shono
Advertisement
Rahul Arunoday Banerjee

মা-বাবার অশান্তি থেকে পিতৃবিয়োগের যন্ত্রণা, ১২ বছরেই কঠিন বাস্তবে জর্জরিত সহজ

সন্তানের জন্মের বছর খানেকের মধ্যেই রাহুল-প্রিয়াঙ্কার মনোমালিন্য বিরাট আকার ধারণ করে। আলাদা থাকতে শুরু করেন তাঁরা। ছোট্ট সহজ তখন মায়ের সঙ্গেই থাকে।
Published By: Kasturi KunduPosted: 06:05 PM Mar 30, 2026Updated: 08:41 PM Mar 30, 2026

রবিবার বিকেলে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Rahul Arunoday Banerjee) মৃত্যুসংবাদ যেন একটা বিষ-হাওয়ার মতো ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলায়। সেই হাওয়ায় বিপর্যয়ের গন্ধ! শুটিং করতে করতে একজন অভিনেতার এমনভাবে চলে যাওয়া থমকে দিয়েছিল ছুটির দিনের আনন্দ-বিলাসকে। যাঁরা তাঁকে স্রেফ দেখেছেন রুপোলি পর্দায়, পড়েছেন লেখা কিংবা পডকাস্টে 'সহজ কথা'য় মগ্ন হয়েছেন, তাঁদেরও মনে হয়েছে বড় আপন কেউ হঠাৎ দরজা খুলে অনন্ত শূন্যে মিলিয়ে গিয়েছে। আর যাঁরা আপন? রাহুলের মা, স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার (Priyanka Sarkar) কিংবা পুত্র সহজ- বাড়ির লোকের কাছে এই আঘাত যে কত বড়! তুরস্কের বিখ্যাত কবি নাজিম হিকমত লিখেছিলেন, 'বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু বড়জোর এক বছর।' একবিংশ শতাব্দীতে তা আরও কমেছে নিশ্চয়ই। সোশাল মিডিয়া ভুলতে বেশি সময় নেয় না। কিন্তু আপনজনদের কাছে শোক চিরকালই এক বিকট পাথরের অনড় চাঁই। যেন বারবার বৃষ্টির পরও আকাশে মেঘের অনন্ত কালিমা। সংবেদনশীল মানুষের মনে বেজেছে এই যন্ত্রণা। ছেলের প্রয়াণ সংবাদ পেয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী রাহুলের মা। আর ছোট্ট সহজ? সে কীভাবে মেনে নেবে এই অকাল ও চূড়ান্ত আকস্মিক পিতৃপ্রয়াণ? প্রিয়াঙ্কা নিজেকে সামনে কীভাবে ছেলেকে সামলাবেন, সেটা তাঁর কাছে নিশ্চিত ভাবেই বড় চ্যালেঞ্জ।

Advertisement

সালটা ছিল ২০০৮। পুজোর ঠিক আগেই ছক্কা হাঁকান পরিচালক রাজ চক্রবর্তী। রাহুল-প্রিয়াঙ্কার 'চিরদিনই তুমি যে আমার' সকলের মন জিতে নিয়েছিল। প্রথম ছবিতেই জুটি হিসেবে দারুণ সফল নতুন নায়ক নায়িকা। পর্দার অসম্পূর্ণ প্রেম বাস্তবে পূর্ণতা পায় অচিরেই। ২০১০ সালের ১৮ নভেম্বর সাত পাকের বন্ধনে বাঁধা পড়েন দু'জনায়। বিয়ের তিন বছর পর দুই থেকে তিন হন। ২০১৩ সালে জন্ম তাঁদের একমাত্র সন্তান সহজের। এরপর সব কিছু ঠিকঠাকই চলছিল। আচমকা দাম্পত্যে ছন্দপতন। সন্তানের জন্মের বছরখানেকের মধ্যেই রাহুল-প্রিয়াঙ্কার মনোমালিন্য বিরাট আকার ধারণ করে। আলাদা থাকতে শুরু করেন তাঁরা। ছোট্ট সহজ তখন মায়ের সঙ্গেই থাকে। নামটা সহজ হলেও জীবনটা কিন্তু, মোটেই 'সহজ' নয়। ছোটবেলা থেকেই ভালো-মন্দের মিশেলে একটু একটু করে বেড়ে উঠছে সহজ। 

