দেশের একনম্বর নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হয়েও মাত্র ৩৮ বছর বয়সে কেরিয়ারের মধ্যগগনে এহেন আকস্মিক স্বেচ্ছাবসর, দেশের সঙ্গীতদুনিয়ার ইতিহাসে সম্ভবত বিরল! তবে অরিজিৎ সিং বরাবরই ট্রেন্ড সেটার। কেরিয়ারের গোড়া থেকেই নিজের ঝাঁজ বুঝিয়ে দিয়েছেন। নিঃশব্দে কাজের মাধ্যমেই প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাস্ত করেছেন। তবে এবার সম্ভবত নিজে সিংহাসন ছেড়ে দিয়ে বাকিদের জায়গা করে দিলেন।
প্লেব্যাক সম্রাটের আচমকা 'আলবিদা' ঘোষণায় সিনেদুনিয়ার সঙ্গীত সাম্রাজ্য যে নিঃস্ব হল, সেকথা বললেও অত্যুক্তি হয় না। নিজভূমে রাজপাট সাজিয়ে যোদ্ধা যখন মহারণক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন, তখন অরিজিৎ সিংয়ের আকস্মিক স্বেচ্ছাবসর নিয়ে একাধিক ত্বত্ত্ব চাউড় হয়েছে সিনেপাড়ায়। কেরিয়ারের উচ্চমার্গে থাকা প্লেব্যাক সম্রাটের সিদ্ধান্তে স্তম্ভিত বলিপাড়ার তাবড় সঙ্গীতশিল্পীরাও! যদিও ওয়াকিবহালমহল, গায়কের এহেন সিদ্ধান্তকে কেউ 'নতুন শুরুয়াত' আবার কেউ বা 'সঙ্গীতের অতল সাগরে অমৃতকুম্ভের সন্ধান' বলেই মনে করছেন, তবে দ্বিমতও যে নেই, এমনটা নয়!
অরিজিৎ সিং, ছবি- ফেসবুক
মঙ্গলবারের দ্বিতীয় পোস্টে অরিজিৎও স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, আগাম প্রতিশ্রুতিমাফিক এখনও কিছু কাজ বাকি রয়েছে তাঁর, চলতিবছরে সেগুলোই সম্পন্ন করবেন। তবে এরপর আর নতুন কোনও 'অ্যাসাইনমেন্ট' নেবেন না। অতঃপর তিনি যে সিনেদুনিয়ার সঙ্গীত প্রযোজকদের 'দাসবৃত্তি' ছেড়ে নিজস্বশৈলীর সঙ্গে পরিচয় করাতে চলেছেন, তেমন আভাসই মিলেছে। একথা বললেও অত্যুক্তি হয় না যে, বিগত কয়েক বছর ধরে অরিজিৎ সিংয়ের গাওয়া একাধিক প্লেব্যাক অনেকটা একই ধাঁচের! গায়ক নিজের পোস্টেও সেই 'একঘেয়েমি'র ইঙ্গিত দিয়েছেন। সিনেপাড়ার সঙ্গীত প্রযোজকদের বায়নাক্কা সামলে একজন ভার্সেটাইল গায়কের পক্ষে এভাবে বাস্তুতন্ত্রে টিকে থাকা যে 'পায়ে বেড়ি পরিয়ে দৌড় করানো'র মতোই, তা বলাই বাহুল্য। কানাঘুষো, সম্প্রতি বলিপাড়ার তাবড় সঙ্গীত প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গেও তেমনই এক সংঘাতে জড়িয়েছিলেন তিনি। তবে প্রতিবারের মতো এবারেও ভয়শূন্য চিত্তে উচ্চ শিরে বাণপ্রস্থ ঘোষণা করে নিজের দাপট বুঝিয়ে দিয়েছেন। আর ঠিক এখানেই অনন্য অরিজিৎ। যা নিয়ে সিনেপাড়ার সঙ্গীতমহলে আপাতত হা-পিত্যেশের অন্ত নেই! তবে এই প্রথমবার নয়। ছাব্বিশ সালের গোড়াতেই সকলকে চমকে দিয়ে যেমন প্লেব্যাকের দুনিয়াকে বিদায় জানিয়ে শোরগোল ফেললেন, এর আগেও একাধিকবার এহেন নির্ভীক সত্ত্বার পরিচয় দিয়েছেন জিয়াগঞ্জের মাটির মানুষ 'সোমু'।
