মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কি 'পাগলা দাশু'? তাঁর কঠোর অভিবাসী নীতি, আচমকা ভারত-সহ একাধিক দেশের উপর লাগামহীন শুল্ক আরোপ, দিল্লির আপত্তি উড়িয়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতার 'হাফসেঞ্চুরি' দাবি, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিনকে 'নির্লজ্জ সমর্থন', হামাসকে শায়েস্তা করতে গাজার দখল নেওয়া, আবার শান্তি কমিটি স্থাপন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ, বছর শেষে ইরান এবং গ্রিনল্যান্ডকে হুমকি। সবটাই খ্যাপামো? নাকি এই 'অ্যানার্কি' চরিত্র আসলে ভেবেচিন্তে নেওয়া কূটনৈতিক কৌশল? ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় দফায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে এক বছর পূর্ণ করেছেন ট্রাম্প। তাঁর একাধিক সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব পড়ল গোটা বিশ্বে?
শরণার্থী এবং অভিবাসীদের উপর কোপ
ইউএস হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তথ্য বলছে, গত এক বছরে ৬ লক্ষেরও বেশি মানুষকে আমেরিকা থেকে তাড়িয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর মধ্যে ৩, ৮১২ জন ভারতীয়। অন্তত ৬৬ হাজার ৮৮৬ জন অবৈধ অভিবাসী কিংবা শরণার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন দেশজুড়ে প্রায় ৮২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়াও এইচ-১বি ভিসার মূল্য আকাশচুম্বী ৮৮ লক্ষ টাকা করা হয়েছে। এই বিষয়ে নিয়ম কঠোর করা হয়েছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান-সহ ৭৫টি দেশের অভিবাসী ভিসা দেওয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে আমেরিকা। ট্রাম্পের অভিবাসী নীতির জেরে 'আমেরিকান ড্রিম' (উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকদের আমেরিকা যাওয়ার স্বপ্ন)-এর মৃত্যু হয়েছে।
গত এক বছরে ৬ লক্ষের বেশি মানুষকে আমেরিকা থেকে তাড়িয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
ভারত-সহ একাধিক দেশের উপর লাগামহীন শুল্কারোপ
রাশিয়া থেকে অশোধিত তেল কেনার অভিযোগে ভারতের উপরে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। বর্তমানে ভারতীয় পণ্যে তাদের মোট শুল্ক ৫০ শতাংশ। এছাড়াও চিনা পণ্যের ওপর ৩০-১৪৫ শতাংশ, কানাডার উপর ৩৫ শতাংশ, ব্রাজিলের উপর ৫০ শতাংশ, ইরানের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছে আমেরিকা। ট্রাম্পের 'আমেরিকা প্রথম' (America First) নীতি আদতে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সঙ্গে শুল্কযুদ্ধের সমতুল। সম্প্রতি ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভারতের উপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারির পরেই রাশিয়া থেকে তেল কেনার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ করেছে দিল্লি।
ভারতের উপরে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন।
ভারত-পাক সংঘর্ষবিরতিতে মধ্যস্থতার দাবি
নিজেকে বিশ্বশান্তির দূত হিসাবে প্রচার করতে মরিয়া ট্রাম্প। নিজেই নোবেল পুরস্কারের জন্য দরবার করেন। একবার নয়, বহুবার! বছরের শুরুতে দাবি করেন, বাণিজ্য সংক্রান্ত হুঁশিয়ারি দিয়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থামিয়েছেন তিনি। নচেৎ দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের যুদ্ধ ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছাত। গত আট মাস ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অন্তত ৫০ বার এই দাবি করেছেন। ভারত একাধিক বার তা অস্বীকার করলেও ট্রাম্প থামেননি। নতুন করে ফের বলেছেন, “১০ মাসে আটটা যুদ্ধ থামিয়েছি। তার মধ্যে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধও রয়েছে। ওদের না থামালে পরমাণু যুদ্ধ বেঁধে যেত! প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন।” প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্পের এই কৌশল কি ভারত-পাকিস্তান নিয়ে মার্কিন কূটনীতির কৌশলগত বদল?
