বিশ্বজ্যোতি ভট্টাচার্য, শিলিগুড়ি : ঠিক যেন তুষারের কার্পেট পেতে রেখেছে কেউ! দার্জিলিংয়ের সান্দাকফু, ফালুট, সীমানা থেকে সিকিমের জুলুক, ছাঙ্গু উপত্যকা, না-থুলা অথবা ইয়ুংথাং। যেদিকে চোখ যায় রাশিরাশি বরফ। তুষারে ঢেকেছে গাছগাছালি থেকে বাড়ির ছাদ। রাস্তা বরফের আস্তরণে তলিয়ে থাকায় বিপত্তিও বেড়েছে। পর্যটক বোঝাই গাড়ির চাকা পিছলে যেতে শুরু করেছে। কমেছে দৃশ্যমানতা। বেড়েছে অক্সিজেনের সমস্যা। কিন্তু বিপদের হাতছানির তোয়াক্কা না-করেই তুষারপাতের নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগের নেশার একরকম বেপরোয়া পর্যটকেরা।
বর্ষ বরণের প্রথম দিন ইয়ুংথাং উপত্যকা থেকে সেই যে তুষারপাতের সূচনা হয়েছে আর থামেনি। ছাঙ্গু উপত্যকা, না-থুলা পাস, বাবা মন্দির সহ জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে ভারী তুষারপাত চলছে। শনিবার রাত থেকে তুষারপাতের তীব্রতা বেড়েছে। পাহাড়ের ঢাল, জঙ্গল এবং উঁচু পাহাড়ি গিরিপথগুলি বরফের চাদরে মুড়েছে। তুষারাবৃত এলাকায় ক্যামেরা এবং শীতকালীন সরঞ্জাম নিয়ে ভিড় করেছেন পর্যটকরা। শিশুরা তুষারে খেলায় মেতেছে। সেলফি তোলার হিড়িক পড়েছে। অনেকেই এমন তুষারপাত পেয়ে নিজেদের ভাগ্যবান ভাবছেন।
যদিও কনকনে ঠান্ডা। গ্যাংটকে দিনের তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। রাতের তাপমাত্রা শূন্যের কাছাকাছি চলে যাচ্ছে। নাথু-লা পাসের মতো উঁচু এলাকার তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমেছে। তীব্র বরফের বাতাসের কারণে ঠান্ডা আরও জাকিয়ে বসেছে। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ হলেও, পর্যটকের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। দার্জিলিং পাহাড়ে ঠাই নেই দশা। ভিড় বেড়েছে সান্দাকফুতে। তুষারপাতের নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগের আশায় বড়দিনের পর থেকে পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে দার্জিলিং ও সিকিমে।
সিকিম পর্যটন দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, উত্তর সিকিমে হোটেল এবং হোমস্টগুলি প্রায় সম্পূর্ণ বুকড। সিকিম সরকারের পর্যটন ও বেসামরিক বিমান চলাচল বিভাগের উপদেষ্টা এসকে সুব্বা জানান, পর্যটকদের ভিড় ক্রমশ বাড়ছে। তুষারপাতের জন্য উত্তর সিকিমের প্রায় সমস্ত হোটেল বুকড। গত রবিবার ৬ হাজারের বেশি পর্যটক নাথু-লা পাস এবং পূর্ব সিকিমের ছাঙ্গু হ্রদ পরিদর্শন করেছেন। সিকিম পর্যটন দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বড়দিনের পর থেকে পর্যটকরা তুষারপাত দেখার আশায় উত্তর সিকিমে ভিড় জমাতে শুরু করেছে। জিরো পয়েন্টে তুষারপাতের চলছে।
সিকিম সরকারের পর্যটন ও বেসামরিক বিমান পরিবহন দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, সিকিমে ১ হাজার ১৮১টি হোটেল, ১ হাজার ৯৮১টি হোমস্টে, ৬০০টিরও বেশি রেস্তোরাঁ রয়েছে। এছাড়াও অতিরিক্ত গেস্টহাউস এবং পিজি সুবিধা রয়েছে। সেখানে আরও দেড় হাজার পর্যটক থাকতে পারবেন। সব মিলিয়ে রাজ্যের হোটেল ও হোমস্টেগুলোতে ২২ হাজার ৬৫২টি রুম এবং ৪৩ হাজার ৮০৭টি শয্যা রয়েছে। এখন শুধুমাত্র গ্যাংটকে প্রতিদিন ৪৫ হাজার পর্যটক থাকতে পারেন। কিন্তু এবার ভিড় যেভাবে বেড়ে চলেছে আগাম বুকিং করে না গেলে পর্যটকদের বিপদে পড়তে হতে পারে।
সিকিম প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণ পারমিট অবাধ নয়। কয়েকটি সুরক্ষিত অঞ্চলে অতিরিক্ত ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়। অসুবিধা এড়াতে অনলাইনে ভ্রমণ পারমিট ইস্যুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। পর্যটকদের বাড়তি চাপ সামাল দিতে আরও ১ হাজার হোমস্টে তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এদিকে দার্জিলিংয়ে তুষারপাত না-হলেও বেশিরভাগ হোটেল এবং হোমস্টে বুকড আছে। করোনা কালের পর এবারই প্রথম এতো পর্যটক শৈল শহরে। হোটেল থেকে হোমস্টে সর্বত্র ঠাই নেই দশা।
ট্যুর অপারেটর সংস্থাগুলো সূত্রে জানা গিয়েছে, এবার জানুয়ারি মাস জুড়ে দার্জিলিং পাহাড়ে পর্যটকদের ভিড় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। রাজ্য ইকো ট্যুরিজম কমিটির চেয়ারম্যান রাজ বসু বলেন, "এবার দার্জিলিং পাহাড়ে পর্যটকদের ভিড় সর্বকালীন রেকর্ড ছাড়াতে পারে। জানুয়ারি মাস জুড়ে শৈল শহরে পা ফেলার জায়গা মিলবে না। তুষারপাত হলে তো কথাই নেই। এটা খুবই ভালো দিক।"
