এ কোন সকাল, রাতের চেয়েও যেন অন্ধকার! সশরীরে ফেরার কথা ছিল এদিন। কিন্তু তার বদলে কুচলাদাড়ি গ্রামে এসে পৌঁছল তাঁর কফিনবন্দি দেহ। ভোরের আলো ঠিকমতো ফোটার আগেই ১৬৯ নম্বর ব্যাটালিয়নের ব্রাভো কোম্পানির সতীর্থদের কাঁধে ভর করে নিজের বাড়ির উঠোনে ফিরলেন শহিদ সেনা জওয়ান সমীরণ সিং। জাতীয় পতাকায় মোড়া কফিন নামতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীরা। বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। যে ছেলে দেশের ডাকে সাড়া দিয়ে সীমান্তে গিয়েছিল, সে আজ নিথর দেহ হয়ে ফিরল—এই সত্য মেনে নিতে পারছিল না কেউই।
আজ, ২৪ জানুয়ারি তাঁর গ্রামের বাড়িতে ফেরার কথা ছিল। তিনি নির্দিষ্ট দিনেই বাড়ি ফিরলেন। তবে কফিনবন্দি হয়ে। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, সমীরণ সিং ছিলেন পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্য। বাবা-মাকে সুখে রাখাই ছিল তাঁর জীবনের লক্ষ্য। সেই স্বপ্নপূরণে তিনি বাবা-মার জন্য নতুন বাড়ি তৈরি করছিলেন। একতলায় বাবা-মা থাকেন। নিজে আগামী দিনে থাকবেন বলে বাড়িতে দোতলা তৈরির কাজও শুরু হয়েছিল। পরিবার সূত্রে খবর, ২৪ তারিখ ছুটি নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিল তাঁর। ছুটিতে তাঁর উপস্থিতিতে বাড়ির দোতলার ছাদ ঢালাই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তবায়িত হল না।
জওয়ানকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে কাকভোরেই হাজির হন গোপীবল্লভপুর বিধানসভার বিধায়ক ডা. খগেন্দ্রনাথ মাহাতো। সঙ্গে ছিলেন জেলা পরিষদের শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ সুমন সাহু, গোপীবল্লভপুরের কো-অর্ডিনেটর অজিত মাহাতো, বিডিও ও ব্লক প্রশাসনের আধিকারিকরা। শোকস্তব্ধ বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁরা আশ্বাস দেন, সমীরণের আত্মবলিদান কখনও ভুলে যাবে না জেলা। সূর্য ওঠার সময় সমীরণের দেহ নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের স্কুল মাঠে। শেষবারের মতো প্রিয়জনকে এক ঝলক দেখতে ভিড় করেন গোটা গ্রামের মানুষ। কারও চোখে জল, কারও হাতে ফুল, কারও মুখে শুধু স্তব্ধতা। মা ছেলের কফিনে হাত রেখে বারবার বলছিলেন, “তুই তো বলেছিলি আবার ফিরবি…” বাবা নীরবে দাঁড়িয়ে, চোখের জলে ভিজে যাচ্ছিল তেরঙ্গা।
পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয় জওয়ানের দেহ। সেনাবাহিনীর জওয়ানরা গান স্যালুট দিয়ে শেষশ্রদ্ধা জানান। তখন শুধুই ধ্বনিত হচ্ছে— 'সমীরণ সিং অমর রহে।' উল্লেখ্য, জম্মু-কাশ্মীরের ডোডা জেলায় ক্যাম্পে ফেরার সময় সেনাবাহিনীর গাড়ি খাদে পড়ে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ১০ জন জওয়ানের। সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তালিকায় রয়েছেন ঝাড়গ্রাম জেলার সাঁকরাইল ব্লকের রগড়া অঞ্চলের কুচলাদাঁড়ি গ্রামের বাসিন্দা বছর ২৭ বয়সী সমীরণ সিং। একটি তরুণ প্রাণের চলে যাওয়ায় শোকস্তব্ধ গোটা ঝাড়গ্রাম।
