বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে লড়ছে না প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল আওয়ামি লিগ। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভোটের ময়দানে আছে তারা! দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোটদানের যা হার, তাতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মত, আওয়ামি লিগের বিরাট অংশের ভোটারেরা এই নির্বাচন থেকে দূরেই থেকেছেন। অন্তত এখনও পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত যদি এই ধারাই অব্যাহত থাকে, তাহলে তা ভোটের ফলাফলেও বড় প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বাংলাদেশে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, দুপুর ১২টা পর্যন্ত দেশের ৩২,৭৮৯টি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৩২.৮৮ শতাংশ। বাংলাদেশে সবমিলিয়ে মোট ভোটকেন্দ্রে সংখ্যা ৪২ হাজারের বেশি। কমিশন জানিয়েছে, দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঢাকা ও সিলেটে ভোট পড়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। অনেকের মত, এবার 'নো বোট, নো ভোট' স্লোগান দিয়ে নির্বাচন বর্জন করার যে ডাক দিয়েছিল আওয়ামি লিগ, তা যে সফল হয়েছে, ভোটদানের হারেই স্পষ্ট।
ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা জয় বন্দ্যোপাধ্যায় (নাম পরিবর্তিত) বলেন, "আমাদের এখানে শান্তিপূর্ণ ভাবেই ভোট হচ্ছে। তবে হিন্দু ভোটারদের অনেকে আওয়ামি সমর্থক, তাঁরা ভোট বয়কট করেছেন। কেউ কেউ অবশ্য ভোট দিচ্ছেনও। আমি ও আমার পরিবার রাস্তাঘাটে ঝামেলার আশঙ্কায় ভোট দিইনি। একটা ভয় তো থেকেই যায়।"
প্রসঙ্গত, আওয়ামি লিগের নির্বাচনী প্রতীক ছিল নৌকা। ভোটে আওয়ামি লিগকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সিরাজগঞ্জে অভিনব প্রতিবাদ করেছেন এক ভোটার। ব্যালট পেপারে তিনি লিখলেন, 'নৌকা ছাড়া কিসের ভোট! জামায়াত রাজাকার, বিএনপি চোর!' সেই পোস্ট নিজেদের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে শেয়ার করেছে আওয়ামি লিগ। হাসিনার দলের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত গোপালগঞ্জের দিকে বিশেষ নজর ছিল এই ভোটে। সেখানে ভোটদানের হার অনেকটাই কম। প্রসঙ্গত, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মস্থান। তাঁর সমাধিস্থলও সেখানে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী হাসিনাও গোপালগঞ্জ-৩ আসন থেকেই ভোটে লড়তেন হাসিনা।
তবে শুধু যে আওয়ামি লিগের ভোট-বয়কটের কারণেই ভোটদানের হার 'কম', তা নয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ, ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের তুমুল নৈরাজ্য চলছে দিকে দিকে। হিংসা-হানাহানির ঘটনাও ঘটছে। এর জেরে অনেকেই ভোট দিতে বেরোচ্ছেন না, বিশেষত হিন্দুরা। যদিও এই সংক্রান্ত কোনও পরিসংখ্যান এখনও প্রকাশ করেনি নির্বাচন কমিশন। জাতীয় পার্টির নেতা, প্রাক্তন সেনাশাসক এইচএম এরশাদের ভাই জিএম কাদের বলেন, "হাসিনার আমলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো ছিল। হাসিনা উৎখাত হওয়ার পর নৈরাজ্য অনেক বেড়ে গিয়েছে দেশে।" মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজনীতিতে মহিলাদের অংশগ্রহণ কমে গিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে জুলাই আন্দোলনের নেত্রী উমানা ফতেমা। পরিবর্তে ধর্মকেন্দ্রীয় এমন রাজনীতির উত্থান হয়েছে, যা আদতে মহিলাদের অধিকারকেই খর্ব করতে চায়। উমানার অভিযোগ, ভোটেও এই প্রবণতার প্রভাব পড়েছে।
ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা জয় বন্দ্যোপাধ্যায় (নাম পরিবর্তিত) বলেন, "আমাদের এখানে শান্তিপূর্ণ ভাবেই ভোট হচ্ছে। তবে হিন্দু ভোটারদের অনেকে আওয়ামি সমর্থক, তাঁরা ভোট বয়কট করেছেন। কেউ কেউ অবশ্য ভোট দিচ্ছেনও। আমি ও আমার পরিবার রাস্তাঘাটে ঝামেলার আশঙ্কায় ভোট দিইনি। একটা ভয় তো থেকেই যায়।" বরিশাল পিরোজপুরের বাসিন্দা তন্ময় হালদার (নাম পরিবর্তিত)-ও বলেন, "গ্রামে গোলমাল নেই। আশপাশের গ্রামেও মোটের উপর শান্তিপূর্ণ ভাবেই ভোট চলছে। তবে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষেই ভোটের হার কম। এর মধ্যেই অবশ্য হিন্দুদের একাংশ ভোট দিচ্ছেন। সবাই ছুটির দিন উপভোগ করছে।"
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান অবশ্য বাংলাদেশবাসীকে নির্ভয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভোট দিতে যাওয়ার অনুরোধ করেছে। তিনি বলেন, "সবাইকে অনুরোধ করব, সম্মানিত ভোটারদের অনুরোধ করব, আপনারা নির্ভয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে পোলিং স্টেশনে যাবেন এবং ভোট দেবেন।" সকাল সাড়ে ১০টার পর রাজধানীর আদমজি ক্যান্টনমেন্ট কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন সেনাপ্রধান। পরে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য, "আজকে আমাদের জাতির জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন, আনন্দের দিন। আমরা গত দেড় বছর এ দিনটার অপেক্ষায় ছিলাম।"
তবে সেনাপ্রধানের দাবি, দেশে শান্তিপূর্ণ এবং অনুকূল পরিবেশেই নির্বাচন হচ্ছে। তাঁর কথায়, "আমি সকালে খবর নিয়েছি, সারা বাংলাদেশে কোথায় কী ঘটছে। আমার কাছে যে খবর, অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন চলছে। এই দিনটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। যারা ভোট দিতে পারছেন না মিডিয়ার লোকজন আপনারা কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন। সারা দেশের পরিস্থিতি জনগণকে জানাচ্ছেন। জনগণ আশ্বস্ত হচ্ছেন। তারা ভোট দিতে যাচ্ছেন। ভোট দেওয়ার জন্য উৎসাহী হচ্ছেন।"
