আমেরিকার-ইজরায়েলের বিরুদ্ধে 'অঙ্কের যুদ্ধ' শুরু করেছে ইরান। মুহুর্মুহু দামি দামি মিসাইল বর্ষণ নয়, আপাতত সস্তার ড্রোন দিয়ে কাজ সারছে তারা। তাতে ইতিমধ্যেই আমেরিকার কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে গিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এভাবে যুদ্ধ গড়ালে আগামী ১০ দিনের মধ্যেই পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন অস্ত্রের ভাঁড়ারেও টান পড়তে পারে। এমনই দাবি করা হচ্ছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে।
গত শনিবার সকালে আচমকাই ইরানের উপর যৌথ ভাবে হামলা চালায় আমেরিকা এবং ইজরায়েলের বাহিনী। তেহরানে লাগাতার বোমাবর্ষণে নিহতও হন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-সহ সে দেশের অন্তত ৪০ জন উচ্চপদস্থ কর্তা। তার পর ইরানও প্রত্যাঘাত করে। কিন্তু আমেরিকা বা ইজরায়েলের মতো তা এতটা জোরালো নয়। ইজরায়েলের পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার যে সব দেশে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেই সব দেশে হামলা চালায় তেহরান। লক্ষ্যবস্তু ছিল মার্কিন ঘাঁটি, দূতাবাস, বিমানবন্দর এবং কিছু অসামরিক পরিকাঠামো। মূলত ঘাতক ড্রোন দিয়েই সেই সব হামলা চালিয়েছে ইরান। মিসাইলও ব্যবহারও করেছে তারা। কিন্তু সেই সংখ্যাটা তুলনায় অনেক কম।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, ইরান চাইছে এই সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে। তাদের কৌশল হল, পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতা বজায় থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য মার খাবে। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা এবং ইজরায়েলের উপর চাপ সৃষ্টি করবে তাদের বন্ধুদেশগুলি। এই বিষয়টি উসকে দিতেই বাহরিন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েতের মতো আমেরিকার বন্ধুদেশগুলিকে নিশানা করেছে তেহরান।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, আমেরিকা বা ইজরায়েল ভেবেছিল, শীর্ষনেতাদের খতম করে দিলেই আত্মসমর্পণ করবে ইরান। কিন্তু গত পাঁচ দিনের গতিপ্রকৃতিতেই স্পষ্ট, তাদের সেই অনুমান মেলেনি। উলটে এটা স্পষ্ট যে, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়েই মাঠে নেমেছে তেহরান। সেই মতো তাদের রণনীতিও আগে থেকেই তৈরি ছিল এবং তা কাজেও দিচ্ছে। আমেরিকা বা ইজরায়েল যেভাবে উন্নতমানের যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করছে, ইরান তা করছে না। বরং, মাঝারি মানের ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালাচ্ছে তারা। তা দিয়েই আমেরিকার এবং ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছে তেহরান, যাতে পরে উন্নতমানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়। শুধু তা-ই নয়, ইরানের সেই সব ঘাতক ড্রোন প্রতিহত করতে বিপুল আর্থিক ক্ষতিও হচ্ছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট বলছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই ৭৭.৯০ কোটি ডলার খরচ হয়েছে আমেরিকার। পরের তিন দিনে তা পৌঁছে গিয়েছে ১২৪ কোটি ডলারে। যদিও সার্বিক ভাবে এতে কিছুই যায়-আসে না ওয়াশিংটনের। কারণ, প্রতিরক্ষা খাতে তাদের প্রায় এক লক্ষ কোটি ডলারের কাছাকাছি। কিন্তু খরচের তুলনামূলক বিচারে তা ট্রাম্প প্রশাসনের যথেষ্ট অস্বস্তির কারণ। ইরানের হামলা প্রতিহত করতে আমেরিকা যে সব মিসাইল ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করছে, তার জন্য প্রতিবার ১০-৩০ লক্ষ ডলার খরচ হচ্ছে তাদের। সেই তুলনায় ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইলের খরচ অনেক কম। অন্য দিকে, ইরানের এক একটি 'শাহিদ' ড্রোনের দাম ৩০-৫০ হাজার ডলার। কিন্তু এই সব ড্রোনকে প্রতিহত করতেই লক্ষ লক্ষ ডলারের মিসাইল ব্যবহার করতে হচ্ছে আমেরিকাকে। সেই সূত্রেই আশঙ্কা, ইরানের হামলা আটকাতে যেভাবে মিসাইল ব্যবহার করতে হচ্ছে আমেরিকাকে, তাতে শীঘ্রই পশ্চিম এশিয়ায় তাদের প্যাট্রিয়ট এবং টম্যাহক মিসাইনের ভান্ডারে টান পড়তে পারে। এতে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে আকাশ প্রতিরোধ ব্যবস্থাই।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, ইরান চাইছে এই সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে। তাদের কৌশল হল, পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতা বজায় থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য মার খাবে। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা এবং ইজরায়েলের উপর চাপ সৃষ্টি করবে তাদের বন্ধুদেশগুলি। এই বিষয়টি উসকে দিতেই বাহরিন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েতের মতো আমেরিকার বন্ধুদেশগুলিকে নিশানা করেছে তেহরান। বিশেষজ্ঞদের দাবি, ইরানের ছক, আমেরিকার অস্ত্রভাঁড়ারে টান পড়লে, আকাশ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে তারা অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা শুরু করবে। ইরানের ভাঁড়ারে এরকম প্রায় ২৫০০ উন্নতমানের ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে বলেও দাবি।
যদিও ইরানের এই রণনীতি কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে সংশয়ে সামরিক বিশেষজ্ঞদের অনেকে। তাদের যুক্তি, অস্ত্রের ভাঁড়ার অক্ষত রেখে লাভ হবে না, যদি মিসাইল লঞ্চারই ধ্বংস করে দেয় শত্রুপক্ষ। আমেরিকা এবং ইজরায়েলও সেই চেষ্টা করছে। তেল আভিভের দাবি, তারা ইতিমধ্যেই ইরানের ৫০ শতাংশ মিসাইল লঞ্চার ধ্বংস করে দিয়েছে। কিন্তু তেমনটা যদি না ঘটে থাকে, তাহলে এই সংঘাত আরও বেশি দিন গড়াবে বলেই মনে করছেন অনেকে। বিশেষজ্ঞদের মত, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার অস্ত্রভান্ডারে স্বাভাবিক ভাবেই টান পড়বে। তা নিয়ে ওয়াশিংটন যথেষ্ট আশঙ্কিত। চিন-রাশিয়ার সঙ্গে যদি কখনও সংঘাত বাধে, তা মোকাবিলার জন্যই এতদিন ধরে অস্ত্রভান্ডার পরিপূর্ণ রেখেছিল তারা। তা ধীরে ধীরে খালি হয়ে গেলে মার্কিন সেনার ঝুঁকিও বেড়ে যাবে। অন্য দিকে, চাপ বাড়বে ইজরায়েলে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকারের উপরেও। এই কারণেই আমেরিকা এবং ইজরায়েল চাইছে দ্রুত সংঘাত শেষ করতে। আর ইরান চাইছে দীর্ঘায়িত করতে।
