হাজার হাজার কেজি মাছ স্রেফ উড়ে যাচ্ছে চোখের নিমেষে! রাঘব বোয়াল থেকে টুনা, শংকর থেকে পোনা - সবরকমের মাছ কিনতে ভিড় যেন উপচে পড়ছে। ৫০০ বছর পেরিয়েও রকমারি মাছের সম্ভারে আজও জমজমাট হুগলির (Hooghly) দেবানন্দপুরের কেষ্টপুরের মাছের মেলা। মাঘ পয়লায় একদিনের জন্যই এই মেলা বসে। 'মাছে-ভাতে বাঙালি' এই বিশেষ মেলা থেকে বেছে বেছে মনমতো মাছটি কিনবেন না, তা কি হয়? এবছর সেই মেলা ৫১৯ বছরে পড়ল। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ভিড় শুরু হয় অভিনব এই মেলায়। কেউ কেউ টাটকা মাছ কিনে পাশের খোলা মাঠে বনভোজনও সারলেন।
৫০ কেজি ওজনের শংকরমাছ থেকে ৩৫ কেজির কাতলা, ৪০ কেজির বোয়াল - কী নেই মাছমেলায়? রুই, আড়, ইলিশ, ভেটকি, বোয়ালের পাশাপাশি নানা ধরনের কাঁকড়াও বিক্রি হয় এখানে। শুধু কি তাই? মাছের পাশাপাশি বিভিন্ন জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। জিলিপি, বাদাম, ঝুড়ি, পিঁড়ি, কুলো থেকে মনোহারি সবই পাওয়া যায়। তবে বিশেষ আকর্ষণ অবশ্যই মাছ। রঘুনাথ দাস গোস্বামীর বাড়ি সংলগ্ন এলাকায় বসে মেলা। এবারের মেলায় দেখা গেল ৫ ফুটের একটি বাইন মাছ। তা নেড়েচেড়ে দেখলেও কেনেননি কেউই।
হুগলির মাছমেলায় অদ্ভুতদর্শন শংকর মাছ। নিজস্ব ছবি
আসলে দেবানন্দপুরের এই মাছমেলার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ৫১৮ বছর আগে তা শুরু হয়েছিল জনৈক গোবর্ধন গোস্বামীর ছেলে রঘুনাথ দাস গোস্বামী বাড়িতে ফিরে আসার আনন্দে। ইতিহাসের পাত উলটে জানা যায়, সেসময় কেষ্টপুরের জমিদার ছিলেন গোবর্ধন গোস্বামী। তাঁর ছেলে রঘুনাথ দাস সন্ন্যাস নেওয়ার কারণে সংসার ত্যাগ করেছিলেন। তিনি চৈতন্য মহাপ্রভুর শিষ্য ছিলেন। চৈতন্য মহাপ্রভুর পারিষদ নিত্যানন্দের কাছে দীক্ষা নেবেন বলে পানিহাটিতে যান রঘুনাথ। তখন তার বয়স মাত্র ১৫ বছর ছিল। তাই দীক্ষা দেননি নিত্যানন্দ। দীর্ঘ ন'মাস পর বাড়ি ফিরে আসেন রঘুনাথ। সেই আনন্দে বাবা গোবর্ধন গোস্বামী গ্রামের মানুষকে খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।
গ্রামের মানুষ তাঁর ভক্তির পরীক্ষা নেওয়ার জন্য কাঁচা আমের ঝোল ও ইলিশ মাছ খাওয়ার আবদার করে। তিনি ভক্তদের বলেন, বাড়ির পাশে আম গাছ থেকে জোড়া আম পেড়ে আনতে। মাছের জন্য পাশের জলাশয়ে জাল ফেলার নির্দেশ দেন। সেই অনুযায়ী জাল ফেলা হয়। তারপরই অবাক কাণ্ড! জলাশয় থেকে মেলে মাছ।
প্রতি বছর ভক্তরা রাধাগোবিন্দ মন্দিরে পুজো দিতে ভিড় জমান এই দিনে। পাশাপাশি এই মাছমেলার আয়োজন। দূরদূরান্ত থেকে বহু মাছ ব্যবসায়ী মাছের পসরা নিয়ে বসেন। হুগলি ছাড়াও মেলায় আসেন বর্ধমান, হাওড়া, নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, বাঁকুড়ার বহু মাছ বিক্রেতা। অনেকে আবার শীতের আমেজ উপভোগ করতে মেলা থেকে মাছ কিনে পাশের আমবাগানে বনভোজনের আয়োজন করেন। সবমিলিয়ে, একদিনের মেলায় জমজমাট হয়ে ওঠে কেষ্টপুর।
