'রেনেসাঁ' এবং অপর্ণা সেন, একে-অপরের সমার্থক বললেও অত্যুক্তি হয় না। বিশেষ করে বাংলার ক্ষেত্রে। একাধারে অভিনেত্রী, পরিচালক, প্রযোজক থেকে নারী অধিকারের জন্য লড়াই, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, বিগত ষাট বছরের সিনে কেরিয়ারে ‘মিস ক্যালকাটা’র বিভিন্ন সত্ত্বা শুধুমাত্র আবিষ্কৃতই হয়নি, বরং আমজনতাকে মুগ্ধ করেছে। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেনের হাত ধরে যেমন একাধিক কালজয়ী ছবিতে অভিনয় করেছেন, তেমনই পরিচালকের আসনে বসে বাংলা সিনেইন্ডাস্ট্রিকে বহু ভিন্নস্বাদের সিনেমা উপহার দিয়ে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছেন। এহেন মহীরুহের কণ্ঠেই কিনা আক্ষেপের সুর!
"বাংলা ইন্ডাস্ট্রি এখন এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একটি মৃতপ্রায় শিল্পকে নিয়ে সবাই যা করছে, আর এইভাবেই যদি চলতে থাকে তবে বাংলা সিনেমার টিকে থাকা খুব কঠিন!..."
বলছেন, "সকলেই তো এখন টেলিভিশনে মজে। আমি কার জন্য ছবি বানাব?" অপর্ণা সেন (Aparna Sen) প্রশ্ন তুলেছেন বাংলার বর্তমান দর্শকমহলের রুচি নিয়েও। সম্প্রতি লেখিকা-পডকাস্টার শ্রীময়ী কুণ্ডুর 'স্ট্রেট আপ উইথ শ্রী' পডকাস্টে যোগ দিয়ে টলিউডকে নিয়ে নিজের অভিমান ও আশঙ্কা কথা প্রকাশ করেছেন অপর্ণা সেন। সেখানেই বাংলা সিনেদুনিয়ার বর্তমান পরিস্থিতির কড়া সমালোচনা করেন অভিনেত্রী তথা পরিচালক। বিগত কয়েক বছর ধরেই, বিশেষত কোভিড পরবর্তী অধ্যায়ে ধুঁকছে টলিউডের বক্স অফিস। এহেন পরিস্থিতিতে অনেকেই কন্টেন্টকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। কেউ বা সিনেদুনিয়ার শুটিংয়ের নিয়মবিধির বেড়াজাল নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এমতাবস্থায় অপর্ণা সেনের মন্তব্য, "বাংলা ইন্ডাস্ট্রি এখন এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।" কোনওরকম কুণ্ঠাবোধ না রেখেই প্রবীণ অভিনেত্রী-পরিচালক বললেন, "একটি মৃতপ্রায় শিল্পকে নিয়ে সবাই যা করছে, আর এইভাবেই যদি চলতে থাকে তবে বাংলা সিনেমার টিকে থাকা খুব কঠিন! টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রি হয়তো টিকে থাকতে পারে এবং অনেক মানুষের কর্মসংস্থানও হবে, তবে টেভি বিশ্বের সেরা জিনিস নয়।"
অপর্ণা সেন। ফাইল ছবি
অপর্ণার কথায়, আমি খুশি যে এতে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে, কিন্তু এই সিরিয়াল বা মেগা ধারাবাহিকগুলি দর্শকের রুচি নষ্ট করে দিচ্ছে। আমরা কীসের জন্য সিনেমা বানাচ্ছি? পরিচালক-অভিনেত্রীর সোজাসাপটা প্রশ্ন, "আমি কার জন্য ছবি বানাব? আমার দর্শক কোথায়? সবাই তো এখন টিভিতে মজে। সেকারণেই আমি আর সিনেমা বানাতে আগ্রহী নই। ছবি বানানোর উৎসাহও পাচ্ছি না। কে দেখবে?" বাংলা সিনেমার 'দুর্দিন' প্রসঙ্গে অতীতে এমন আক্ষেপের সুর শোনা গিয়েছিল পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠেও। তিনি বলেছিলেন, "বাংলা ছবির দর্শকদের ভয়ংকর একটা দ্বিচারিতা রয়েছে। শাহরুখ খানের ছবি এখানে ভালো ব্যবসা করে। তবে 'পাঠান', 'জওয়ান'-এর মতো ছবি বাংলায় বানালে কেউ গিয়ে সেই ছবি দেখবে না।" এবার অপর্ণা সেনও দর্শকমহলের রুচিবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন।
‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’-এর ভায়োলেট স্টোনহ্যাম বা নন্দিতা রায়, ‘পরমা’, ‘পারমিতা’ কিংবা ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’-এর মীনাক্ষি আইয়ার, ‘দ্য জাপানিজ ওয়াইফ’-এ সন্ধ্যা মিয়াগে, ‘সোনাটা’-র তিন ব্যাচেলর মহিলার বন্ধুত্ব…, প্রত্যেকটি নারীচরিত্রদের চোখ দিয়ে সমাজের কঙ্কালসার চেহারা তুলে ধরেছেন, এমনকী তাঁর সিনেমা প্রশংসা অর্জন করেছে আন্তর্জাতিকমহলেও। বাংলা সিনেমার দর্শকের রুচিবদলের জেরে এবার তিনিই অবসরের পথে হাঁটার কথা জানালেন।
ষাটের দশকের গোড়ায় সত্যজিৎ রায় পরিচালিত 'তিন কন্যা' ছবিতে অভিনয়ের সুবাদে ফিল্মি কেরিয়ায় শুরু করেন ষোড়শী অপর্ণা। দু'দশকে একাধিক পরিচালকের ফ্রেমে অভিনেত্রী হিসেবে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করার পর ১৯৮১ সালে '৩৬ চৌরঙ্গী লেন' দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। আর পয়লা ছবিতেই পরিচালক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পান। অপর্ণা সেন তাঁর সিনেমায় স্বাধীন ভারতের মেয়েদের নানাভাবে ভেঙেছেন-গড়েছেন। যেমন ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’-এর ভায়োলেট স্টোনহ্যাম বা নন্দিতা রায়, ‘পরমা’, ‘পারমিতা’ কিংবা ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’-এর মীনাক্ষি আইয়ার, ‘দ্য জাপানিজ ওয়াইফ’-এ সন্ধ্যা মিয়াগে, ‘সোনাটা’-র তিন ব্যাচেলর মহিলার বন্ধুত্ব…, প্রত্যেকটি নারীচরিত্রদের চোখ দিয়ে সমাজের কঙ্কালসার চেহারা তুলে ধরেছেন, এমনকী তাঁর সিনেমা প্রশংসা অর্জন করেছে আন্তর্জাতিকমহলেও। বাংলা সিনেমার দর্শকের রুচিবদলের জেরে এবার তিনিই অবসরের পথে হাঁটার কথা জানালেন। সিনেইন্ডাস্ট্রির জন্য শোচনীয় সময়, বললেও অত্যুক্তি হয় না!
