সিনেমা নাকি সমাজের আয়না? নন্দিতা রায় এবং শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ছবি দেখতে বসলে এমন কৌতূহলের উদ্রেক অস্বাভাবিক নয়। 'ইচ্ছে', 'রামধনু', 'অ্যাক্সিডেন্ট', 'মুক্তধারা', 'কণ্ঠ' থেকে হালফিলের 'রক্তবীজ' কিংবা 'বহুরূপী', প্রতিটি ছবিকেই বাস্তব আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন উইন্ডোজ জুটি। কখনও তাঁদের সিনেমার বিষয়বস্তু হয়েছে শিশু মনস্তত্ত্ব, কখনও বা ল্যারিঞ্জিক্যাল ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই আবার কখনও বা জাত-ধর্মের উর্ধ্বে গিয়ে মানবতার 'গোত্র' ফ্রেমে তুলে ধরেছেন তাঁরা। 'ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড'-এর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অঙ্গদানের ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় দেশের নারীরা কতটা এগিয়ে? সেই প্রসঙ্গ ধরেই নতুন গোয়েন্দা ছবির গল্প সাজিয়েছেন নন্দিতা-শিবপ্রসাদ।
ফ্রেমে বাস্তব প্রেক্ষাপট ধরতে উইন্ডোজ জুটির কলম-ক্যামেরা বরাবরই সাবলীল। খবরের কাগজে পরা কোনও প্রতিবেদন হোক কিংবা লোকমুখে প্রচারিত কোনও গল্প, সেসবের মজ্জায় ঢুকে কন্টেন্ট সাজিয়ে আসছেন তাঁরা। আসলে বাড়ির কিংবা আশেপাশের গল্প যখন রুপোলি পর্দায় ম্যাজিক তৈরি করে, তখন দর্শকরাও তার সঙ্গে একাত্ম বোধ করতে পারেন।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের আত্মত্যাগ অনেকসময়েই অন্তরালে রয়ে যায়। অনেকেই হয়তো জানেন না যে, অঙ্গদানের ক্ষেত্রেও 'চোরাগোপ্তা'ভাবে লিঙ্গবৈষম্য চলে। সেটা কেমন? ন্যাশনাল অর্গ্যান অ্যান্ড টিস্যু ট্রান্সপ্লান্ট অর্গানাইজেশনের গবেষণায় এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। তাদের সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, ভারতে জীবিত অঙ্গদাতাদের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই হলেন মহিলা। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের বাঁচানোর জন্য মূলত স্ত্রী বা মায়েরাই এগিয়ে আসেন। কিডনি দানের ক্ষেত্রেও এই অনুপাতে হেরফের হয়নি। সংশ্লিষ্ট সমীক্ষা বলছে, রোগীর স্ত্রী, মা, বোন কিংবা দিদি বা দিদারাই অঙ্গদানে এগিয়ে আসেন। কিন্তু এক্ষেত্রে সেই তুলনায় পুরুষরা অনেকেই পিছিয়ে। কেন? কারণটা সেই চিরাচরিত সমাজের মজ্জাগত বস্তপচা ধ্যানধারণা! নারীরা মাঠে-ঘাটে সর্বক্ষেত্রে পুরুষদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সংসার সামাল দিলেও তাঁদের অবদান, আত্মত্যাগকে অধিকাংশ সময়েই স্বাভাবিক কিংবা কর্তব্য বলেই ধরে নেওয়া হয়। এবার প্রশ্ন, কেন কিডনি দিবসে নন্দিতা-শিবপ্রসাদের আসন্ন সিনেমা 'ফুলপিসি ও এডওয়ার্ড' প্রাসঙ্গিক? আসলে সিনেমার চিত্রনাট্যের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নারীদের অঙ্গদান, আত্মত্যাগের কথা। সংসারজগতে এক্ষেত্রেও কীভাবে লিঙ্গবৈষম্যের শিকার হতে হয় নারীদের? তেমন ভাবনাতেই 'ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড'-এর গল্প সাজিয়েছেন নন্দিতা-শিবপ্রসাদ। আর সেই সূত্রেই ১২ মার্চ সেসব লৌহমানবীদের কুর্নিশ জানাচ্ছে টিম 'ফুল পিসি'। কারণ জিনিয়া সেনের লেখা চিত্রনাট্যে বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে নারীদের অঙ্গদানের প্রসঙ্গ। গল্পের মুখ্য বিষয় এটা হলেও এখনই বিশদে জানাতে নারাজ নির্মাতারা।
'ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড'-এ কে কেমন লুকে?
আগেই জানা গিয়েছিল যে, 'ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড'-এর প্রমিলা বাহিনীর তালিকায় সোহিনী সেনগুপ্তের পাশাপাশি রয়েছেন অনন্যা চট্টোপাধ্যায়, রাইমা সেন, কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শ্যামৌপ্তি মুদলি। নারীদিবসে সিনেমার প্রত্যেক নারীচরিত্রের লুকও প্রকাশ্যে এল। জমিদার পরিবারের গিন্নি 'অদিতি', 'রাজলক্ষ্মী' লুকে দেখা গিয়েছে রাইমা, কনীনিকাকে। নবপরিণীতা 'বিনিতা' লুকে শ্যামৌপ্তি। অন্যদিকে অনন্যার চরিত্রে যে বড় টুইস্ট রয়েছে। সেটা তাঁর 'পুতুল বাই' লুকেই ইঙ্গিত মিলেছে। পরিবারের গুরুজন হিসেবে হাসি দেবীর ভূমিকায় নজর কেড়েছেন অনামিকা সাহা। সিনেমার এই নারীচরিত্রদের মধ্য দিয়ে কীভাবে লিঙ্গবৈষম্যের বার্তা তুলে ধরেছেন নন্দিতা-শিবপ্রসাদ? নজর থাকবে সেদিকে।
সিনেমা নয়, বরাবর আস্ত মনস্তত্ত্বের পাঠ দেন নন্দিতা-শিবপ্রসাদ। আম দর্শকের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে টলিপাড়ার 'হিট' পরিচালকদ্বয় যে বেজায় সিদ্ধহস্ত, সেটা এযাবৎকাল তাঁদের কাজই বাতলে দিয়েছে। ফ্রেমে বাস্তব প্রেক্ষাপট ধরতে উইন্ডোজ জুটির কলম-ক্যামেরা বরাবরই সাবলীল। খবরের কাগজে পরা কোনও প্রতিবেদন হোক কিংবা লোকমুখে প্রচারিত কোনও গল্প, সেসবের মজ্জায় ঢুকে কন্টেন্ট সাজিয়ে আসছেন তাঁরা। আসলে বাড়ির কিংবা আশেপাশের গল্প যখন রুপোলি পর্দায় ম্যাজিক তৈরি করে, তখন দর্শকরাও তার সঙ্গে একাত্ম বোধ করতে পারেন। সিনেমার জটিল ব্যাকরণের ধাঁধায় না গিয়ে সহজ-সরল ন্যারেটিভ আর অতিনাটকীয়তা, যুক্তিবুদ্ধির মারপ্যাঁচ বর্জিত আবেগঘন দৃশ্যায়ণের মন্ত্রেই বারবার বাজিমাত করেছেন নন্দিতা-শিবপ্রসাদ। এবার 'ফুলপিসি ও এডওয়ার্ড'-এ অঙ্গদানের ক্ষেত্রে কীভাবে লিঙ্গবৈষম্য বিরোধী বার্তা তুলে ধরবেন? এমন কৌতূহল অস্বাভাবিক নয়।
