড ইস্যু রয়েছে। বড় অংশের মানুষ গোর্খা। সেই ভোটকে একত্র করতেই কৌশলে বিমল গুরুংকে এই এলাকায় দায়িত্ব দেওয়া বিজেপির! জন বার্লার খামতি বিমল গুরুংয়ের মাধ্যমে পূরণ করতে চাইছে? গোর্খাদের আবেগকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা চলছে! এমন কথাও উঠে আসছে। ভুটান থেকে নেমে আসা জলে আলিপুরদুয়ারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছিল গত অক্টোবর মাসে। জীবন-জীবিকা, বাসস্থান, রুটিরুজিতে বড় ধাক্কা লাগে সাধারণ মানুষের। এই পরিস্থিতিতে ক্রমে রাজ্য সরকারের সৌজন্যে বিপর্যয় কাটিয়ে উঠছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। এই জেলায় ভোটের ফ্যাক্টর কী? সেই প্রশ্নে একাধিক বিষয় সামনে আসবে। সিপিএমের কর্মী-সমর্থকরাও প্রচারে নেমেছেন কোমর বেঁধেই। সিপিএম প্রার্থী শ্যামল রায় জানিয়েছেন, তৃণমূল-বিজেপি মানুষদের ভুল বোঝাচ্ছে। মানুষের অধিকারের জন্য লড়াই। চা বাগানের শ্রমিকদের জীবনযাত্রা বদলের জন্য লাল ঝান্ডা বরাবর কাজ করেছে। এবারও করবে।
চা শ্রমিকদের জীবিকা, বাগানগুলির অবস্থা বরাবর চর্চার বিষয় হয়ে থাকে। বিগত সময়গুলিতে জেলার একাধিক চা বাগান সাময়িক বন্ধ হয়ে যায়। মালিক-শ্রমিক অসন্তোষ দেখা গিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের বেতন বকেয়ার বিষয়টিও জোরালো হয়েছে। যদিও রাজ্য সরকারের বদান্যতায় বহু চা বাগান খুলেছে। চা শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য সরকারি তরফে নজরদারি থাকে। এই জেলার আরও একটি চর্চার বিষয় পরিযায়ী শ্রমিক। জেলার থেকে বহু মানুষ ভিন রাজ্যের কাজের জন্য চলে যান। এছাড়াও পর্যটন শিল্পে বহু মানুষ জড়িয়ে রয়েছেন। জীবনযাত্রার মান উন্নতির জন্য বরাবর দাবি উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে সাধারণ মানুষের জীবনের উন্নতির জন্য প্রয়াসী। সাধারণ পরিবারগুলির মধ্যে বাংলা আবাস যোজনায় বাড়ির টাকা দেওয়া, জমির পাট্ট বিলি হয়েছে অতীতে।
তৃণমূলের বাইক মিছিল। নিজস্ব চিত্র
বর্তমানে চা শ্রমিকদের বাম আমলের সময়ের দৈনিক মজুরি ৬৭ টাকা থেকে বেড়ে ২৫০ টাকা হয়েছে। চা সুন্দরী প্রকল্পে শ্রমিকদের ঘর, বাগানে ক্রেশ, হাসপাতাল, চা শ্রমিক পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্কুল বাস চালু-সহ একাধিক উন্নয়ন হয়েছে। আলিপুরদুয়ার জেলা হয়েছে, ফালাকাটা পুরসভা হয়েছে। হওয়ার তালিকায় রয়েছে আরও অনেক কিছু। আর এসবকেই হাতিয়ার করছে তৃণমূল। উন্নয়নের নিরিখে ভোট চাইছে তৃণমূল। অন্যদিকে, বিজেপি শাসকদলের বিরুদ্ধে চুরি, দুর্নীতি, নদী থেকে বালি তোলা, পাচারের মতো বিষয়কে ইস্যু করেছে। এছাড়া হিন্দুত্ববাদ রয়েছে। জেলার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষজন মূলত হিন্দু। তবে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের প্রচুর মানুষ রয়েছেন।
এত কিছুর পরেও বিজেপির গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কি চোরাস্রোতের মতো কাজ করবে? আড়াল থেকে জন বার্তা তাঁর ক্যারিশ্মা দেখাবেন? নাকি পাহাড়ি নেতা বিমল গুরুং গোর্খা আবেগকে কাজে লাগিয়ে গেম চেঞ্জার হবেন? আলিপুরদুয়ারে বিজেপি প্রার্থীরা হইহই করে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও কাঁটার আঘাতে রক্ত ঝড়বে না তো? শেষপর্যন্ত ২৯ তারিখ কোন ভাবনা মনে নিয়ে মানুষ বোতাম টিপবেন ইভিএমের?