নিজস্ব ছবি

বাবার সঙ্গে সহজের সম্পর্কটা কিন্তু বিচ্ছেদ-মিলনের এই জটিল ধাঁধার ভিতরেও হারিয়ে যায়নি। রাহুল সব সময় মা প্রিয়াঙ্কার আত্মত্যাগ ও ছেলের মুখে হাসি ফোটানোর নিরলস প্রয়াসের কথা বলেছেন সহজকে। পাশাপাশি বইমেলার ধুলো, কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথকে চিনতে শিখিয়েছেন পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে।

জানা যায়, সন্তানের দায়িত্ব কার তা নিয়েও রাহুল-প্রিয়াঙ্কার মধ্যে অশান্তি একসময়ে চরমে পৌঁছেছিল। ২০১৮ সালে আদালতে বিচ্ছেদ মামলাও দায়ের করা হয়। সেই সময় সহজের বয়স মাত্র পাঁচ বছর। শিশুমন তখন কিছুই বোঝে না। সাক্ষী ছিল শুধু সহজের নিষ্পাপ দু'টো চোখ। রাস্তায় যখন মা-বাবার হাত ধরে বাচ্চারা হেঁটে যেত তখন তার সঙ্গী শুধুই মা। এই অপূর্ণতার সামনে সে ছিল এক নির্বাক দর্শক। মা-বাবার অশান্তি, আলাদা থাকা, সম্পর্কের এই যোগ-বিয়োগ তার বোধগম্যই হত না।

তবে শেষপর্যন্ত সবই ঠিক হয়ে গিয়েছিল। সহজের জন্যই শেষ পর্যন্ত জোড়া লেগেছিল রাহুল-প্রিয়াঙ্কার ভাঙা বিয়ে। সে হয়তো আজও জানে না জীবনের অনেক বড় অঙ্কের সমাধান করেছিল। রাহুল প্রায়ই সহজের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। তিনজন একসঙ্গে বেশ কিছু ভালো সময় কাটাতে শুরু করেন। ২০২২ সাল থেকে ধীরে ধীরে ফের পরস্পরের কাছাকাছি আসেন রাহুল-প্রিয়াঙ্কা। একছাদের তলায় থাকতে শুরু করেন টলিপাড়ার এই পাওয়ার কাপল। তুলে নেওয়া হয় ডিভোর্সের মামলাও। ছোট্ট সহজের পরিবার ফের পূর্ণতা পেয়েছিল।

বাবার সঙ্গে সহজের সম্পর্কটা কিন্তু বিচ্ছেদ-মিলনের এই জটিল ধাঁধার ভিতরেও হারিয়ে যায়নি। রাহুল সব সময় মা প্রিয়াঙ্কার আত্মত্যাগ ও ছেলের মুখে হাসি ফোটানোর নিরলস প্রয়াসের কথা বলেছেন সহজকে। পাশাপাশি বইমেলার ধুলো, কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথকে চিনতে শিখিয়েছেন পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে। শিখিয়েছিলেন বাংলা ভাষাকে প্রাণপণ ভালোবাসতে। রবিবার বিকেল থেকে বাবার সেই সব কথা 'অতীত' হয়ে গেল সহজের কাছে। কিন্তু বাবার হাত কি কখনও বিচ্ছিন্ন হয়? যত সময় যাবে ততই সহজ বুঝবে হয় না। কক্ষনও না। কেবল এতদিন বাবাকে সে যেভাবে পেয়েছে, এবার অন্যভাবে পাওয়ার পালা। বাবার লেখা, অভিনয়, সেই সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতির কোলাজ তার সঙ্গে থাকবে। কিন্তু... একটি মানুষের জাগতিক উপস্থিতির অভাব তবুও তাকে পীড়িত করবে। বড় হতে হতে মায়ের সঙ্গে এই অভাবকে কাটিয়ে ওঠার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে তাকে। ঘুমের ভিতরের একলা জগতে হয়তো ফুটে উঠবে বাবার হাসি! মায়ের গা ঘেঁষে বসে থাকার সময় মন ভাবতে চাইবে, এই সময় বাবা এখানে থাকলে কী হত! এই সব ভাবনা ও স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়েই এবার সহজের পথ চলা। মাত্র বারো বছরে জীবনের এই লৌহকঠিন বাস্তবের সঙ্গে লড়াই সহজ নয়। তবু, যে নামে সহজ, সে জীবনের অতলান্ত প্রতিকূলতাকেও সহজ লড়াইয়ের মাধ্যমে মোকাবিলা করতে পারবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। যত সময় যাবে বাবার আকস্মিক প্রয়াণের 'তেতো' বাস্তবকে অতিক্রম করে সহজ নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা সেই পঙক্তির অনিবার্যতাকে- 'কাল যা ছিল শোক, আজ তাই হয়েছে শান্তি'...

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement