অজয় শর্মা। ভারতীয় ক্রিকেটে এই নামটা উঠলে অনেকেই দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে সাড়াজাগানো এই 'ফরিস্তা' দেশের হয়ে এক টেস্ট এবং ৩১ ওয়ানডে খেলেছেন। সময়টা যদি নব্বইয়ের দশকে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, দেখা যাবে কপিল দেব, মহম্মদ আজহারউদ্দিন, শচীন তেণ্ডুলকরদের সঙ্গে খেলছেন তিনি। তবুও কখনও তারকা হয়ে উঠতে পারেননি। তার উপর ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগে আজীবন নির্বাসিত হতে হয়েছিল। সেখান থেকে দীর্ঘ আইনি যুদ্ধে জিতে ফিরে আসা। তাঁর কোচিংয়েই রনজিতে ‘অসাধ্যসাধন’ করেছে জম্মু ও কাশ্মীর। 'ভারতসেরা' হয়েছেন আকিব নবি, শুভম পুণ্ডির, আবদুল সামাদরা।
অজয় শর্মাকে জম্মু-কাশ্মীরের কোচিংয়ে নিয়ে আসার নেপথ্যে রয়েছেন মিঠুন মানহাস। যিনি বর্তমান বিসিবিআই সভাপতি। কিছুদিন আগেও জেকেসিএ-র পরিচালন কমিটিতে ছিলেন। ট্যালেন্ট হান্টের মতো পদক্ষেপ অনেকটাই তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত। সঙ্গে আরও নানাবিধ উদ্যোগ। সেই অজয় শনিবার বলছেন, "ক্রিকেট থেকে দূরে সরে গিয়েছিলাম। কর্তারা ভরসা রেখেছিলেন। ওঁরাই আমায় পুনর্জন্ম দিয়েছেন।" কেমন ছিল জম্মু-কাশ্মীরে প্রথম সব কিছু?
চার মরশুম আগের কথা। সেই সময় দিল্লির অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কোচ ছিলেন অজয় শর্মা। বর্তমান বোর্ড সভাপতি মিঠুন তখন জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেট অপারেশনস ডিরেক্টর। তাঁরই ফোন যায় অজয়ের কাছে। বহু পুরনো তাঁদের 'বন্ধুত্ব'। অজয়ের নেতৃত্বেই দিল্লির হয়ে অভিষেক করেছিলেন মিঠুন। ফোনে কিছুটা ভূমিকার পর আসল কথাটি পারেন। প্রস্তাব দেন জম্মু-কাশ্মীরের কোচ হওয়ার। যদিও সেই প্রস্তাব পত্রপাঠ খারিজ করে দিয়েছিলেন। এদিকে আবেদনের শেষ তারিখ ঘনিয়ে আসছে। মিঠুন আবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু এবার মত বদলাল। "আমি ভাবলাম কেন নয়? মিঠুন জম্মু-কাশ্মীরকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিল। আমি শেষ পর্যন্ত ওকে সমর্থন করলাম।"
চার মরশুম আগের কথা। সেই সময় দিল্লির অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কোচ ছিলেন অজয় শর্মা। বর্তমান বোর্ড সভাপতি মিঠুন তখন জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেট অপারেশনস ডিরেক্টর। তাঁরই ফোন যায় অজয়ের কাছে। বহু পুরনো তাঁদের 'বন্ধুত্ব'। অজয়ের নেতৃত্বেই দিল্লির হয়ে অভিষেক করেছিলেন মিঠুন। ফোনে কিছুটা ভূমিকার পর আসল কথাটি পারেন। প্রস্তাব দেন জম্মু-কাশ্মীরের কোচ হওয়ার। যদিও সেই প্রস্তাব পত্রপাঠ খারিজ করে দিয়েছিলেন। তারপর...
