কিছু কিছু শোক দুঃখের চেয়ে আফসোসের উদ্রেক করে বেশি। হাত কামড়াতে ইচ্ছে করে। এই অভিঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়। তাই রাতে বিছানায় উসখুস করতে থাকে হৃদয়। মাঝে মাঝে মনে হয়- ধুস, এটা বোধহয় দুঃস্বপ্ন! কিন্তু কাঁটার মতো বিঁধতেই থাকে ক্রমাগত। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Rahul Arunoday Banerjee) নিয়ে এসব কথা লিখতে হবে কে জানতো? আমার সঙ্গে যে ভীষণ সখ্যতা ছিল, এমন নয়। তবে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয়েছে। সে কথায় পরে আসছি। আপাতত ওঁর ভীষণ ভীষণ স্বাভাবিক অভিনয়ের কথায় আসি।
"আমি বামপন্থী। আমি জানি বামপন্থা ছাড়া কোনও বিকল্প নেই, তবে আমি কিন্তু ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সিপিআইএম-এর শেষের দিকের লুম্পেনগিরিও দেখেছি। কিছুই ভুলিনি। তাও বলছি এই কথা এবং সম্পূর্ণ বিশ্বাস থেকেই বলছি।"
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি- সংগৃহীত
রাহুলের খুব ভালো অভিনেতা ছিলেন, সে তো বটেই, সেই জন্যেই তাঁর এত গুণমুগ্ধ ভক্ত। আমিও সেই রাহুলের অভিনয়ের একজন গুণমুগ্ধ। কিন্তু শুধু সেইজন্যে শোকের আবহে এই আফসোস নয়। ওঁর ব্যক্তিত্ব, ওঁর পড়াশোনা এবং সর্বোপরি ওঁর সমাজ ও পারিপার্শিক সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি ওঁকে আর সকলের থেকে আলাদা করে দিয়েছে। যেটা রাহুলের 'সহজ কথা'র কথোপকথনগুলো কিংবা ওঁর বিভিন্ন সময়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারগুলো থেকে বোঝা যায়। একজন মানুষ কতটা সৎ সাহস থাকলে নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল নিয়ে প্রকাশ্যে বিশ্লেষণ করতে দ্বিধাবোধ করেন না। লিখতে বসে মনে পড়ে যাচ্ছে সেকথাগুলো। এক জায়গায় রাহুল বলছিলেন, "আমি বামপন্থী। আমি জানি বামপন্থা ছাড়া কোনও বিকল্প নেই, তবে আমি কিন্তু ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সিপিআইএম-এর শেষের দিকের লুম্পেনগিরিও দেখেছি। কিছুই ভুলিনি। তাও বলছি এই কথা এবং সম্পূর্ণ বিশ্বাস থেকেই বলছি।" এমন অকপট কথা আজ পর্যন্ত কোনও বামপন্থীকে বলতে শুনিনি।
ছবির পোস্টারে যখন আমার নাম ছিল না এবং তাই নিয়ে আমি সমাজ মাধ্যমে একটি পোস্ট করেছিলাম, তখন রাহুল নিজেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং নিজে উদ্যোগী হয়ে এইবিষয়ে প্রতিবাদ করেন। তখন কথা বলে দেখেছিলাম, কী সহজ সোজাসাপটা কথার ভানহীন একটি মানুষ। প্রথম আলাপেই 'সুযোগদা তুমি' বলে সম্বোধন।
নাটকের মঞ্চে রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি- সংগৃহীত
'রাপ্পা রায় ও ফুলস্টপ ডট কম' সিনেমাটিতে রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায় (Rahul Banerjee) একটা নেগেটিভ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, যে ভোটে টিকিট পাওয়ার জন্যে নানান অপকর্ম করে চলেছে। শুটিংয়ের সময় রাহুলের সঙ্গে আলাপ হয়নি। কারণ সেসময়ে আমি শুটিংয়ে যাওয়ার সময় পাইনি। কিন্তু ছবির পোস্টারে যখন আমার নাম ছিল না এবং তাই নিয়ে আমি সমাজ মাধ্যমে একটি পোস্ট করেছিলাম, তখন রাহুল নিজেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং নিজে উদ্যোগী হয়ে এইবিষয়ে প্রতিবাদ করেন। তখন কথা বলে দেখেছিলাম, কী সহজ সোজাসাপটা কথার ভানহীন একটি মানুষ। প্রথম আলাপেই 'সুযোগদা তুমি' বলে সম্বোধন। রানা সরকারের প্রযোজনায় 'কলকাতা ৯৬' নামে একটি ছবি তৈরি করতে চেয়েছিলেন রাহুল। সেই ছবির সঙ্গীত পরিচালনার কাজ আমার করার কথা ছিল। আমার একটি তৈরি করা পুরোনো গান প্রযোজক রানাদা এবং রাহুল পছন্দ করে বেছেও নিয়েছিলেন। ছবির সিকোয়েন্স অনুযায়ী আরেকটি গান তৈরি করেছিলাম, যেটা উপলদা (সেনগুপ্ত) আর অনিন্দ্যদাকে (চট্টোপাধ্যায়) দিয়ে গাওয়ানো হবে কথাও হয়েছিল। কিন্তু ছবিটার জন্যে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কাছ থেকে '৯৬ সালে লর্ডসের মাঠে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের ব্যাটিংয়ের কিছু ফুটেজ কেনার ছিল। সেক্ষেত্রে তাঁরা কয়েক কোটির এমন দাম হাঁকালেন যে ছবিটা এই ডামাডোলে আটকেই গেল। দুর্ভাগ্যবশত সে ছবি আর কোনও দিনই হবে না। পরিচালক রাহুল অরুণোদয় কে বাঙালি পেলো না। আফসোস, বড় আফসোস!
