বাদল অধিবেশনের পয়লা দিনেই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) 'সংসদ অভিযান' ঘিরে সোমবার রণক্ষেত্র দিল্লি। নিট প্রশ্নফাঁসে কেন্দ্রীয় শিক্ষমন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে হওয়া আন্দোলন রুখতে যন্তর মন্তর চত্ত্বর ৫০০০ পুলিশ ও আধা সেনা নিয়োগ করে কেন্দ্র। তারপরও ব্যারিকেড ভেঙে মিছিল এগতেই পুলিশের লাঠিচার্জ। কয়েক মুহূর্তে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল যে বিক্ষোভকারীদের রুখতে ছোড়া হয় কাঁদানে গ্যাস, চালানো হয় জলকামান। আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের সঙ্গে এধরণের আচরণে ফুঁসছে বাংলা সিনে ইন্ডাস্ট্রি। শ্রীলেখা মিত্র থেকে স্বস্তিকা দত্তসহ সোহম মজমদার প্রত্যেকেই তীব্র প্রতিবাদ করেছেন।
বাংলা মেগা-সিরিজের অন্যতম পরিচিত মুখ স্বস্তিকা দত্ত। সমাজমাধ্যমে খুবই সক্রিয় অভিনেত্রী। যে কোনও বিষয়ে নিজের স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করেন। 'স্পষ্টভাষী' স্বস্তিকা সোমাবার দিল্লির ঘটনায় চুপ থাকতে পারেননি। সমাজমাধ্যমে সেই মর্মান্তিক মুহূর্তের কোলাজ শেয়ার করে লিখেছেন, 'সময়ের অপেক্ষা।' আরেকটি পোস্টে আবার প্রশ্ন তুলেছেন, 'কাল আরো মার তাই না?'
ইন্ডাস্ট্রির আরও এক প্রতিবাদী অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র। দিল্লির ঘটনায় ক্ষোভ উগরে দিয়ে লিখেছেন, 'চারপাশের সবকিছু দেখে আমি ক্লান্ত। অত্যাচার, নিষ্ঠুরতা, ভণ্ডামি, আর মানুষের একের পর এক অন্যায় যা আমাদের সবাইকে ক্রমশ অধঃপতনের পথে ঠেলে দিচ্ছে। আমার শুধু ইচ্ছে করে কোনও এক গাছের ছায়ায় মাথা রেখে চিরদিনের মতো বিশ্রাম নিই। এই ঘৃণা ও হিংসায় ভরা পৃথিবীকে দেখার জন্য আর কখনও চোখ না খুলি। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছে আমার একটাই প্রার্থনা আমাকে এই সবকিছু থেকে মুক্তি দিন। অবশেষে যেন আমি শান্তিতে বিশ্রাম নিতে পারি।'
আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের সঙ্গে পুলিশের এই অভাব্য আচরণের প্রতিবাদে ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট শেয়ার করেছেন অভিনেত্রী চিত্রঙ্গদা শতরূপা। 'ইভেন সাইলেন্স ইন পলিটিক্যাল' লেখা একটি পোস্ট শেয়ার করে লিখেছেন, 'আজ না হোক কাল। কাল না হোক অন্য কোনও দিন। কিন্তু একদিন এই ঘটনা তোমাকেও ছুঁয়ে যাবে। আর সেই দিন দূরে নয়, খুব শিগগিরই।'
যুবসমাজের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন নৃত্যশিল্পী শ্রীনন্দা শঙ্করও। সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট শেয়ার করেছেন যার বাংলা তর্জমা করলে হয়, 'রাজনৈতিক দলগুলিকে ফ্যানক্লাবের সঙ্গে তুলনা করবেন না। খারাপ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করুন আর ভালো জিনিসের কদর করুন। আপনার স্বচ্ছ মানসিকতা এই দেশের সম্পদ, কোনও রাজনৈতিক দলের নয়।' আন্দোলনকারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে লেখেন, 'আমি ছাত্রছাত্রী ও তরুণ প্রজন্মের পাশে আছি। আমার পোস্টের বৃহত্তর অর্থ না বুঝে অনেকেই হয়তো আমার পোস্টের নিচে একে অপরের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়বেন। তার বদলে সচেতনভাবে, ভেবে-চিন্তে ভোট দিন।'
অভিনেতা সোহম মজুমদার ব্যক্তিগত মতামত শেয়ার করে লেখেন, 'আমি অনেক সুযোগ সুবিধা আর নিরাপত্তার মধ্যে বড় হয়েছি। সেই সঙ্গে ভালোবাসা, বাবা-মা আর পরিবারের স্নেহ। ওঁরা সবসময় আমাকে আগলে রেখেছেন। এখনও আমার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্নে থাকেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন তাঁদের উদ্বিগ্ন থাকতে হবে? আমরা প্রত্যেকেই অপরিপূর্ণ। কিন্তু, আজ যা দেখলাম তারপরও যদি আমরা নীরব থাকি তাহলে সেটা মেনে নেওয়া যায় না। গত ১২ বছরের তথাকথিত ইতিবাচক দিকগুলো দেখিয়ে আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন না। এআই কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের কথা বলবেন না। আমি পাল্টা বলব, সেই উন্নয়নের মূল্য দিচ্ছে আমাদের জল, আমাদের পরিবেশ, আর শেষ পর্যন্ত আমাদের ভবিষ্যৎ। জল সংকট, দূষণ এসব ধীরে ধীরে আমাদের সভ্যতাকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এবার মুখ খুলুন। জবাবদিহি চাই। কিছু বিষয়ের জন্য দায় স্বীকার করতেই হবে। আসুন, আমাদের তেরঙ্গার যে আদর্শ, ঐক্য-সাহস ও ন্যায় প্রকৃত অর্থে ফলপ্রশ্রু করুন।'
অভিনেত্রী মোক্ষাও রাজধানী দিল্লিতে ঘটে যাওয়া ঘটনার সমালোচনা করে লেখেন, 'সোশাল মিডিয়ার যুগে অন্তত একটা জিনিস খুব সহজ হয়েছে। সমাজের বিপদজনক পরিস্থিতি, বিশ্বাসঘাতকতা আর মানুষের মুখোশধারী শয়তানদের চিনে নেওয়া। তাদের জন্য আমার গভীর সমবেদনা। কারণ তারা হয়তো আত্মা আর বিবেক দুটোই বিসর্জন দিয়েছে। আর.জি. করের ঘটনার পর, আরও অনেক দুর্নীতি, আমার বহু কাছের আত্মীয়, পারিবারিক বন্ধু, এমনকী পরিবারের অনেক সদস্যের প্রতিও সেই আগের অনুভূতি আর নেই। যাদের একসময় সবচেয়ে বেশি সম্মান করতাম তাদের অনেককেই আজ ঘৃণা করি। তাই মনে হয় কিছুই বদলায়নি, বদলেছে শুধু মূর্তির গায়ের রং। একই মেরুদণ্ডহীন, আত্মস্বার্থে মগ্ন, অযোগ্য আর প্রতিভাহীন মানুষেরাই বারবার নতুন মোড়কে সামনে আসছে। সকলের আত্মা আর বিবেকের শান্তি কামনা করি।'
