রাজস্থান রয়্যালস: ১৫৫/৯ (বৈভব ৪৬, বরুণ ১৪/৩, কার্তিক ২২/৩)
কলকাতা নাইট রাইডার্স: ১৬১/৬ (রিঙ্কু ৫৩*, অনুকূল ২৯*, জাদেজা ৮/২)
৪ উইকেটে জয়ী নাইট রাইডার্স
মঞ্চ ছিল বৈভব সূর্যবংশীর। এক ১৫ বছরের ছেলের জন্য গলা ফাটাতে তৈরি ছিল ইডেন। বৈভব নিজের কাজ করে গেল ঠিকই। কিন্তু দিনের শেষে গল্প লেখা হল বরুণ চক্রবর্তী ও রিঙ্কু সিংয়ের পুনর্জন্মের। অবশেষে ক্রিকেট দেবতা করুণা করলেন কেকেআর'কে। রাজস্থান রয়্যালসের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রথমবার জয় পেল কলকাতা নাইট রাইডার্স। বিস্ময়বালক বৈভব রান পেলেও ম্যাচ ছিনিয়ে নিতে পারেনি রবিবার। বন্দি হল বরুণের নাগপাশে। অন্যদিকে জীবনদান পেয়ে ইডেনে ফিরলেন 'ভিন্টেজ' রিঙ্কু। প্রায় হেরে যাওয়া ম্যাচকে নিজের প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ হিসেবে বেছে নিলেন। ছক্কা মেরে শুধু হাফসেঞ্চুরি করলেন না, নাইটদের ম্যাচও জেতালেন। ১৫৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করে রাজস্থানকে ৪ উইকেটে হারিয়ে এবারের আইপিএলে প্রথম জয়ের স্বাদ পেল নাইটরা।
রবিবার ভরদুপুরে ইডেনের বাইরে বেগুনি-সোনালি জার্সির সঙ্গে গোলাপি জার্সিরও ছড়াছড়ি। পিঠে ৩ নম্বর, নাম সূর্যবংশী। বিরাট কোহলি বা মহেন্দ্র সিং ধোনিরা ইডেনে এলে এরকম হয়। কিন্তু একজন ১৫ বছর বয়সি 'বাচ্চা'র জন্য! ক্রিকেটের কাহিনি নতুন করে লিখছে বৈভব। রাজস্থান রয়্যালস টসে জেতায় বৈভব-যশস্বী জয়সওয়ালকেই প্রথমে ব্যাট করতে দেখে ইডেন। ডিজে বলছেন, 'উইকেট' চাই। কিন্তু নাইট রাইডার্সের জার্সি-টুপি পরা দর্শকরাও চাইছেন বৈভবের ব্যাটে ছক্কা দেখতে। অন্যদিনের মতো এদিনও সে হতাশ করেনি। তবে ঠিক বৈভবোচিত ইনিংস নয়। ২৮ বলে ৪৬ রান করল ঠিকই। তার ব্যাট থেকে এল ৬টা চার ২ দু'টো চার। স্ট্রাইক রেট ১৬৪.২৯। বহু ক্রিকেটারের স্বপ্ন, কিন্তু বৈভবের জন্য বড্ড 'কম'। পরিসংখ্যান বলছে, এবারের আইপিএলে এটাই বৈভবের সবচেয়ে ধীরগতির ইনিংস। যে কি না জশপ্রীত বুমরাহ, জশ হ্যাজেলউডকে সম্মান করেনি, সে বন্দি হল সুনীল নারিন, বরুণ চক্রবর্তীর নাগপাশে।
ঠিক সময় কামব্যাক হল বরুণের। শুধু বৈভব নয়, ধ্রুব জুরেল ও রিয়ান পরাগকে ফিরিয়ে রাজস্থানের ব্যাটিংয়ের মাথা মুড়িয়ে দেন বরুণ। বিশ্বকাপের শেষদিক থেকে তাঁর বোলিং নিয়ে কম চর্চা হয়নি। অনেকে তো আগ বাড়িয়ে বলেই রেখেছিলেন, বরুণের সব রহস্য ফাঁস! ইডেন দেখল বরুণাস্ত্রের ফাঁস কাকে বলে। চরিত্রবিরোধীভাবে ইডেনের পিচ এদিন কিছুটা স্লো। নারিনও গতি কমিয়ে দু'টি উইকেট ঘরে তুললেন। যশস্বী (৩৯) ও ডোনোভান ফেরেরাকে আউট করেন তিনি। বাকিটা তরুণ তুর্কি কার্তিক ত্যাগীর কামাল। রবীন্দ্র জাদেজা, সিমরন হেটমায়ার ও রবি বিষ্ণোইকে গতিতে পরাস্ত করেন তিনি। রাজস্থানের ইনিংস শেষ হয় মাত্র ১৫৫ রানে।