১৪০ কোটির দেশের বাইরেও অরিজিতের বিপুল সংখ্যক অনুরাগী রয়েছে। অতঃপর সিনেপাড়ার প্রযোজকদের কাছে অরিজিৎ একমাত্র 'অপশন' হলেও প্লেব্যাক ইন্ডাস্ট্রি অরিজিতের একমাত্র 'অপশন' নয়...।
একবার এক সাক্ষাৎকারে কোনওরকম কুণ্ঠাবোধ না রেখেই মিউজিক সংস্থাগুলির উদ্দেশ্যে সরাসরি বলেছিলেন, "হয় কাজ করিয়ে যথাযথ টাকা দিন, নইলে করাবেন না।" মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে কীভাবে শিল্পীদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে পারিশ্রমিক ছেঁটে দেওয়া হয়, সেপ্রসঙ্গেও মুখ খুলে অনেকের বিরাগভাজন হন অরিজিৎ। হয়তো গ্ল্যামারজগতের সেই 'মেকি'পনা থেকে দূরে থাকতেই মুম্বই ছেড়ে নিজভূমে আলাদা রাজপাট গড়ে তুলেছেন তিনি। জিয়াগঞ্জের শিবতলা ঘাটের অনতিদূরের যে বাড়ির দরজায় কখনও কড়া নেড়ে গিয়েছেন এড শিরান আবার কখনও বা মার্টিন গ্যারিক্সের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা শিল্পীরা। আবার ১৪০ কোটির দেশের বাইরেও অরিজিতের বিপুল সংখ্যক অনুরাগী রয়েছে। অতঃপর সিনেপাড়ার প্রযোজকদের কাছে অরিজিৎ একমাত্র 'অপশন' হলেও প্লেব্যাক ইন্ডাস্ট্রি যে অরিজিতের একমাত্র 'অপশন' নয়, বাণপ্রস্থের ঘোষণা সেরে সেটাই বুঝিয়ে দিলেন তিনি।
ঘনিষ্ঠমহল বলছে, প্লেব্যাক ছাড়ার এই সিদ্ধান্ত অরিজিতের একদিনের নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি চাইছিলেন। অবশেষে 'নতুন ভূমিকা' সেই সুযোগ এনে দিয়েছে তাঁর হাতে। কারণ খুব শিগগিরি তিনি পরিচালক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে চলেছেন। গতবছরই বীরভূমে সেই ছবির শুটিং হয়েছে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকিকন্যা শোরা এবং খ্যাতনামা বলিউড অভিনেতা দিব্যেন্দু ভট্টাচার্যকে নিয়ে। কানাঘুষো, চলতি বছরে সেই সিনেমা এবং প্রতিশ্রুতিমাফিক বাকি প্লেব্যাকের কাজ শেষ করে তিনি এবার নিজের কাজে ডুব দিতে চলেছেন। আগামীতে বিদেশেও মাস খানেকের শিডিউলে ছবির শুটিং করার কথা অরিজিতের। এযাবৎকাল নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে প্রতিশ্রুতির ভিড়ে সেসব কাজ বিশেষ এগোতে পারেননি গায়ক। এবার নাকি পুরোদস্তুর সেকাজেই হাত দিতে চলেছেন তিনি। আর তাঁর সেই নতুন ইনিংসের সাক্ষী থাকার অপেক্ষাতেই দিন গোনা শুরু করেছেন গর্বিত ভক্তকুল। তাঁদের কথায়, 'ফিনিক্স পাখি এবার নতুনভাবে আসছে। তবে ব্রেক কে বাদ!' কথাতেই আছে সবুরে মেওয়া ফলে। অনুরাগীদের পাখির চোখ এখন সেই 'ম্যাজিক্যাল মেওয়া'র দিকেই।
