দাবি এক। আর সেই দাবি পূরণে নিশানাও প্রায় মিলে গিয়েছে। কিন্তু কুড়মি আন্দোলনের রাশ থাকবে কার হাতে? এই আন্দোলনের মুখই বা কে হবেন? বিধানসভা ভোটের আগে জঙ্গলমহল জুড়ে এখন এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ আদিবাসী তালিকাভুক্তির দাবিতে কুড়মি আন্দোলন এখন দ্বিধাবিভক্ত। একেবারে আড়াআড়িভাবে দু'ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ায় এই আন্দোলনও ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে ওই জনজাতির মানুষজনদেরই অভিযোগ। গত ৫-৬ ফেব্রুয়ারি কোটশিলার মুরগুমায় আদিবাসী কুড়মি সমাজের কর্মসূচিতে কুড়মি সমাজ, পশ্চিমবঙ্গ, আদিবাসী নেগাচারি কুড়মি সমাজ উপস্থিত হওয়ায় প্রায় পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে অজিত মাহাতোর আদিবাসী কুড়মি সমাজের সঙ্গে রয়েছে ওই দুটি সংগঠন।
অন্যদিকে আদিবাসী কুড়মি সমাজ ভেঙে গঠিত হওয়া অজিত বিরোধী বলে পরিচিত ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজ, পূর্বাঞ্চল আদিবাসী কুড়মি সমাজ ও বাইসি কুটুম একদিকে। তবে কুড়মি সেনা কোনওদিকে সেই অবস্থান এখনও ঠিক করেনি। এদিকে ঝাড়খণ্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারী মোর্চার সুপ্রিমো তথা ঝাড়খণ্ডের বিধায়ক টাইগার জয়রাম মাহাতো জঙ্গলমহলে সাড়া ফেললেও কর্মসূচির ধারাবাহিকতা না থাকায় এই বনমহলে তার কাছ থেকেও লোকজন সরতে শুরু করেছে। গত ৮ অক্টোবর পুলিশ সন্ত্রাস বিরোধী সভার পর আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতোকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় আদিবাসী তালিকাভুক্তির দাবি পূরণে টাইগার জয়রাম মাহাতোর হাতেই কুড়মি আন্দোলনের রাশ চলে গিয়েছিল।
গত ২ নভেম্বর জঙ্গলমহলে প্রথম টাইগারের রাজনৈতিক কর্মসূচি পুরুলিয়ার জয়পুরে। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় পুরুলিয়ায় দ্বিতীয় সভা করতে দেরি করেন। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি পুরুলিয়া শহরে সভা করলেও তাতে আশানুরূপ ভিড় হয়নি। যদিও সেটি প্রকাশ্যে কর্মী বৈঠক ছিল বলে ওই রাজনৈতিক দল থেকে দাবি করা হয়। পুরুলিয়া শহরের ওই সভায় বিজেপি-সহ আদিবাসী কুড়মি সমাজের কয়েকজন নেতা-কর্মী টাইগার জয়রাম মাহাতোর দলে যোগদান করলেও তাঁদের অধিকাংশ জন অজিত মাহাতোর আদিবাসী কুড়মি সমাজের দিকেই চলে গিয়েছেন। অজিত মাহাতোর আদিবাসী কুড়মি সমাজ তৃণমূলকে একটি ভোট না দেওয়াতেই প্রচার চালাচ্ছে। অথচ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাতেই ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজ গঠন হয়। কিন্তু ওই সংগঠনও কুড়মি যৌথ মঞ্চে প্রবেশ করে সেই শাসককেই নিশানা করেছে।
জয়পুরে জমজমাট জনসভা 'টাইগার' জয়রাম মাহাতোর। ফাইল ছবি।
