টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে খেলতে আসেনি পাকিস্তান। ক্ষমতার দম্ভে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিলেন মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তাঁর একক সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ দলের ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ায় বাংলাদেশকে এখনও চরম মূল্য গুনতে হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মহাক্ষমতাধর উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ছিলেন আইন উপদেষ্টাও। সেই সময় যাঁরা নজরুলের পাশে ছিলেন, এখন তাঁরাই নজরুলের বিরোধিতা করছেন। স্পষ্টত, ইউনুসের আমলে যেভাবে ভারত-বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়েছিল, সেখান থেকে ফিরে আসতে চাইছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশে তারেক রহমানের সরকার আসার পর আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ক্রিকেট বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে। প্রাক্তন অধিনায়ক তামিম ইকবাল এখন বিসিবির বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সভাপতি। ইউনুস আমলে তাঁকে ‘ভারতের দালাল’ আখ্যা দিয়ে বিতর্ক বাঁধিয়েছিলেন তৎকালীন বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম। সেই তিনিই এখন বাংলাদেশের বিশ্বকাপে না যাওয়ার দায় চাপাচ্ছেন সাবেক আইন ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের উপর। নাজমুলের বক্তব্য, "তখন যদি এখনকার আসিফ মাহমুদ, সজীব ভুঁইয়ারা থাকতেন, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হত। আসিফ নজরুল একটু একরোখা মানুষ। যেটা বলেন, সেটাতেই অটল থাকতে চান। তিনি আমাদের সঙ্গে কোনও কথা বলার আগেই ফেসবুকে নিজের বক্তব্য দিয়ে দেন। অবশ্য আসিফ নজরুল ভারত বিদ্বেষী হিসেবেও পরিচিত। এমনকী পরের দিনও তিনি আরেকটা বক্তব্য দেন। তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে নানা যুক্তি দেখিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কাজ করেছেন।"
শুধু নাজমুল নয়, বিসিবির প্রাক্তন পরিচালক আহমেদ সাজ্জাদুল আলমও একই সুর ধরেছেন। নজরুল যে বাংলাদেশকে ভারতে খেলতে দিতে চাননি, তার পিছনে অন্য উদ্দেশ্য দেখছেন সাজ্জাদুল। তিনি বলছেন, "সরকারের ভেতরে থাকা কোনও ব্যক্তি হয়তো বিশেষ কোনও উদ্দেশে এই মনোভাব পোষণ করেছেন বা ব্যক্তিস্বার্থে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।" এদিকে নতুন সরকারের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক কিছুতেই মানতে পারছেন না যে বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি আসরে বাংলাদেশ অংশ নেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এই সিদ্ধান্ত নিতে বিসিবিকে বাধ্য করেছেন, নাকি বিসিবি'রও দায় আছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। গত ১৭ মার্চ তাই জানিয়েছিলেন যে এর তদন্ত করবে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। খুব দ্রুত মূল কারণ বেরিয়ে আসবে বলেই আশ্বস্ত করেছেন তিনি।
তখন যদি এখনকার আসিফ মাহমুদ, সজীব ভুঁইয়ারা থাকতেন, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হত। আসিফ নজরুল একটু একরোখা মানুষ। যেটা বলেন, সেটাতেই অটল থাকতে চান। তিনি আমাদের সঙ্গে কোনও কথা বলার আগেই ফেসবুকে নিজের বক্তব্য দিয়ে দেন। অবশ্য আসিফ নজরুল ভারত বিদ্বেষী হিসেবেও পরিচিত।
আমিনুল বলেছেন, "বিসিবির নির্বাচন নিয়ে যেমন অস্বচ্ছতার তদন্ত হয়েছে, আমি চাই এই বিষয়টা নিয়েও যেন তেমন হয়। স্বাধীন একটা তদন্তদল কাজ করবে। আমরাও চাই, বিশ্বকাপে না যাওয়ার আসল কারণ বেরিয়ে আসুক। কারা দোষী, সাজা কী হবে, এসব নিয়ে এখনই ভাবছি না। আগে একটি কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি প্রকৃত ঘটনা যাচাই করবে।" ভবিষ্যতে যাতে বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে খেলতে না যাওয়ার ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে, সেটাও নিশ্চিত করতে চান আমিনুল। তিনি বলেন, "দেশের ক্রীড়াঙ্গন থাকবে সবকিছুর ওপর। এখানে কোনও রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ থাকবে না। আমরা চাই না, নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তি বা কারও স্বার্থে অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নষ্ট হোক। আগামী দিনের কথা চিন্তা করে এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে যেন এমন কলঙ্কিত অধ্যায়ের সাক্ষী হতে না হয়, এ জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের বিশ্বকাপে খেলতে না যাওয়ার কারণ খোঁজা প্রয়োজন।"
বাংলাদেশ সরকারের হঠাৎ এই তৎপরতার মধ্যে কিন্তু রাজনৈতিক পদক্ষেপ খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। ইউনুসের সময় বাংলাদেশে ছিল 'মবোক্রেসি'র আমল। কথায় কথায় ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন নেতা-মন্ত্রীরা। যাতে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক ক্রমশ তলানিতে ঢেকেছে। ক্রিকেটও ছিল তাঁর অঙ্গ। বিশ্বকাপে খেলতে না আসা শুধু ভারত বিদ্বেষ নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আইসিইউতে পাঠানোর চক্রান্ত বলে অনেকে মনে করছেন। এমনকী বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্তে কর্মকর্তারাই মন্তব্য করেছিলেন, পরে নির্বাচিত সরকার এই 'ড্যামেজ কন্ট্রোল' করবেন। আপাতত তারেক সরকারকে সেটাই করতে হচ্ছে। তাঁর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর। দিল্লির সঙ্গে দূরত্ব কমাতে ক্রিকেট অন্যতম কূটনৈতিক মাধ্যম হতে পারে। সম্প্রতি বাংলাদেশকে ডিজেলও দিয়েছে ভারত।
ইউনুসের সময় বাংলাদেশে ছিল 'মবোক্রেসি'র আমল। কথায় কথায় ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন নেতা-মন্ত্রীরা। যাতে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক ক্রমশ তলানিতে ঢেকেছে। ক্রিকেটও ছিল তাঁর অঙ্গ। বিশ্বকাপে খেলতে না আসা শুধু ভারত বিদ্বেষ নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আইসিইউতে পাঠানোর চক্রান্ত বলে অনেকে মনে করছেন।
ক্রীড়া মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করার আগে এখন অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গেছে যে আসিফ নজরুলের জেদের বলি হয়েছে দেশের ক্রিকেট। বিসিবির তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের আরেকজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টাকে কাঠগড়ায় তুলেছেন এভাবে, "মুস্তাফিজকে (রহমান) আইপিএল থেকে প্রত্যাহার করার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ঘটনাগুলো সাজালেই তো সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায় যে কার ইশারায় কী হয়েছিল। সে সময় আমাদের কথা কেউই শোনেননি। আসিফ নজরুলের কথায় বিশ্বকাপ খেলতে না চাওয়া চরম মাত্রার বোকামি ছিল।"
