বিপ্লব হল আমৃত্যু সংগ্রাম৷ অতীত থেকে ভবিষ্যতের পথে যার নিরন্তর যাত্রাপথ৷ ঠিক এই ভাষাতেই পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থার মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছিলেন বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রো। অকুতোভয়ে কড়া হাতে মোকাবিলা করেছিলেন মার্কিন আগ্রাসনকে। শুধু মোকাবিলা নয়, তা ব্যর্থও করেছিলেন তিনি। সেই ঐতিহাসিক অধ্যায়ের পর কেটে গিয়েছে বহু দশক। চিরঘুমে চলে গিয়েছেন ‘কিউবার অবিভাবক’ ফিদেল। এই পরিস্থিতিতে ফের কিউবা দখলের নীলনকশা বানিয়েছে আমেরিকা!
দীর্ঘ সংঘাতের পর আশঙ্কা সত্যি করে সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়েছে মার্কিন সেনা। পাশাপাশি, অপহরণ করা হয়েছে সেদেশের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে। সাম্প্রতিক অতীতে এই নজিরবিহীন ঘটনায় হতবাক গোটা বিশ্ব। তার রেশ কাটতে না কাটতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে লাতিন আমেরিকার একাধিক দেশ-সহ কিউবার উপরেও।
রবিবার কিউবাকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে শীঘ্রই চুক্তি করতে হবে হাভানাকে। কথার অমান্য করলে পরিণতি হবে ভয়ংকর। পাশাপাশি, তিনি ঘোষণা করেছেন, ভেনেজুয়েলার তেল আর কিউবাতে প্রবাহিত হবে না। কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ট্রাম্পের এহেন মন্তব্যে স্পষ্ট যে তাদের পরবর্তী লক্ষ কিউবা।
সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লেখেন, ‘কিউবা বহু বছর ধরে ভেনেজুয়েলা থেকে আসা বিপুল পরিমাণ তেল এবং অর্থের উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। বিনিময়ে হাভানা ভেনেজুয়েলাকে নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরিষেবা দিত।’ তাঁর দাবি, গত সপ্তাহে আমেরিকার হামলায় বহু কিউবানের মৃত্যু হয়েছে। তারা ভেনেজুয়েলাকে পণবন্দি বানিয়ে রেখেছিল। এই সব দুষ্কৃতীদের নিকেশ করা হয়েছে।’
অন্যদিকে, ট্রাম্পকের হুমকি ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে কিউবা। সে দেশের বিদেশমন্ত্রী ব্রুনো রডরিগেজ বলেন, “যে কোনও কিউবার দেশ থেকেই জ্বালানি আমদানি করার অধিকার কিউবার রয়েছে। আমেরিকার একতরফাভাবে বলপ্রয়োগ করার সংস্কৃতি আমরা মানব না।” কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল সমাজমাধ্যমে বলেন, “যারা সবকিছুকে ব্যবসায় পরিণত করে, এমনকী মানুষের জীবনকেও, তাদের কিউবার দিকে আঙুল তোলার কোনও নৈতিক অধিকার নেই। কারও হুমকিতে আমরা মাথা নত করব না”
আসলে কিউবা দখলের চেষ্টা আমেরিকার এই প্রথম নয়। ইতিহাসের পাতা ওলটালে প্রথমেই যেটা উঠে আসবে তা হল ‘বে অফ পিগস’ অভিযান। ঠিক কী হয়েছিল এই অভিযানে?
সালটা ১৯৬১। কিউবায় তখন সদ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কাস্ত্রোর সমাজতান্ত্রিক সরকার। কিন্তু তা সহ্য হয়নি আমেরিকার। কাস্ত্রোর সরকারকে উৎখাত করতে এবং কিউবার শাসন পরিবর্তন করতে গোপনে এই অভিযানের ঘুঁটি সজায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। অভিযানে কাজে লাগানো হয় প্রায় ১৫০০ জন নির্বাসিত কিউবান সৈন্যকে। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল আমেরিকা। ১৯৬১ সালের এপ্রিল মাসে কিউবার দক্ষিণ উপকূলে তাঁরা পা রাখেন। আমেরিকার লক্ষ্য ছিল, এই অভিযানের মাধ্যমে কিউবার সাধারণ মানুষকে কাস্ত্রো সরকার বিরুদ্ধে নিয়ে যাওয়া এবং গণবিক্ষোভ সৃষ্টি করা। কিন্তু আমেরিকার সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়। কিউবার জনগণ এবং সেনা দেশকে রক্ষা করতে রক্তাক্ষয়ী সংঘাতে শামিল হয়। একটি আঁচও পড়েনি কাস্ত্রো সরকারের গায়ে। মাত্র তিনদিনের মধ্যেই আমেরিকার সব পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। কিউবা সেনার প্রত্যাঘাতে মৃত্যু হয় শতাধিক হামলাকারীর। বন্দিও করা হয় অনেককে। এরপরই বিশ্বমঞ্চে সমালোচনার মুখে পড়ে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির সরকার।