আদিবাসী তালিকাভুক্তির দাবি তৃণমূল কংগ্রেসের ইস্তেহারে না থাকলে সেই সঙ্গে কমেন্ট-জাস্টিফিকেশন না পাঠালে 'উলটা গুনতি' হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। জঙ্গলমহলে নিজের প্রভাব বাড়াতে টাইগার জয়রাম মাহাতোর দলও শাসকদলকে আক্রমণ করছে। কুড়মিদের আদিবাসী তালিকাভুক্তির বিষয়টি তারা রাজনৈতিক মঞ্চে উত্থাপন না করলেও ওই বিষয়েও আক্রমণ শাসক দলের উপরেই। সবমিলিয়ে জাতিসত্তার আন্দোলন এমন ছন্নছাড়া হয়ে যাওয়াতেই প্রশ্ন উঠছে শাসকের উপর যতই চাপ সৃষ্টি করা হোক না কেন ভোটের আগে কি কুড়মি আন্দোলন কোনও দিশা পাবে? নাকি বছর বছর ধরে একই পথে চলবে।
সেই কারণেই আদিবাসী কুড়মি সমাজ ভেঙে ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজ গঠন হয়। তাঁরা অজিত মাহাতোর আদিবাসী কুড়মি সমাজকে বাদ দিয়ে ছটি সংগঠন মিলিয়ে দাবি পূরণে একসঙ্গে চলার চেষ্টা করলেও ওই সকল কুড়মি জনজাতিদের সংগঠনের সাড়া পাননি। আর তাতেই কুড়মি আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এখন প্রশ্নচিহ্ন হয়ে ঝুলছে। যদিও কুড়মি যৌথ মঞ্চের অন্যতম নেতা তথা ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজের এক্সিকিউটিভ কমিটির অন্যতম সদস্য সুজিত মাহাতো বলেন, "আমাদের এখন একটাই প্রধান দাবি, রাজ্যকে কমেন্ট-জাস্টিফিকেশন পাঠাতে হবে। অনেক কর্মসূচি বিক্ষোভ, অবরোধ হয়েছে। কিন্তু দাবি তো আর পূরণ হয়নি। সেই কারণেই এই যৌথ মঞ্চ তৈরি করতে হলো। আমরা আমাদের মতো করে শাসকদলকে চাপ দিয়ে দাবি আদায় করবই।"
আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতো। ফাইল ছবি
এদিকে অনেকাংশেই বিজেপির দিকে ঝুঁকে যাওয়া আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতো বলেন, "আমরা বুঝে গিয়েছি রাজ্য সরকার আমাদের দাবি পূরণে আর কোনও কাজই করবে না। এজন্যই তৃণমূলকে একটিও ভোট নয়, এই ডাক আমাদের রয়েছে। তবে আমরা শর্ত দিয়েছি বিজেপিকে। নির্বাচনী আচরণ বিধি লাগু হওয়ার আগে পর্যন্ত বিজেপি কী করছে আমরা সেদিকে তাকিয়ে আছি। সেই কারণেই আমাদের ৫ এপ্রিল পরবর্তী বৈঠক।" কিন্তু তার আগেই যদি জঙ্গলমহলের ভোট হয়ে যায়? এই প্রশ্ন উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিজেপির জেলা সভাপতি শংকর মাহাতো বলেন, "যে সকল সামাজিক সংগঠন জাতিসত্তার আন্দোলনে লড়াই করছেন। নানান দাবি নিয়ে কর্মসূচি নিচ্ছেন। সকলের বিষয়টি আমাদের মাথায় রয়েছে। শুধু তো ভোটের সময় নয়। সব সময় আমরা তাদের পাশে থাকি।" কিন্তু তৃণমূল পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে, আদিবাসী তালিকাভুক্তির বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রের আওতাভুক্ত। পুরুলিয়া জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান তথা রাজ্য তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক শান্তিরাম মাহাতো বলেন, "এই দাবি পূরণের তৃণমূল একেবারে প্রথম থেকে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু এটি সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রের বিষয়।" সবমিলিয়ে সঠিক নেতৃত্বের অভাবে কার্যত দিশাহীন কুড়মি আন্দোলন!
