বিস্তীর্ণ খনি অঞ্চল একদিকে। অন্যদিকে কৃষিপ্রধান অঞ্চল। দুয়ে মিলেই পশ্চিম বর্ধমানের পাণ্ডবেশ্বর বিধানসভা। এই রকম বিচিত্র ভৌগলিক অবস্থার মতোই বিচিত্র এই বিধানসভার রাজনৈতিক ইতিহাসও। বালি খাদান, কয়লাখনি অঞ্চলের বিপদ এখানকার বাসিন্দাদের নিত্যসঙ্গী। প্রতিটি নির্বাচনেই এখানে এই ইস্যুকে মাথায় রেখে রণকৌশল স্থির করে রাজনৈতিক দলগুলি। তবে ভোট মিটে গেলে সেই প্রতিশ্রুতিও বিশ্রুত হন প্রার্থীরা। ছাব্বিশের ভোটযুদ্ধেও তাই অন্যতম হটস্পট এই পাণ্ডবেশ্বর। দেখে নেওয়া যাক, কেমন হতে চলেছে এখানকার নির্বাচনী লড়াই।
একদা বাম দূর্গ পাণ্ডবেশ্বর বিধানসভায় রাজ্যে পালাবদলের পরও ২০১১ সালে সিপিএম ৪৯.৭ শতাংশ ভোটে জয়ী হয়। ২০১৬ সালে প্রথম এই লাল-দূর্গে ঘাসফুল ফোটে। আবার যিনি এই ফুল ফোটানোর নেপথ্য কারিগর তিনিই পরপর দুই বারের বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধী পদ্মপ্রার্থী। ২০১৬ সালে তৃণমূল প্রার্থী জিতেন্দ্র তিওয়ারি ৪৫.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। তবে পাঁচ বছরে খনি অঞ্চলের রাজনীতির হাওয়া দিকবদল করেছে। ২০২১-এর নির্বাচনে তিনিই আবার বিজেপি প্রার্থী হয়ে তৃণমূল প্রার্থী নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কাছে ৩ হাজার ৮৭৬ ভোটে হেরে যান। একদা দুই 'বন্ধু' ছাব্বিশেও পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী।
খোলামুখ খনির দূষণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। খনি সম্প্রসারণের কারণে পুনর্বাসন নিয়েও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ রয়েছে। গোদের উপর বিঁষফোড়ার মতো সম্প্রতি হাই কোর্ট আদেশ দিয়েছে, ইসিএলের দখল করা আবাসন ছাড়তে হবে। এটা ছিল তৃণমূল ও বিজেপি - উভয়েরই ভোটব্যাঙ্ক।
পাণ্ডবেশ্বরের তৃণমূল প্রার্থী নরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়।ছবি: সনাতন গড়াই।
বিচিত্র এই বিধানসভার জনবিন্যাস। মোট ভোটার ১ লক্ষ ৯২ হাজার ৯৪৫ জন। পুরুষ ভোটার ৯৯ হাজার ৩৭৬ জন। মহিলা ভোটারও ৯৩ হাজার ৫৬৮ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ জন। তফসিলি জাতির ভোটারের সংখ্যা ৩৭ হাজার ৬৬৮ জন, উপজাতি ৪ হাজার ৮০২। মুসলিম ভোটার ২৬ হাজার ৯৯১ জন। তবে এসআইআরের পর জনবিন্যাসের চিত্রটা বেশ কিছুটা বদল হয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ গিয়েছে ১১ হাজার ২৬১ জনের। যা ২০১৬ কিংবা ২০২১ সালে জয়ী প্রার্থীর জয়ের ব্যবধানের প্রায় আড়াই গুণ বেশি। বাতিলের মধ্যে অধিকাংশই মহিলা ও মুসলিম ভোটার।
পাণ্ডবেশ্বেরের হেভিওয়েট বিজেপি প্রার্থী জিতেন্দ্র তিওয়ারি।ছবি: সনাতন গড়াই।
