একসময়ের ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের নেতা অজিত মাহাতোর আদিবাসী কুড়মি সমাজকে বাদ দিয়েই জঙ্গলমহলে কুড়মি জনজাতিদের ৬টি সংগঠন একসঙ্গে বৈঠকে বসছে। কুড়মি জনজাতিদের সংগঠনকে এক ছাতার নিচে বৈঠকে সেভাবে দেখা যায়নি। আগামী বিধানসভা নির্বাচনে জঙ্গলমহলের ভোটে অন্যতম বড় ফ্যাক্টর কুড়মিদের অবস্থান কী হবে? তা ঠিক করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে প্রথম দফার ওই বৈঠক হবে শনিবার। দুপুর ১২ টা থেকে ওই বৈঠক শুরু হওয়ার কথা। তবে বৈঠকস্থল এখনও চূড়ান্ত হয়নি। মোট তিনটি জায়গা বেছে নেওয়া হয়েছে। ওই জায়গার মধ্যে যে কোনও একটি জায়গায় ওই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হবে।
কৌশলগত কারণেই নিজেদের বৈঠকস্থল আগেভাগে জানাতে চাইছেন না বলে কুড়মি সংগঠনগুলি সূত্রে জানা গিয়েছে। মূলত ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজই অর্থাৎ আদিবাসী কুড়মি সমাজ থেকে ভেঙে সম্প্রতি গঠন হওয়া এই সংগঠনই এই বৈঠকের অন্যতম মূল আয়োজক। কিন্তু প্রশ্ন হল, যেখানে বিধানসভা নির্বাচনের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কুড়মি জনজাতির অবস্থান কী হবে, তা চূড়ান্ত হওয়ার কথা, সেই বৈঠকে আদিবাসী কুড়মি সমাজকে বাইরে রেখে বৈঠক কেন?
কুড়মি জনজাতিদের সংগঠন সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ৮ অক্টোবর পুলিশ সন্ত্রাস বিরোধী সভায় আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতো তৃণমূলকে একটিও ভোট না দেওয়ার ডাক দেন। আর তারপর থেকে আদিবাসী কুড়মি সমাজে ভাঙন শুরু হয়। যদিও ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজ গঠন হওয়ার পর আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতো জানিয়েছেন, জাতিসত্তার আন্দোলনে যে সংগঠনগুলি কাজ করছে, তাদের এক ছাতার তলায় আসতে হবে।
ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজের এক্সিকিউটিভ কমিটির অন্যতম কর্মকর্তা চিকিৎসক সুজিত মাহাতো বলেন, "আদিবাসী তালিকাভুক্তের দাবিতে আমাদের দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলছে। কিন্তু সেই আন্দোলন মনে হচ্ছে যেন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখনও পর্যন্ত কিছু ফলপ্রসূ হয়নি। বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে আমাদের দাবি পূরণের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। তাছাড়া আগামী বিধানসভা নির্বাচনে আমরা কোন পথে যাব, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আমাদের এই বৈঠক। বৈঠকের একদিনেই তো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। এটি প্রথম ধাপের বৈঠক। কয়েক ধাপের বৈঠকের পরেই আমরা এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারব বলে আশা রাখি।"
কুড়মিদের এই পথ অবরোধ কর্মসূচিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল হাই কোর্ট। ফাইল ছবি
বর্তমানে জঙ্গলমহলে কুড়মিদের মোট সাতটি সংগঠন রয়েছে। আদিবাসী কুড়মি সমাজ, ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজ, পূর্বাঞ্চল আদিবাসী কুড়মি সমাজ, কুড়মি সেনা, পশ্চিমবঙ্গ কুড়মি সমাজ, নেগাচারি কুড়মি সমাজ ও জনজাতি কুড়মি সমাজ। এই সংগঠনগুলির মধ্যে একসময় জঙ্গলমহলের ৪ জেলা পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রামে আদিবাসী কুড়মি সমাজের সংগঠন ছিল সবচেয়ে বেশি মজবুত। কিন্তু এই সংগঠন ভেঙে ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজ তৈরি হয়ে যাওয়ায় কয়েকদিনের মধ্যেই এই সংগঠন জঙ্গলমহলে সাড়া ফেলেছে। সংগঠন গঠন হওয়ার পর এক্সিকিউটিভ কমিটি তৈরি ছাড়াও ঝালদা ১ এবং পুঞ্চা ব্লকে অস্থায়ী ব্লক কমিটি তৈরি করে। সংগঠনের এক্সিকিউটিভ কমিটির অন্যতম কর্মকর্তা সুজিত মাহাতো বলেন, "জাতিসত্তার আন্দোলনে আমাদের লক্ষ্য যেন কোথাও নড়ে গিয়েছিল। এজন্যই ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজ গঠন করতে হল। আদিবাসী তালিকাভুক্তের বিষয়ে আমাদের একটাই দাবি, রাজ্যকে কমেন্ট-জাস্টিফিকেশন পাঠাতে হবে।"
এদিকে আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতো বলেন, "যে সকল সংগঠন জাতিসত্তা নিয়ে আন্দোলন করছে। তারা একছাতার তলায় এসে আন্দোলন করুক। একত্রিত হয়ে আন্দোলন করলে দাবি আদায় দ্রুত হবে।" আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল মানতা এমন ডাক দিলেও জঙ্গলমহলে কুড়মি জনজাতির মধ্যে তিনি অনেকাংশেই আস্থা হারিয়েছেন। ফলে শুধু ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজ নয় অন্যান্য কুড়মি সংগঠনগুলিও ওই মূল মানতার নেতৃত্ব থেকে সরে আসতে চাইছে। ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজ পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে, এখনও যারা আদিবাসী কুড়মি সমাজে রয়েছেন তারাও যেন ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজের ছত্রছায়ায় আসেন। ওই সংগঠনের সাধারণ কর্মী, নেতার উপরে এই নতুন সংগঠনের কোন রাগ, ক্ষোভ নেই। নেতৃত্বের বিরুদ্ধেই 'বিদ্রোহ' ঘোষণা করে ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজের জন্ম হয়েছে। মূল মানতা বলেন, "শনিবারের বৈঠকের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আগামী ৫-৬ ফেব্রুয়ারি কোটশিলার মুরগুমার কেনকেচে পাহাড়ে আমাদের কর্মসূচি রয়েছে। সেখানেই আমরা আমাদের আদিবাসী তালিকাভুক্তের আন্দোলনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।"
