ফাঁকা বিদ্যালয়! শুনশান এলাকা। চারপাশজুড়ে একেবারে শ্মশানের নিস্তব্ধতা। এরই মাঝে পাড়ারই গোয়ালঘরে স্কুলব্যাগ-বইপত্র নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছে পড়ুয়ারা। এমনকী শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কেউ বসে রয়েছেন কারোর দালানে আবার কেউ দাঁড়িয়ে রয়েছেন গ্রামের রাস্তায়! এই ঘটনা একদিন কিংবা দু'দিন নয়! টানা এক মাস ধরে এই রোজনামচা হয়ে দাঁড়িয়েছে পড়ুয়া থেকে স্কুল শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। কারণ একটাই, স্কুলে ঢোকার পথটি বাঁশ বেড়া দিয়ে ঘিরে দিয়েছেন এক ব্যক্তি। শুধু তাই নয়, শুরু করেছেন সবজি চাষও। ওই ব্যক্তির স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, তাঁর জমির উপর দিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতে দেওয়া হবে না। আর তাতেই সমস্যায় পড়েছেন পড়ুয়া থেকে শিক্ষক-শিক্ষিকারা। যা নিয়ে এলাকায় রীতিমতো শোরগোল পড়ে যায়। যদিও পুরো বিষয়টি জানা মাত্র হস্তক্ষেপ করেন জেলাশাসক। এমনকী একমাস ধরে কেন এই সমস্যা জানানো হয়নি? তা নিয়ে ফোনে বিডিওকে জেলাশাসক ধমক দেন বলেও খবর। বিডিওর কাছে রিপোর্ট তলবের পাশাপাশি স্কুলের দরজা খুলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গঙ্গার ভাঙন কবলিত মালদহের মানিকচকের বাঁকিপুর শ্যামসুন্দরী গ্রামের একমাত্র জুনিয়র হাই স্কুলটি চালু হওয়ার অন্তত তেইশ বছর পর হঠাৎ কেন এমন সমস্যার সম্মুখীন, সেই প্রশ্নে উদ্বিগ্ন পড়ুয়াদের অভিভাবকরা। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গঙ্গা নদীর পাড়ে ২০১১ সাল থেকে চলছে বাঁকিপুর জুনিয়র হাই স্কুল। ওই বছরই এলাকার শিক্ষানুরাগীদের প্রচেষ্টায় এই স্কুল তৈরি হয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে স্কুলে প্রায় ১৫০ জন ছাত্রছাত্রী, তিনজন শিক্ষক-শিক্ষিকা ও একজন শিক্ষাকর্মী কর্মী রয়েছেন।
জানা যায়, স্কুলটি ৬৪ শতক জমির উপর রয়েছে। স্কুলে ঢোকার বা যাতায়াতের জন্য নিজস্ব কোনও জায়গা নেই। স্কুলের জন্মলগ্ন থেকেই অন্যদের জমি দিয়ে যাতায়াত করতে হয় ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। এত বছর ধরে যাতায়াতে কোনও রকম বাধা আসেনি। কিন্তু চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিন থেকে বেঁকে বসেছেন জমির মালিকরা। তাঁরা স্কুলে যাতায়াতের জমি বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে সবজি চাষ শুরু করেছেন। ফলে পড়ুয়া ও শিক্ষকরা স্কুলে ঢুকতে পারছেন না। বন্ধ রয়েছে ছাত্রছাত্রীদের পঠনপাঠন।
জমির মালিকদের বক্তব্য, স্কুল যেখানে রয়েছে সেই জমিও তাঁদের ছিল। স্কুল গড়তে তাঁরা সেই জমি দিয়েছিলেন। কিন্তু রাস্তার জন্য তাঁরা কেউই জমি দান করেনি। এখন তাঁরা নিজেদের জমিতে চাষাবাদ শুরু করেছেন। বাঁকিপুর জুনিয়র হাই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা স্মিতা দত্ত বলেন, "গ্রামের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে রোজ বিষণ্ণ মনে বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। পড়ুয়ারাও কারও বারান্দায়, কারও গোয়ালঘরে বসে থাকছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সমস্যাটি জানিয়েছি। আজ একটা মাস হয়ে গেল। কিন্তু এখনও কোনও সুরাহা হয়নি।"
এদিন মালদহের জেলাশাসক প্রীতি গোয়েল সংবাদ মাধ্যমের কাছে সমস্যাটি জেনে ব্লক প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মানিকচকের বিডিওকে ফোন করে কার্যত ধমক দেন। তাঁকে সমস্যা না জানানোয় চরম ক্ষুব্ধ তিনি। পরে জেলাশাসক প্রীতি গোয়েল বলেন, "বিডিওর কাছে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। দ্রুত স্কুলে পঠনপাঠন চালু করতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে যাতায়াতের জন্য জমি কিনে নেবে প্রশাসন।"
