শুল্ক ইস্যুতে আমেরিকার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি দেখে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে বলে জানালেন বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। আজ বুধবার দুপুরে ঢাকায় সচিবালয়ে গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় একথা বলেন তিনি। সূত্র জানিয়েছে, আমেরিকার বাণিজ্যচুক্তি এখন অনিশ্চয়তার মুখে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত পালটা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করার পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে। এর মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন নতুন শুল্ক আরোপ করা হবে বলে ঘোষণা করেছে, যার একটি অংশ ইতিমধ্যে কার্যকর হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ-আমেরিকা বাণিজ্যসম্পর্ক, বিশেষ করে ৯ ফেব্রুয়ারি সই হওয়া ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেডের (এআরটি)’ ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বুধবার ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রক। বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব-সহ ঊর্ধ্বতন আধিকারিকদের পাশাপাশি বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন-সহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। লক্ষ্য— বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের করণীয় নির্ধারণ।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও আমেরিকার মধ্যে পালটা শুল্কের প্রেক্ষাপটে একটি বাণিজ্যচুক্তি সই হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ১৯ শতাংশ শুল্ক ধার্য করে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে শর্ত ছিল— মার্কিন তুলা ব্যবহার করলে শূন্য শুল্কে রপ্তানির সুযোগ পাওয়া যাবে। বিনিময়ে বাংলাদেশকে আমেরিকা থেকে বিপুল পরিমাণ তুলা, সয়াবিন এবং অন্তত চারটি বোয়িং বিমান কিনতে হবে। কিন্তু মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আরোপিত পালটা শুল্কের এখতিয়ার বাতিল করায় প্রশ্ন উঠেছে— যে শুল্কের ভিত্তিতে চুক্তি, সেই ভিত্তিই যদি না থাকে, তাহলে চুক্তির অবস্থান কী হবে? ব্যবসায়ীরা বলছেন, পালটা শুল্ক বাতিল হলে চুক্তির যৌক্তিকতাও দুর্বল হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ট্রাম্প প্রশাসন আবার নতুন করে বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করবে বলে ঘোষণা করেছে। মঙ্গলবার থেকে ১০ শতাংশ হারে নতুন শুল্ক কার্যকর হয়েছে। যদিও ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে, তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়নি।
ট্রাম্প তার মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের সুযোগ নিয়ে যদি কোনও দেশ আমেরিকার সঙ্গে ‘খেলা’ করার চেষ্টা করে, তাহলে তাদের ওপর আরও কঠোর শুল্ক আরোপ করা হবে। এই অবস্থায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে দ্বৈত উদ্বেগ— একদিকে বিদ্যমান ১৯ শতাংশ শুল্ক চুক্তির ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে নতুন ঘোষিত বৈশ্বিক শুল্ক কাঠামো। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, আমেরিকার আদালত যে এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, সেটি তাদের অভ্যন্তরীণ আইনগত বিষয়। এখন আমেরিকা ১২২ ও ৩০১ ধারার আওতায় কী ধরনের শুল্ক আরোপ করবে, সেটি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কারণ এরই মধ্যে যে শুল্ক আদায় হয়েছে, তার ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। তিনি বলেন, “আমেরিকার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে সব দিক পর্যালোচনা করা হবে।”
বিকেএমইএর সভাপতি মহম্মদ হাতেম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা জরুরি। এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামিম এহসানও একই মত দেন। তার ভাষ্য, চুক্তিটি পুরোপুরি বাতিল না করে দুই পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে পুনর্গঠন করা উচিত। ব্যবসায়ীরা আরও বলছেন, যদি চুক্তি কার্যকর না থাকে, তাহলে আমেরিকা যে সাধারণ শুল্ক হার নির্ধারণ করবে, সেটিই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশের সামনে এখন প্রশ্ন— আমেরিকার সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি পুনর্বিবেচনা করবে, নাকি নতুন বৈশ্বিক শুল্ক কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করবে? একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্যচুক্তি এগিয়ে নেওয়া হবে কিনা, তাও বিবেচনায় আসছে।
