সুমিত বিশ্বাস, বাঘমুন্ডি (পুরুলিয়া): একসাথে লুপ্তপ্রায় বিরহোড় জনজাতির ৪ কিশোরী মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়েছিল। ২০২৫ সালে বিরহোড় কন্যাদের এই সাফল্য সাড়া ফেলেছিল জঙ্গলমহলে। কিন্তু ওই শিক্ষা বর্ষ শেষে নতুন শিক্ষাবর্ষের সূচনায় দেখা যাচ্ছে ওই চার জনের মধ্যে দুই বিরহোড় কিশোরী এখন 'শিশু শ্রমিক'! কারণ পরিবারের কথামতো এবং তাদের মাধ্যমিক এডমিট কার্ড অনুযায়ী তাদের বয়স ১৮-র নিচে। একজনকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হওয়ায় ওই কিশোরী বাল্যবিবাহেরও শিকার! শিক্ষা দপ্তর থেকে ব্লক প্রশাসন ওই ৪ বিরহোড় ছাত্রীকে তাদের সাফল্যের জন্য সংবর্ধনা জানাতে গ্রামে গেলেও ওই দুই কন্যাকে স্কুলছুট থেকে আটকাতে পারেনি। পেটের দায়ে তারা এখন ঝাড়খন্ডে কাজ করে।
তাদের নাম পদ্মাবতী শিকারী ও শম্পা শিকারি। দু'জনের বাড়ি পুরুলিয়ার (Purulia) বাঘমুন্ডির ভূপতি পল্লীতে। এই জেলার বাঘমুন্ডি-সহ ঝালদা এক, বলরামপুর মিলিয়ে তিনটি ব্লকে বিরহোড়দের কলোনি রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিরহোড় রয়েছে বাঘমুন্ডির ভূপতি পল্লীতে। পদ্মাবতী মাধ্যমিকে পেয়েছিল ১৮৭। শম্পার প্রাপ্ত নম্বর ছিল ২২০। এছাড়া তাদের সঙ্গে সাফল্যের মুখ দেখেছিল দিবিয়া শিকারী, মালা শিকারি। তারা ঝালদা ১ নম্বর ব্লকের কুটিডি হাইস্কুলে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হলেও তাদেরই দুই বন্ধু পদ্মাবতী ও শম্পা এখন ঝাড়খন্ডে কাজ করে নিজেদের পেট চালাচ্ছে। এমন কথা জানা গিয়েছে তার পরিবার সূত্রেই। অথচ তাদের কৈশোরটা শুরু হয়েছিল একসাথে বাঘমুন্ডির ধসকাতে পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু আদর্শ আবাসিক বিদ্যালয়ে। ওই হোস্টেল থেকেই চলতো তাদের লেখাপড়া। ১৯৬০ সাল থেকে ২০২৫ পর্যন্ত একসাথে ৪ বিরহোড় ছাত্রীর মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ অতীতে উদাহরণ নেই।
আদিবাসী উন্নয়ন বিভাগের তথ্য বলছে, রাজ্য সরকারের তৎকালীন মন্ত্রী ভূপতিরঞ্জন মজুমদার ১৯৬০ সালে এই বিরহোড় জনজাতিকে জঙ্গল থেকে নিয়ে এসে বাঘমুন্ডির ওই ভূপতি পল্লীতে পুনর্বাসন দিয়েছিলেন। পুরুলিয়া (Purulia) ছাড়াও ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, ছত্তিশগড়ের বেশ কয়েকটি জেলাতে এই জনজাতি রয়েছে। সরকার তাদেরকে সমাজের মূল স্রোতে নিয়ে এলেও এখনও তারা গুহায় থাকতে ভালোবাসেন। জঙ্গলের চারপাশে বসবাস করে তারা অরণ্য নির্ভরশীল। এখনও নিয়ম করে শিকারে যান। মাধ্যমিকের ওই সাফল্যের পর শিক্ষা দপ্তর, ব্লক প্রশাসন এবং ওই ছাত্রীরা জানিয়েছিল