নিজের বাল্যবিবাহ রুখে রাজ্যের 'বীরাঙ্গনা' পুরস্কার পেয়েছে সাহসিনী কিশোরী। কিন্তু সেই পুরস্কারের ৫ হাজার টাকা এখনও হাতে পায়নি ওই সাহসী কন্যা। অথচ পার হয়ে গিয়েছে দু'মাস। দিনমজুর পরিবারের ওই কন্যা নিজের সাহসিকতার পুরস্কারের মূল্য পেতে পুরুলিয়ার চাইল্ড হেল্পলাইন থেকে প্রশাসনে যোগাযোগ করলেও ওই টাকা অ্যাকাউন্টে আসেনি বলেই দাবি। ফলে প্রশ্ন উঠছে সাহসিনীকে 'বীরাঙ্গনা' পুরস্কার দিয়ে কিসের উৎসাহ দিল নারী ও শিশু বিকাশ এবং সমাজকল্যাণ দপ্তরের আওতায় থাকা পশ্চিমবঙ্গ শিশু অধিকার সুরক্ষা আয়োগ?
গত ২০ নভেম্বর আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার দিবসে মালদহে পুরুলিয়ার পাড়া ব্লকের চাপুড়ি গ্রামের হাসিনা খাতুনকে সম্মাননা প্রদান করে। তবে যাদের তত্ত্বাবধানে ওই কিশোরী বাল্যবিবাহ রুখতে পেরেছে পুরুলিয়ার সেই চাইল্ড হেল্পলাইনের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর পিন্টু তেওয়ারি বলেন, "ওই কিশোরী ওই পুরস্কারের অর্থ শীঘ্রই পাবে। যারাই এই পুরস্কার পেয়েছে তারা এখনও সেই অর্থ পায়নি। খুব তাড়াতাড়ি ওই কিশোরীর অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকবে। তবে বেশ কয়েকমাস ধরে ওই কিশোরীকে রাজ্যের তরফে ৪ হাজার টাকা করে তাকে লেখাপড়া ও স্বাস্থ্যের জন্য স্পনসরশিপ দেওয়া হচ্ছে।"
জানা গিয়েছে, হাসিনা নামে ওই ছাত্রীর বাবা জাহাঙ্গির আনসারি রাজমিস্ত্রির সহায়ক হিসাবে কাজ করেন। এই দিনমজুরির কাজ করে মাত্র ২৫০ টাকা রোজগার হয় তাঁর। ঘরে স্ত্রী ছাড়াও রয়েছে তিন মেয়ে। হাসিনা বড়। সে এখন আনাড়া গার্লস স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী। তার মেজো বোন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। ছোট মেয়ে চাপুড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। একেবারেই নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতোই অভাবের সংসার। একটি ঘর ও বারান্দায় যেখানে বসবাস করে ওই পরিবার সেটিও সরকারের দেওয়া। কিশোরীর বাবা বলেন, "১৮ বছর হওয়ার আগেই মেয়ের বিয়ে দেওয়ার তোরজোড় শুরু করেছিলাম। পরে জানতে পারি এই আইনের কথা। যতক্ষণ না ১৮ বছর বয়স হচ্ছে ততক্ষণ বিয়ে দেওয়ার কোনও চেষ্টাই আর করব না। কিন্তু মেয়ে যে মালদহে পুরস্কার পেয়েছে তার অর্থ এখনও হাতে পায়নি। একবার প্রশাসনের কাছে গিয়েছি। সবাই বলছে টাকা আসবে আসবে। কিন্তু সেই টাকা তো মেয়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আসেই না। দু' মাস হল মেয়ে ৪ হাজার টাকা করে সরকারের একটা স্পনসরসিপ পায়। সেটাতেই কোনওভাবে বড় মেয়ের লেখাপড়া চলছে।"
কিন্তু নিজের বাল্যবিবাহ কীভাবে রুখে ছিল হাসিনা? ঘটনা ২০২৫ সালের জুলাই মাস। ভালো পাত্র পাওয়ায় দিনমজুরি বাবা মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বিয়ের প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওই বড় মেয়ে ঘরে বলেছিল সে পড়তে চায়। দিনমজুর পরিবারের বাবা-মা বলেছিলেন, লেখাপড়া করে কী হবে? মেয়ে মানুষ বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হবে। তারপরই ওই কিশোরী গ্রামের একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে জেলা শিশু হেল্পলাইন ১০৯৮-এ ফোন করে বিষয়টি জানায়। সঙ্গে সঙ্গে জেলা শিশু সুরক্ষা ইউনিট, পুরুলিয়ার শিশু হেল্পলাইন ইউনিট, ব্লক এবং জেলা শিশু বিবাহ নিষিদ্ধকরণ কর্মকর্তাদের সাথে সমন্বয় করে হস্তক্ষেপ করে। বাবা মাকে রীতিমতো মুচলেকা দিয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়। হাসিনার কথায় "আমি পড়তে চাই। সেই স্বপ্ন পূরণে আমাকে সকলই সাহায্য করছে। কিন্তু খারাপ লাগে একটাই আমি যে পুরস্কারটা পেলাম তার অর্থ মূল্যটা এখনও হাতে পাইনি।"