এখানকার জনপ্রতিনিধি শাসক শিবিরের হওয়ায় এলাকায় উন্নয়ন হয়েছে ভালোই। তবে বরাবরের মতো বালি খাদান নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। দামোদরের চরে ঘনঘন বালি তোলার কারণে জমি ক্রমশ আলগা হয়ে যাচ্ছে। ধসপ্রবণ হয়ে উঠছে। খোলামুখ খনির দূষণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। খনি সম্প্রসারণের কারণে পুনর্বাসন নিয়েও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ রয়েছে। গোদের উপর বিঁষফোড়ার মতো সম্প্রতি হাই কোর্ট আদেশ দিয়েছে, ইসিএলের দখল করা আবাসন ছাড়তে হবে। এটা ছিল তৃণমূল ও বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক। এছাড়াও কিছু কিছু সমস্যা থেকে গিয়েছে পাণ্ডবেশ্বরে। কী সেসব? মূলত রাস্তা, নিকাশি ও খনির দূষণ। প্রায় ৬৮ কোটি টাকা খরচে রাস্তা হলেও এখনও বেশ কিছু রাস্তা নির্মাণ বাকি। নিকাশিরও কাজ কিছু বাকি।
এবার বাম-কংগ্রেস জোট না হাওয়ায় অ্যাডভান্টেজ পজিশনে শাসকই। বাম সমর্থিত সিপিএম প্রার্থী প্রবীর মণ্ডলের লক্ষ্য ভোট শতাংশ বাড়ানো। এই কেন্দ্রে কংগ্রেসের অস্তিত্ব প্রায় নেই। কংগ্রেস প্রার্থী উত্তম কুমার রায়ের লড়াই তাই জামানত বাঁচানোর।
পাণ্ডবেশ্বর বিধানসভার ৭টি পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতি তৃণমূলের দখলে। বিধানসভার ভূমিপুত্র তৃণমূল প্রার্থী বিদায়ী বিধায়ক নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সংগঠন যে কোনও দলকে ঈর্ষান্বিত করবে। ব্যাপক জনসংযোগ তাঁর। অন্যদিকে তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনুন্নয়নের ইস্যুকে হাতিয়ার করে জোর প্রচারে নেমেছেন বিজেপি প্রার্থী জিতেন্দ্র তিওয়ারিও। মাটি কামড়ে পড়ে আছেন তিনি। মূল লড়াই তৃণমূল ও বিজেপির।
সিপিএম প্রার্থী প্রবীর মণ্ডলও প্রচারে ভালোই সাড়া পাচ্ছেন।ছবি: সনাতন গড়াই।
এবার বাম-কংগ্রেস জোট না হাওয়ায় অ্যাডভান্টেজ পজিশনে শাসকই। বাম সমর্থিত সিপিএম প্রার্থী প্রবীর মণ্ডলের লক্ষ্য ভোট শতাংশ বাড়ানো। এই কেন্দ্রে কংগ্রেসের অস্তিত্ব প্রায় নেই। কংগ্রেস প্রার্থী উত্তম কুমার রায়ের লড়াই তাই জামানত বাঁচানোর। তৃণমূল প্রার্থী নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী জয় নিয়ে নিশ্চিত। তিনি বলেন, "সারা বছর চষে বেড়াই। মানুষের সুখ-দুঃখে আমাকে পাশে পায়। প্রচারে বেরিয়ে বুঝতে পারছি, মানুষ কতটা ভালোবাসে আমাকে। অন্যদের মতো ভোটের আগে এখানে আসি না। জয় নিয়ে ভাবছি না। এরপর কী কী কাজ মানুষের চাহিদা মাফিক আরও করতে হবে তার তালিকা তৈরি করছি।"
কংগ্রেস প্রার্থী উত্তমকুমার রায়ের লড়াই জামানত বাঁচানোর। ছবি: সনাতন গড়াই।
পালটা বিজেপি প্রার্থী জিতেন্দ্র তিওয়ারি বলেন, "শুধু নিজের জন্যে লুট করেছেন উনি। কোনও উন্নয়ন নেই এলাকার। প্রচারে বেরিয়ে দেখছি, মানুষ কাঁদছে। সন্ত্রাস সৃষ্টি করে রেখেছেন উনি। মানুষ এ থেকে মুক্তি চাইছে।" সম্প্রতি আমিষ-নিরামিষ নিয়ে যে বিতর্কে জড়িয়েছে বিজেপি, তা ঘোচাতে মনোনয়নের সময়ে মাছ-যাত্রা করেছিলেন জিতেন্দ্র। তত্ত্ব সাজানোর মতো মাছ সাজিয়ে তা হাতে করে নিয়ে মনোনয়ন পেশ করেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন থাকছেই, এভাবে কি বাঙালির মন পাওয়া যাবে? নিজের গড় ফিরে পাবেন হেভিওয়েট জিতেন্দ্র?
