shono
Advertisement
Iran

মোল্লাতন্ত্রের অবসানে রাজতন্ত্র! ইরাকের মতোই 'ইসলামিক স্টেট' দেখবে না তো ইরান?

ধর্মতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্রের বদলে ইরানে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে ইরানের সাধারণ মানুষের কি কোনও সুরাহা হবে? আমেরিকার হস্তক্ষেপে সরকার গঠনের পর ইরাকে আইসিস জঙ্গিদের ও আফগানিস্তানে তালিবানের উত্থান ঘটেছে। ইরানও কি সেই পথে হাঁটবে?
Published By: Amit Kumar DasPosted: 09:49 AM Mar 03, 2026Updated: 04:39 PM Mar 03, 2026

মোল্লাতন্ত্র থেকে কি ফের রাজতন্ত্র?
ইরানের ভবিষ্যৎ যাত্রা নিয়ে এখন জোর জল্পনা। সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের শোকগাথা লেখা শুরু হয়ে গিয়েছে। ১৯৭৯ সালে শাহ রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে আয়াতোল্লাহ রুহুল্লা খোমেইনির নেতৃত্বে গঠিত ইসলামি প্রজাতন্ত্র অবশেষে পতনের মুখে দাঁড়িয়ে বলে মনে করা হচ্ছে। ১৯৮৯ সালে খোমেইনির মৃত্যুর পর থেকে বারবার ঘরে-বাইরে ইসলামি বিপ্লব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কিন্তু খোমেইনির যোগ্য উত্তরসূরি হিসাবে খামেনেই গত ৩৬ বছর সেসব সফলভাবে মোকাবিলায় সক্ষম হয়েছিলেন। এবার যেন সবকিছু তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে।

Advertisement

মোসাদ এবং সিআইএ যে এত সহজে সঠিক নিশানায় পৌঁছাতে পারবে, তা কল্পনার অতীত ছিল। যদিও মোসাদের সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষমতা প্রশ্নাতীত। একই কথা প্রযোজ্য সিআইএ-র ক্ষেত্রেও। তবুও ইরানি সেনা ও ইরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ তথা ইসলামি বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর ক্ষমতাকে খাটো করে দেখার সুযোগ ছিল না। খামেনেইয়ের আমলে ইরানের সামরিক ক্ষমতা-বৃদ্ধির সুস্পষ্ট প্রমাণ ছড়িয়ে রয়েছে। খামেনেইয়ের আস্তানা খুঁজে পাওয়া গিয়েছে এই তথ্য সিআইএ ও মোসাদের কাছ থেকে সুনিশ্চিত করেই যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবারের যৌথ অভিযান শুরু করেছেন, তা ভালই টের পাওয়া যাচ্ছে। খামেনেইয়ের সঙ্গে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, সেনাপ্রধান ও ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের ‘কমান্ডার ইন চিফ’-এর মৃত্যু হয়েছে বলে ইরান সরকার ঘোষণা করেছে। দেশের সর্বময় প্রধান ও যাবতীয় সেনাকর্তাদের যুদ্ধ শুরুর মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হারানোর পর ইরান সরকারের পক্ষে যে খুব বেশিদূর এই প্রতিরোধ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তা বলাই বাহুল্য। উপরন্তু একঘরে হয়ে যাওয়া ইরানের ‘সাপ্লাই লাইন’ বলে আর কিছু নেই।

ধর্মতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্রের বদলে ইরানে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে ইরানের সাধারণ মানুষের কি কোনও সুরাহা হবে? আমেরিকার হস্তক্ষেপে সরকার গঠনের পর ইরাকে আইসিস জঙ্গিদের ও আফগানিস্তানে তালিবানের উত্থান ঘটেছে। ইরানও কি সেই পথে হাঁটবে? না কি ইরানি জনতা মেনে নেবে শাহর পুত্রকে?

