ভোটে লড়লে আওয়ামি লিগই জিতত। বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামি লিগকেই ভোট দেবেন। তাই তাঁর দলকে নিষিদ্ধ করে 'গায়ের ঝাল' মেটানো হয়েছে বলে দাবি করলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মুখ খুললেন জামাত-এনসিপির জোট এবং বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, সদ্যপ্রয়াত খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন নিয়েও।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন। এই ভোটে লড়ছে না হাসিনার আওয়ামি লিগ। জুলাই আন্দোলনের জেরে হাসিনা দেশান্তরী হওয়ার পর মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামি লিগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তা নিয়ে সংবাদ প্রতিদিন-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাসিনা বলেন, "মহম্মদ ইউনুসের সরকার আওয়ামি লিগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে। বাংলাদেশের জনগণ আমাদের ৯ বার ভোট দিয়ে জয়ী করেছে। অর্থাৎ, হলফ করে বলা যায়, বাংলাদেশের জনগণকে যদি নির্বিঘ্নভাবে ভোটদানের সুযোগ করে দেওয়া হয়, তারা আমাদেরই ভোট দেবে, নির্বাচিত করবে। অন্তর্বর্তীকালীন এই সরকার সব জেনেবুঝেই ব্যালট বাক্সের লড়াইয়ে আমাদের সামনে পড়তে চাইছে না। নিষিদ্ধ ঘোষণা করে গায়ের ঝাল মিটিয়েছে।"
হাসিনার মত, আওয়ামি লিগকে বাদ দিয়ে আর যাই হোক, সেই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠ বা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে পারে না। তাই এই ভোটপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত কোনও সরকারই তথাকথিত গণতান্ত্রিক বৈধতা দাবি করতে পারে না। তাঁর যুক্তি, "বাংলাদেশের জনগণ যদি আমাদেরকে ভোট না দেয়, তাহলে সেই ভোটের সদর্থ নিষ্পন্ন হয় না। ঐতিহাসিকভাবেই এ কথা সত্য। ৩০ শতাংশের বেশি ভোটার এবার নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়েছে। তাহলে এই নির্বাচনে জিতে যে-ই সরকার গড়ুক না কেন, তার কর্তৃত্ব তাৎক্ষণিক এবং তা অচিরেই গভীর সংকটের মুখে পড়তে বাধ্য।"
হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে যে ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে জুলাই আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তাঁদেরই একাংশ পরে এনসিপি গঠন করেন। ছাত্রদের এই দল এবারের ভোটে জামাতের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে লড়বে। হাসিনার মত, বাংলাদেশের যে তরুণ প্রজন্ম সমৃদ্ধি এবং সুযোগের আশায় এনসিপিতে যোগ দিয়েছিল, তারা এখন প্রতারিত। কারণ এনসিপি প্রতিশ্রুতি রাখেনি। জুলাই আন্দোলনের সময় থেকেই হাসিনা-বিরোধী ছাত্রনেতাদের জামাতের 'বি টিম' আখ্যা দিয়েছিলেন অনেকে। ধীরে ধীরে তা-ই সত্য প্রমাণিত হল বলে জানালেন হাসিনা। তিনি বলেন, "এনসিপি প্রাথমিক ভাবে যুব আন্দোলনের মুখ হিসাবে নিজেদের তুলে ধরেছিল। তারপর দেখা গেল, কয়েক মাসের মধ্যেই এনসিপি নেতারা এমন এক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট বাঁধলেন, যে দল '৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিল। ক্রমে আমরা এও দেখলাম, এই রাজনৈতিক দলটির কেষ্টুবিষ্টু নেতাগণ যুদ্ধাপরাধী। হুমকি দিয়ে, হিংসা ছড়িয়ে, রক্তপাত ঘটিয়ে জামাত তাদের পক্ষে ভোট নিশ্চিত করতে চায়। ফলে, কার আসল শক্তি কোথায় নিহিত, তা তো দিনের আলোর মতো স্পষ্ট! গোঁড়া ইসলামি মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারা (এনসিপি) তো বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানকে তছনছ করে দিতে চায়।"
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর সংযোজন, "আওয়ামি লিগের সবচেয়ে বড় অর্জনের একটি ছিল, দেশের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদকে মাথা তুলতে না দেওয়া এবং এমন একটি সহিষ্ণু এবং উদার সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে বিভিন্ন ধর্মালম্বী মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে পারবে। নতুন রাজনৈতিক জোট সেই সমস্ত অগ্রগতিকে খর্ব করার খেলায় মেতেছে।"
আওয়ামি লিগ লড়াইয়ের ময়দানে না থাকায় এবারের ভোটে জামাত এবং এনসিপির জোট একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। স্বেচ্ছানির্বাসন কাটিয়ে তারেক দেশে ফিরে আসায় তারাও নতুন করে উজ্জীবিত। খালেদার প্রয়াণের বিএনপির দায়িত্বভারও আনুষ্ঠানিক ভাবে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তারেক। তাঁর প্রত্যাবর্তন নিয়ে এই প্রথম বার মুখ খুললেন হাসিনা। তিনি বলেন, "তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের পুনর্নবীকরণ বা সংস্কারের সূচক নয়। বরং এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক জলবায়ুকে আরও পশ্চাদমুখী করে তুলবে।"
হাসিনার আমলেই একাধিক দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ হয়ে দেশ ছেড়ে লন্ডনে গিয়ে স্থায়ী ভাবে বসবাস করা শুরু করেছিলেন তারেক। সেই হাসিনা দেশান্তরী হওয়ার পর তিনিও ফিরেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে যত মামলা দায়ের হয়েছিল হাসিনার আমলে, তা থেকেও মুক্ত হয়েছেন তারেক। হাসিনা বলেন, "বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের চড়া মূল্য দিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে নির্বাসনে থেকে নিশ্চিন্তের জীবন কাটানোর ফলেই রোজকার সংগ্রাম ও বাস্তবতা থেকে তারেক অনেক দূরে। তাছাড়া আমি বিশ্বাস করি না, বাংলাদেশ এমন ব্যক্তির কাঁধে ভর করে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, যাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার চরমপন্থী শক্তির সঙ্গে জোট বেঁধে এবং হিংসামন্থনের দ্বারা সংজ্ঞায়িত।"
হাসিনার দাবি, "সূত্রের মারফত যেটুকু খবর পেয়েছি, বিএনপি কর্মীরা নাকি এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি, সাধারণ নির্বাচনে তাদের পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য জনগণকে ভয় দেখাচ্ছে, তাদের উপর বলপ্রয়োগ করছে। এই কি গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন?"