বিস্ময়বালক বৈভব রান পেলেও ম্যাচ ছিনিয়ে নিতে পারেনি রবিবার। বন্দি হল বরুণের নাগপাশে। অন্যদিকে জীবনদান পেয়ে ইডেনে ফিরলেন 'ভিন্টেজ' রিঙ্কু। প্রায় হেরে যাওয়া ম্যাচকে নিজের প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ হিসেবে বেছে নিলেন। ছক্কা মেরে শুধু হাফসেঞ্চুরি করলেন না, নাইটদের ম্যাচও জেতালেন।
অল্প রানের লক্ষ্য। জয় হতে পারত সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু না, নাইটরা তো সহজ ম্যাচ কঠিন করতে ভালোবাসে। ওপেনিং জুটিতে উঠল একটা বিরাট শূন্য। রীতি মেনেই জোফ্রা আর্চার প্রথম বলে উইকেট পেলেন। তাঁর আগুনে গতির বল টিম সেইফার্টের উইকেট ভেঙে দেয়। এরপর নান্দ্রে বার্গারের বলে ক্যাচ দিয়ে অজিঙ্ক রাহানেও সেই পথ ধরলেন। অঙ্ককৃষ রঘুবংশী (১০), ক্যামেরন গ্রিন (২৭), রভম্যান পাওয়েলরা (২৩) ধীরগতির ব্যাটিং করে চাপ আরও বাড়ালেন। দুয়েকটা চার-ছক্কা এলেও সেটা যথেষ্ট ছিল না। এবার ফাঁস বাঁধলেন রবি বিষ্ণোই, রবীন্দ্র জাদেজারা। এমনকী উঠতি স্পিনার যশ পুঞ্জাও রমনদীপ সিংয়ের উইকেট তুলে নিলেন।
রবিবার মায়াবী ইডেন। নিজস্ব চিত্র
৮৫ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে তখন ধুঁকছে নাইটরা। কিন্তু রিঙ্কু সিং যেন বললেন, "আমি আছি।" বুক চিতিয়ে শেষ পর্যন্ত লড়লেন। তাঁর অফ ফর্ম নিয়ে প্রচুর কথা হচ্ছে। তাঁকে দল থেকে বাদ দেওয়ার কথাও হচ্ছিল। চাপ তো একটা থাকেই। শুরুতে একেবারেই স্বচ্ছন্দে ছিলেন না। তবে ক্রমাগত স্ট্রাইক রোটেট করে যান। জাদেজার বলে একটা সহজ সুযোগও দিয়েছিলেন। কিন্তু নান্দ্রে বার্গার 'লোপ্পা' ক্যাচ মিস করেন। কথায় বলে সাহসীদের ভাগ্য সাহায্য করে। আর জীবনযুদ্ধের কঠিন লড়াই পার করে আসা রিঙ্কুর সাহস নিয়ে অন্তত কোনও কথা হতে পারে না। আর্চারকে দুটো চার মারার পর যেন সেই পুরনো 'সিং ইজ কিং' রূপটি ফিরে পেলেন। উলটো দিকে অনুকূল রয় কয়েকটা বাউন্ডারি মেরে চাপ আরও কমালেন। ১৬ বলে ২৯ রানে অপরাজিত ইনিংসটি না থাকলে হয়তো রিঙ্কুও নাইটদের উদ্ধার করতে পারতেন না। তবে দিনের শেষে 'নায়ক' রিঙ্কুই। শেষ পর্যন্ত মাটি কামড়ে পড়ে থাকলেন। জানতেন, লক্ষ্যটা বড় নয়। ক্রিজে থাকলে জয় আসবে। সেটাই হল। শেষ ওভারে দরকার ছিল মাত্র ৯ রান। পরপর দুই বলে চার ও শেষে ছক্কা হাঁকিয়ে নাইটদের ম্যাচ জেতালেন। সেই সঙ্গে নিজের হাফসেঞ্চুরিও পূরণ করে ফেলেন। নাইটরা জিতল ৪ উইকেটে। ৭ ম্যাচে ৩ পয়েন্ট নিয়ে 'লাস্ট বয়' থেকে উঠে এল নবম স্থানে।
