সংঘর্ষ বিরতির আগে ইরানের মাটিতে ইজরায়েল শেষ হামলা চালিয়েছিল তেহরানে ইহুদিদের একটি সিনাগগ বা প্রার্থনাস্থলে। এই ঘটনায় বিশ্বে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি ইজরায়েলের চরম শত্রু ইরানেও রয়েছে ইহুদিদের বাস? বাস্তব রিপোর্ট বলছে, কট্টর মুসলিম দেশ ইরান ইহুদিদের বাসস্থান তো বটেই, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে ইজরায়েলের পর সবচেয়ে বেশি ইহুদি বাস করেন এই দেশে। এই যুদ্ধ তাদের জন্য বয়ে আনছে অভিশাপ।
ইতিহাস বলছে, ইরানে ইহুদিদের ২৭০০০ বছরের ইতিহাস রয়েছে। এমনকী ইরানে রাষ্ট্র-স্বীকৃত ধর্মগুলির মধ্যে অন্যতম ইহুদি ধর্ম। যদিও ইরানে ইহুদিদের ইতিহাস রীতিমতো রক্তমাখা। বিংশ শতাব্দীতেও ইরানে ১ লক্ষ ইহুদির বাস ছিল। তবে বর্তমানে তা কমতে কমতে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজারে। ইহুদি জনসংখ্যায় এই বিরাট পতন ঘটেছে ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের পর। এই ইসলামিক বিপ্লবে অন্যতম ভূমিকা নিয়েছিল ইহুদিরাও। তবে খামেনেই ক্ষমতায় আসার পর নতুন করে ইহুদিদের উপর শুরু হয় নির্যাতন। যার জেরে বাধ্য হয়েই বেশিরভাগ ইহুদি ইরান ছেড়ে ইজরায়েলে চলে গেলেও ইরানের তেহরান, ইস্পাহান, শিরাজ, হামেদান ও তাবরিজে বাস করেন অনেকেই।
বিংশ শতাব্দীতেও ইরানে ১ লক্ষ ইহুদির বাস ছিল। তবে বর্তমানে তা কমতে কমতে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজারে।
যে ১০ হাজার ইহুদি বর্তমানে ইরানে বাস করেন তাদের জীবনে নেমে এসেছে দুর্ভোগ। রিপোর্ট বলছে, একটা সময় ইরানে সম্মানের সঙ্গে বাস করেছিলেন ইহুদিরা। ১৯০০-এর দশকের গোড়ার দিকে পারস্য সাংবিধানিক বিপ্লবের পর জরথুস্ত্রবাদী ও খ্রিস্টানদের পাশাপাশি ইহুদিদেরও সংখ্যালঘু মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। ইরানের সংবিধানে সংসদে ইহুদিদের জন্য একটি আসন সংরক্ষিত রয়েছে। তবে ইরানে ইহুদিদের পতনের শুরু রেজা শাহর আমল থেকে। এই রাজবংশের পতন ঘটাতে ইহুদিরা কমিউনিস্ট ও ইসলামপন্থীদের সাহায্যও করে। তবে পরে যা বিপদের কারণ হয়ে ওঠে তাদের জন্য। ইরানের মোল্লাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার পর এদের উপর নির্যাতন ব্যাপকভাবে বেড়ে যায় বহু ইহুদিকে ধর্ম পরিবর্তন করানো হয়। বাধ্য হয়ে ইজরায়েলে পালিয়ে যান তাঁরা।
বর্তমানে যে ইহুদিরা এখানে রয়েছেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এখানে বসবাসের ফলে তাঁরা শারীরিক, সাংস্কৃতিক এবং ভাষাগতভাবে অ-ইহুদি জনগোষ্ঠী থেকে অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছেন। এদের বড় অংশ ফারসিকে তাদের মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহার করে এবং একটি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু অংশ কুর্দি ভাষায় কথা বলে। সম্প্রতি তেহরানে এদেরই উপাসনাস্থলে হামলা চালিয়েছে ইজরায়েল। এই ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই নাড়িয়ে দিয়েছে ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের। যুদ্ধের জেরে একদিকে যখন ইজরায়েলের মার খেতে হচ্ছে ইরানি ইহুদিদের, অন্যদিকে তেমনই ইরানের মৌলবাদীদের সন্দেহের শীর্ষে রয়েছেন এই সম্প্রদায়ের মানুষেরা। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগও ওঠে তাঁদের বিরুদ্ধে। সব মিলিয়ে ইসলাম, ইজরায়েল ও ইতিহাসের ফাঁদে পড়ে রীতিমতো নাজেহাল হতে হচ্ছে ইরানের ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের।