গাজা ও ইউক্রেন যুদ্ধে মার্কিন অবস্থান
ইজরায়েল-হামাস যুদ্ধে ইজরায়েলের প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়িয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৪৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অধিকাংশই শিশু। ঘরছাড়া কয়েক লক্ষ। গাজা দখলের হুঁশিয়ারি দেওয়া ট্রাম্পের উদ্যোগেই পণবন্দিদের ছাড়ার শর্তে ২০২৫-এর ১০ অক্টোবরে সংঘর্ষবিরতি হয়েছে। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট উদ্যোগ নিয়ে শান্তি কমিটি তৈরি করছেন। যারা গাজা পুনর্গঠনের কাজ করবে। সেই কমিটিতে ডাক পেয়েছে ভারতও। যদিও ট্রাম্পের হাজার চেষ্টাতেও রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ থামানো যায়নি। গত কয়েক মাসে এই যুদ্ধের অবসানের জন্য অবশ্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তিনি। সাফল্য আসেনি। জেলেনস্কির সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন, কয়েক মাস আগে আলাস্কায় পুতিনের সঙ্গেও দেখা করেছেন। তবুও ২০২২ সাল থেকে চলা যুদ্ধের অবসান হয়নি। ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, পুতিনকে রুশ ভূখণ্ড পাইয়ে দেওয়ার শর্ত দিচ্ছেন ট্রাম্প। যা মেনে নেবেন না তাঁরা।
ট্রাম্পের হাজার চেষ্টাতেও রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ থামানো যায়নি।
রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৪৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, অধিকাংশই শিশু।
ভেনেজুয়ালার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে অপহরণ
ট্রাম্পের নির্দেশে ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর মাত্র দু’ঘণ্টার অভিযানে সস্ত্রীক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করেছে মার্কিন সেনা। আমেরিকার অভিযোগ, সর্বশেষ নির্বাচনে বামপন্থী মাদুরো রিগিং করে ক্ষমতায় ফিরেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক চক্র চালানোর অভিযোগও আনা হয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভেনেজুয়েলার তেলের খনিগুলির দখল নিতেই প্রকাশ্য়ে দাদাগিরি করেছে আমেরিকা। ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালানো নিয়ে আমেরিকার বিরোধিতা করা দেশগুলিকেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভারত এই সাবধানী দূরত্ব রাখছে।
বছর শেষে ইরান ও গ্রিনল্য়ান্ড নিয়ে আগ্রাসী অবস্থান
সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল ইরান। সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের সরকারের পতন চেয়ে রাজপথে নেমেছেন বহু মানুষ। সেই বিক্ষোভ-আন্দোলন দমনে ইরান সরকার যে ভাবে বলপ্রয়োগ করছে, তা নিয়ে ‘ক্ষুব্ধ’ ট্রাম্প। দেশটিতে প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, ২৬ হাজারেরও বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। এই অবস্থায় ইরানে সরকার বদল প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এই আবহে তেহরানও পালটা হুঁশিয়ারি দিয়েছে ওয়াশিংটনকে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের মেঘ! সামরিক অভিযান চালিয়ে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ করার হুমকি দিয়েছে আমেরিকা। ওয়াশিংটনের এই মন্তব্যের সমালোচনাও করেছে ইউরোপের একাধিক দেশ। গ্রিনল্যান্ড এবং ডেনমার্কের পাশে দাঁড়িয়েছে নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, নেদারল্যান্ড, ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলি। এই 'অপরাধে' ডেনমার্ক-সহ এই আটটি দেশের উপরে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছেন ট্রাম্প। যদিও গ্রিনল্যান্ডের প্রশ্নে ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়েছেন পুতিন। শেষ পর্যন্ত কি গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন থাকবে?
সামরিক অভিযান চালিয়ে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ করার হুমকি দিয়েছে আমেরিকা।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছে, বছরভর ট্রাম্পের এই যাবতীয় কাণ্ডে খ্যাপামো নেই মোটেই। বরং সুকৌশলে মার্কিন আধিপত্যবাদকে নতুন করে গোটা বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন ট্রাম্প। একটা সময় পৃথিবীর দখলদারিতে রাশিয়া ও আমেরিকার যে ভাগাভাগি চালাত, আজ সেখানে নাক গলাচ্ছে নতুন বিশ্বশক্তি চিন। সেই ড্রাগনকে চেপে ধরতেই রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে বন্ধুত্ব বাড়চ্ছেন ট্রাম্প। সেই কারণেই কি ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার স্বার্থসিদ্ধিতে সিলমোহর? প্রশ্ন হল, ন্যাটোর সঙ্গে বন্ধুত্ব ভেঙে, ভারতের সঙ্গে শুল্ক বৈরতায় গিয়ে কত দূর সফল হবে এই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ? প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে ওয়াকিবহাল মহল।