২০২৪ সালে সিরিয়ার বাশার-আল আসাদ সরকারের পতনের পর ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ বলে কথিত চার দেশের স্থলসেতু কার্যত ভেঙে গিয়েছে। এই পথে আগে লেবাননের হিজবুল্লা গোষ্ঠী এবং সিরিয়া ও ইরাকের শিয়াপন্থী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলির সঙ্গে ইরানের সামরিক সরঞ্জামের আদানপ্রদান চলত। দক্ষিণের সমুদ্রপথ দিয়ে ইরানকে সাহায্য করার কেউ নেই। এই পরিস্থিতিতে ভারতও চাবাহার বন্দর দিয়ে ইরানকে পণ্য পাঠাবে না। উত্তরের সীমান্ত দিয়ে রাশিয়া ইরানকে কতটা সামগ্রী সরবরাহ করতে পারবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

সংবাদমাধ‌্যমে প্রচার রয়েছে র‌্যাডার এড়িয়ে চিনের মালবোঝাই বিমান ইরানে নামছে। এই খবরের সত‌্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকেই। রাখঢাক না করে ট্রাম্প ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ তথা শাসক পরিবর্তনের বাসনার কথা প্রকাশ্যে বলেই দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমে খবর, ইরানের শাহ রাজবংশের শেষ রাজা মহম্মদ পাহলভির পুত্র যুবরাজ রেজা পাহলভি তেহরানে ফেরার জন্য ব্যাগ গোছাতে শুরু করেছেন। হোয়াইট হাউসের সবুজ সংকেত মিললেই তিনি নিউ ইয়র্ক থেকে তেহরানের বিমান ধরবেন।

খামেনেই ইরানের সর্বোচ্চ কর্তার আসনে বসে আমেরিকাকে ‘বড় শয়তান’ এবং ইজরায়েলকে ‘ছোট শয়তান’ আখ‌্যা দিয়েছিলেন। খামেনেই যেদিন থেকে ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির কর্মসূচিকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন, সেদিন থেকে ইজরায়েল ইরানে শাসক পরিবর্তনের লাগাতার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে।

যদি ইরানে দ্রুত ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর মধ্যে দিয়ে যুদ্ধ বন্ধ না হয়, তাহলে বিশ্বের সামনে বিরাট বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে। দু’-দিনেই জ্বালানি তেলের দাম ১৩ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে। বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচল বিপর্যস্ত। শেয়ারবাজারে ধস। কিছু দিন এইরকম চলতে থাকলে কোভিডের সময়ের চেয়েও বড় বিপর্যয় নেমে আসবে বিশ্ব অর্থনীতিতে। তবে এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে এমন ভাবনা করা বাস্তবসম্মত নয়। আবারও বলছি, এখনকার বিশ্বে একা একা যুদ্ধ করে কোনও শক্তির পক্ষেই টিকে থাকা সম্ভব নয়। দুবাই, দোহা, আবুধাবি, কুয়েত, বাহারিন ইত‌্যাদি দেশে যেভাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ছে, তাতে বোঝাই যাচ্ছে মুসলিম বিশ্বের এক হওয়ার ডাকে ইরানই বিশ্বাস করে না। খামেনেইয়ের মৃত্যু নিয়ে ভ্লাদিমির পুতিন কড়া বিবৃতি জারি করলেও, ইরানের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ অংশ নেওয়ার ক্ষমতা রাশিয়ার আর নেই। ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ করে তারা কার্যত নিঃশেষিত। বিমানে করে চিন সামরিক সরঞ্জাম ও অন্যান্য সাহায্য পাঠালেও পাঠাতে পারে, কিন্তু যুদ্ধে তারা জড়াবে না। বরং ইরানের ভবিষ‌্যৎ শাসক গোষ্ঠীর ছবিটা স্পষ্ট হলে চিন তাদের সঙ্গে তলে তলে ব‌্যবসায়িক যোগাযোগ শুরু করে দেবে। যেটা সদ্য ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও তারা করেছে। ইরানের ‘ছায়াশক্তি’র মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লা এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ইয়েমেনের হুথি এবং গাজার হামাস জঙ্গিগোষ্ঠী তেহরানের থেকে টাকা না পেলে কার্যত নখদন্তহীন। ইরানের বিদেশমন্ত্রী ইতিমধ্যে চাপে পড়ে জানিয়েছেন, কোনও ছায়াশক্তির সাহায‌্য তাদের প্রয়োজন নেই। ইরান নিজেদের লড়াই নিজেরাই লড়ে নেবে। তাঁর এই বক্তব্যে পরাজয়ের ইঙ্গিত স্পষ্ট।