জম্মু-কাশ্মীরে তাঁর প্রথম দিনগুলি একেবারেই মসৃণ ছিল না। দলে যোগ দিয়ে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, 'তারকা সংস্কৃতি' নির্মূল করতে চান। একথা অনেকেরই হজম হয়নি। অনেকেই হয়তো জানেন না, আবদুল সামাদকে এক মাসের জন্য দল থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তাঁর এই পদক্ষেপ বাকি ক্রিকেটারদের পছন্দ হয়নি। তাঁরা ব্রিগেডিয়ার অনিল গুপ্তের নেতৃত্বে আদালত-নিযুক্ত কমিটিতে অভিযোগ করে চিঠিও লেখেন। পরিস্থিতি যাতে আরও খারাপ না হয়, সেজন্য অজয় শর্মাকে তাঁর অবস্থান নমনীয় করার পরামর্শ দেয়। এককালের সেই 'ডিটেক্টর'ই খেলোয়াড়দের ধীরে ধীরে আপন করে নিলেন। কোচিং পদ্ধতির কি পরিবর্তন করলেন। "আমার কাছে এখনও সেই চিঠিগুলি রয়েছে। ওরা তো আমাকে স্বৈরশাসক ভেবে বসেছিল। যদিও আমি আমার কোচিং পদ্ধতি পরিবর্তন করিনি। ধীরে ধীরে ওদের পছন্দমতো কথা বলতে শিখেছি আমিও।" ইএসপিএ'কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছিলেন অজয়।
কিন্তু আচমকা জম্মু-কাশ্মীর ক্রিকেটারদের মন বদলে গেল কীভাবে? কোনও একদিন মুম্বই বিমানবন্দরে অজয় শর্মাকে দেখেন প্রাক্তন ক্রিকেটার লক্ষ্মীপতি বালাজি। তাঁকে 'শতকো কা শোহেনশা' (শতকের সম্রাট) বলে উষ্ণ অভ্যর্থনাও জানান। খেলোয়াড়রা এই ঘটনায় অবাক হয়ে যান। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গুগল সার্চ করে তাঁরা জানতে পারেন অজয় শর্মার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে রেকর্ড সম্পর্কে। তারপর বাকিটা ইতিহাস। বহু প্রতিকূলতাকে জয় করে এই অজয়ই হয়ে উঠেছেন 'স্বপ্নের ফেরিওয়ালা'। তাঁর প্রশিক্ষণেই ইতিহাস গড়েছে জম্মু-কাশ্মীর।
রনজি ফাইনালে কর্নাটককে হারানো সহজ কাম্য ছিল না। তাদের দলে অন্তত পাঁচ জন এমন ক্রিকেটার ছিলেন, যাঁরা ভারতীয় দলে খেলেছেন। কেএল রাহুল, ময়াঙ্ক আগরওয়াল, দেবদত্ত পাড়িক্কল, করুণ নায়ার, প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ। তার উপর ঘরের মাঠে খেলেছিল কর্নাটক। কিন্তু এই 'যৎসামান্য' প্রতিকূলতায় দমবার পাত্র ছিলেন না জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটাররা। বিপক্ষের ডেরায় গিয়ে রনজি ট্রফি ছিনিয়ে আনে জম্মু ও কাশ্মীর।
রূপকথার মতো এই উত্থানে সাক্ষী থেকে অজয় বলছেন, "জম্মু-কাশ্মীরে প্রতিভার অভাব নেই। এখানে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে সঠিক পরামর্শের প্রয়োজন।" উল্লেখ্য, ঘরোয়া ক্রিকেটে অসাধারণ রেকর্ডের অধিকারী এই অজয় শর্মা। ৩৮টি সেঞ্চুরি। সঙ্গে ৬৭.৪৬ গড়ে ১০ হাজারের বেশি রান। দেশের হয়ে ৩১টি ওয়ানডেতে ৪২৪ রান। সঙ্গে বাঁ-হাতি স্পিন বলের ছোবলে ১৫টি উইকেটও। ১৯৯৯-২০০০ মরশুমের রনজি ট্রফিতে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন। ২০০০ সালের সেই কালো অধ্যায়ে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর আজহারউদ্দিনের সঙ্গে তাঁকেও আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর দীর্ঘ আইনি-যুদ্ধ। ২০১৪ সালে সেই 'যুদ্ধ' জেতেন। অজয়কে নির্দোষ ঘোষণা করে দিল্লির এক আদালত। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। সেখান থেকেই এই ফিরে আসা। পুনর্জন্মও। তাঁর মতো পুনর্জন্ম হয়েছে জম্মু-কাশ্মীরেরও। ৬৬ বছর রনজির সেমিফাইনালে উঠতে না পারা দলই আজ তাঁর তালিমে 'ভারতসেরা'।