তারা উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হবে। কিন্তু তারা উচ্চশিক্ষার গণ্ডিতে পা রাখতে পারেনি। কারণ? ঘরে অভাব। পদ্মাবতীরা তিন বোন। এক ভাই। পদ্মাবতী বড়। দুই ছোট বোন স্কুলে পড়লেও ভাই পেটের টানে নলকূপ গাড়িতে কাজ করেন। আর কোনোভাবে প্রাণী পালন করে তাদের দিন গুজরান হয়। তাই তাদের কাছে উচ্চশিক্ষা একপ্রকার বিলাসিতা।
পদ্মাবতী শিকারীর মা মুইগি শিকারী বলেন, "মেয়ের ১৮ বছর বয়স হয়নি। ঘরে অভাব, মাধ্যমিক পাশ করার পর সেই যে ঝাড়খণ্ডের জামশেদপুরে চলে গেল মাঝখানে শুধু একবারই এসেছিল। আর আসেনি, শুনেছি বিয়ে করেছে। কি করে কিছুই জানি না। যোগাযোগ নেই।" পদ্মাবতীদের যেমন কুঁড়ে ঘর। তেমনই শম্পা শিকারীদেরও। শম্পা ঝাড়খণ্ডের রাঁচি এলাকায় একটি কারখানায় স্ন্যাক্স-র প্যাকিং-র কাজ করে। সেই কারখানান ঠিকানা কি? মা চিল্কি শিকারি বলেন, "শুনেছি ঝাড়খণ্ডের রাঁচির একটি কারখানায় ওই কুরকুরে প্যাকিং করে। ওই কারখানা ঠিক কোথায় তা জানি না। বাড়িতে অনেকদিন আসেনি। ঘরে অভাব। তাই মেয়েকে আর পড়াতে পারিনি। "
পুরুলিয়ার বিরহোড় গ্রাম বাঘমুন্ডির ভূপতিপল্লী। ছবি:অমিতলাল সিং দেও।
কিন্তু শিক্ষা দপ্তর? প্রশাসন? তাদের ভূমিকা কি? জেলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শক মহুয়া বসাক বলেন, "আমরা যখন গ্রামে গিয়েছিলাম তখন তাদের অভিভাবকরা বলেছিলেন ওরা উচ্চ মাধ্যমিক পড়বে। কি হয়েছে আমাদের আর খোঁজ নেওয়া হয়নি।" এইরকম একটি লুপ্তপ্রায় জনজাতি, যাদের ৪ কিশোরী একসাথে মাধ্যমিকে সাফল্য পেয়েছে। তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য তাহলে শিক্ষা দপ্তরের কোনো ভূমিকাই থাকবে না? তাদের সঙ্গে কোন যোগাযোগই রাখা হবে না? এই প্রশ্ন উঠছে। পদ্মাবতী, শম্পার বন্ধু দিবিয়া শিকারি বলে, "আমি আর মালা ঝালদার কুটিডি হাই স্কুলে পড়ি। পদ্মাবতী আর শম্পা যে কেন স্কুলে ভর্তি হলো না জানি না। ওদের সঙ্গে আর কোন যোগাযোগ নেই। তবে ওরা দু'জন থাকলে ভালো হতো। একসাথেই লেখাপড়া চলতো আমাদের।"
বাঘমুন্ডির বিডিও আর্য তা বলেন, "আমরা ওদের সঙ্গে যোগাযোগে ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করেই তারা ঝাড়খন্ডে চলে গিয়েছে বলে শুনেছি। আমরা বহুবার তাদের পরিবারকে বলেছি তারা যাতে স্কুলছুট না হয়।" কিন্তু বাল্যবিবাহ হল কেন? ১৮ না হওয়ার আগেই কেন তাদের কারখানায় কাজ করতে হবে? জেলা সমাজকল্যাণ দপ্তরের আধিকারিক সুদীপ্ত সেনগুপ্ত বলেন, " বিষয়টি জানা নেই। চাইল্ডলাইনের কাছে খোঁজ নেব।" এই খোঁজাখুঁজিতে আর কি উচ্চশিক্ষার আলোয় ফিরবে ওই দুই বিরহোড় কন্যা? উত্তর নেই প্রশাসনের।