ইরানে দ্রুত ‘রেজিম চেঞ্জ’ ঘটলে মধ‌্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। জেরুজালেম ও তেল আভিভের বাসিন্দারা সাড়ে চার দশকের বেশি পর নিশ্চিন্তে ঘুমতে যাবেন। ইরানে ক্ষমতায় আসার পর রুহুল্লা খোমেইনি ঘোষণা করেছিলেন, ইজরায়েলের অস্তিত্ব তাঁরা মেনে নেবেন না। খামেনেই ইরানের সর্বোচ্চ কর্তার আসনে বসে আমেরিকাকে ‘বড় শয়তান’ এবং ইজরায়েলকে ‘ছোট শয়তান’ আখ‌্যা দিয়েছিলেন। খামেনেই যেদিন থেকে ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির কর্মসূচিকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন, সেদিন থেকে ইজরায়েল ইরানে শাসক পরিবর্তনের লাগাতার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে। কারণ, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার মধ্যে থাকা ইজরায়েলের সবসময় আশঙ্কা, যে কোনও সময় তেহরান থেকে ছুটে আসা পরমাণু বোমা সাজানো গোছানো ইহুদি রাষ্ট্রটিকে মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে দেবে। ইরানের ইসলামি বিপ্লব পরাস্ত হলে ইজরায়লের সেই আশঙ্কার আপাতত অবসান হবে। হামাস, হিজবুল্লা ও হুথি জঙ্গিগোষ্ঠী দুর্বল হয়ে গেলে মধ্যপ্রাচ্যে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে যাবতীয় সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বন্ধ হবে বলে বিশ্বাস ট্রাম্পেরও। অন‌্যদিকে, ইরাকের পর ইরানেও পুতুল সরকার বসাতে পারলে মধ‌্যপ্রাচ্যের তৈলভাণ্ডারের উপর আমেরিকার আধিপত‌্য শক্তিশালী হবে।

যদি ইরানে দ্রুত ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর মধ্যে দিয়ে যুদ্ধ বন্ধ না হয়, তাহলে বিশ্বের সামনে বিরাট বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে। দু’-দিনেই জ্বালানি তেলের দাম ১৩ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে। বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচল বিপর্যস্ত। শেয়ারবাজারে ধস।

কিন্তু ধর্মতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্রের বদলে ইরানে মার্কিন হস্তক্ষেপে রাজতন্ত্র বা কোনও পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে ইরানের সাধারণ মানুষের কোনও সুরাহা কি আদৌ মিলবে? তাঁরা কি তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতা ফিরে পাবেন? ইরাক, লিবিয়া বা আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা হল আমেরিকার হস্তক্ষেপে সরকার গঠনের পর দেশে রক্তপাত ও প্রাকৃতিক সম্পদের লুটতরাজ বেড়েছে। ইরাকে আইসিস জঙ্গিদের ও  আফগানিস্তানে তালিবানের মতো শক্তির উত্থান ঘটেছে। ইরানও সেই পথে হাঁটতে পারে। ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ দেশকে ভয়ংকর গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে। ইসলাম বিপ্লবের সময় শাহ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল সাধারণ মানুষই। সেই শাহর পুত্রকে কি ফের ইরানি জনতা মেনে নেবে? অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করে ইরানে কোনও ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা সমস‌্যার কিছুটা সমাধান করতে পারে। তবে সেটাই বা কীভাবে সম্ভব?

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement