shono
Advertisement
India Women's Cricket Team

মোম হয়ে জ্বালো অমাবস্যার আঁধেরা... হরমনরাই যেন ভারতীয় ক্রিকেটের অর্ধেক আকাশ

কয়েক দশক আগেও ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে ছিল অদ্ভুত এক বৈপরীত্য।
Published By: Prasenjit DuttaPosted: 12:03 AM Nov 03, 2025Updated: 12:03 AM Nov 03, 2025

প্রসেনজিৎ দত্ত: চোখটা বন্ধ করুন। এক লহমায় নিজের ভাবনাকে নিয়ে যান কয়েক দশক আগে। তখনও সব কিছু ছিল। জেদ, ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায়, মেজাজ - সব। ছিল না কেবল তাঁদের নিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস। দুঃখ মন্থন করে 'না পাওয়ার দেশ'টাকেই মানিয়ে নেওয়া রপ্ত করে নিতে নিতেই সাহসী হয়েছেন তাঁরা। নিজে নিজেই। কারণ কয়েক দশক আগেও ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে ছিল অদ্ভুত এক বৈপরীত্য।

Advertisement

এই চকমকি দুনিয়ায় কেউ কি বুঝবে সেসব দুর্বিষহ দিন? কতজনের কাছেই বা পরিচিত মহিলা ক্রিকেটের দুরতিক্রমণীয় দিনগুলি রাতগুলি? কেউ কি জানেন, ছোটবেলায় ছেলেদের সঙ্গে খেলার জন্য চুল কাটতে চুল কাটতে হয়েছিল বিশ্বকাপ ফাইনালে অসাধারণ শেফালি বর্মাকে। লম্বাকেশী মেয়েরা কেন ব্যাট ছোঁবেন? তাই 'অহং'কেই আড়াল করা। পাছে না টিটকিরি জোটে। বাবা-মায়ের সমর্থন এবং জেদের 'আদরে' তিনি এখন ভারতীয় তারকা।

কিংবা হরমনপ্রীত কৌর? পাঞ্জাবের ছোট্ট শহর থেকে উঠে আসা। একটা সময় লিঙ্গবৈষম্যের শিকার হতে হয়েছিল। সেই সব পুরুষালি 'নজর' এড়িয়ে আজ তিনি দেশের ক্যাপ্টেন। তালিকায় এমন অনেকেই। কাডাপা জেলার বীরাপ্পা মণ্ডলের এররামলে গ্রামের বাসিন্দা শ্রী চরণী। তিনিই অন্ধ্রপ্রদেশের ওয়াইএসআর-কাডাপা জেলার প্রথম মহিলা, যিনি ২০ বছর বয়সে ভারতীয় দলে সুযোগ পান। হ্যাঁ, জেদই তাঁর চালিকাশক্তি। একদিন সোনার দোকানে গিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছিলেন। ক্যাশিয়ার জিজ্ঞেস করেন, চরণীর সঙ্গে থাকা কিট ব্যাগটি সম্পর্কে। মা উত্তর দেন, "ও ক্রিকেটার। একদিন আমার মেয়ে ভারতের হয়ে খেলবে।" সেই মেয়ে একদিন প্লাস্টিকের ব্যাট দিয়ে মায়ের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতেন। সেই মেয়েই এখন স্পিনের ইন্দ্রজালে বিপক্ষের ত্রাস। বিশ্বকাপে ধারাবাহিকতার আরেক নাম শ্রী চরণী।

অমনজ্যোত কৌরের জীবনটা একবার ভাবুন। সংগ্রাম মূলত আর্থিক সীমাবদ্ধতা, সামাজিক বাধা সমস্ত কিছু ঝেলতে হয়েছিল। বাবা কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। তবুও স্বপ্ন দেখা ছাড়েননি। আর বাবার সেই স্বপ্নকে সত্যি করে ভারতীয় দলের সম্পদ অমনজ্যোত। কিংবা আমাদের 'ঘরের মেয়ে' রিচা ঘোষের গল্পটাও ভাবুন। শিলিগুড়ির মাঠ থেকে বিশ্বকাপ ফাইনাল পর্যন্ত যাত্রায় লুকিয়ে আছে অগণিত ত্যাগ আর স্বপ্নপূরণের ইতিবৃত্ত। একটা সময় বোর্ডের পরীক্ষা না দিয়ে খেলতে গিয়েছিলেন ম্যাচ। সেই মেয়ের চোখেই আজ আগুন দেখছে বিশ্ব। অথবা জেমাইমা? সেমিফাইনালে তাঁর ইনিংসের প্রাবল্যের কাছেই হার মেনেছে অস্ট্রেলিয়া। প্রবল মানসিক যন্ত্রণায় অবসাদে মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন একটা সময়। নিজেকে জাতীয় দলে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করেন লড়াই। সঙ্গী বাইবেল। এক বছর আগেও তাঁর পথ এতটা 'সরল' ছিল না। বাবা জড়িয়ে পড়েন বিতর্কে। জিমখানা ক্লাবের সদস্যপদ বাতিল হয় তাঁর। সেখান থেকে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প রচনা।

একদিকে বিশ্বজোড়া খ্যাতির আহ্বান, অন্যদিকে মেয়ে মানেই ঘরকন্নাই মুখ্য – এমনই ‘অরূপকথা’র মতো সংস্কারে বিদ্ধ সমাজ কেবল ক্রিকেট নয়, যে কোনও খেলাতেই অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে একটা সময় নিরুৎসাহিত করে এসেছে। ফাইনালের আগেই তো এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিমন্থন করেছিলেন ভারতীয় মহিলা দলের প্রথম অধিনায়ক শান্তা রঙ্গস্বামী। তখন অসংরক্ষিত কোচে ভ্রমণ করতে হত তাঁদের। ডরমিটরির মেঝেতে ঘুমাতে হত। নিজেদের বিছানা, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিজেদেরই বহন করতে হত। ক্রিকেট কিট পিঠে ব্যাকপ্যাকের মতো বেঁধে রেখে এক হাতে থাকত স্যুটকেস। খেলা মানেই যেন বিড়ম্বনা! সেখান থেকে ফ্যান্টাসির ভিড়ে নিজেদেরটুকু ছিনিয়ে এগিয়ে গিয়েছেন ভারতের মেয়েরা। বিসিসিআই-সহ রাজ্য ক্রিকেট সংস্থারাও মহিলা ক্রিকেটের সাফল্যে বিশাল অবদান রেখেছে। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরের গোধূলিতে, শহর থেকে শহরাঞ্চলে স্বীকৃতির মোহে না ডুবে তাঁরাই যেন আজ ভারতীয় ক্রিকেটের অর্ধেক আকাশ। তাঁরাই আগুন বহ্নি। তাঁরাই মোম হয়ে জ্বালে অমাবস্যার আঁধেরা।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
  • ছিল না কেবল তাঁদের নিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস।
  • দুঃখ মন্থন করে 'না পাওয়ার দেশ'টাকেই মানিয়ে নেওয়া রপ্ত করে নিতে নিতেই সাহসী হয়েছেন তাঁরা।
  • কতজনের কাছেই বা পরিচিত মহিলা ক্রিকেটের দুরতিক্রমণীয় দিনগুলি রাতগুলি?
Advertisement