প্রথম বল। সামনে বৈভব সূর্যবংশী। হার্ড লেংথের বাউন্স সামলাতে পারল না ১৫ বছরের বিস্ময় প্রতিভা। ক্যাচ দিয়ে আউট।
চতুর্থ বল। প্রতিপক্ষ ধ্রুব জুরেল। এবার লেংথ বল। ব্যাটের কোনায় লেগে উইকেট ছিটকে দিল।
প্রথম ওভারের শেষ বলে সামনে লুয়ান-ড্রে প্রিটোরিয়াস। প্যাডের উপর বল। ডিপ ব্যাকওয়ার্ড স্কোয়ার লেগে ক্যাচ।
আবার তৃতীয় ওভারের শেষ বল ফুল লেংথ, একটু বাইরের দিকে। চালাতে গিয়ে ক্যাচ তুলে আউট রাজস্থান রয়্যালসের অধিনায়ক রিয়ান পরাগ।
চারটে উইকেটের পিছনে একজনের হাত। তিনি প্রফুল হিঞ্জে (Praful Hinge)। সানরাইজার্স হায়দরবাদকে জেতানোর প্রথম কারিগর। দিনের শেষে তাঁর বোলিং পরিসংখ্যান ৪-০-৩৪-৪। আইপিএলের ইতিহাসে প্রথম ওভারেই তিন উইকেট তোলার একমাত্র নজির বিদর্ভের বোলারের হাতে। জশপ্রীত বুমরাহ, লাসিথ মালিঙ্গা বা ডেল স্টেইনের মতো তারকাদেরও এই নজির নেই। সোমবারই তাঁর আইপিএলে অভিষেক হয়েছে। আর প্রথম ম্যাচের নামার আগে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, বৈভবকে আউট করবেন। সেটাই করে দেখিয়েছেন।
কিন্তু কে এই প্রফুল? ২০০২ সালে নাগপুরে জন্ম। বাবা পেশায় ছিলেন সরকারি কর্মচারী। দিদি দিনরাত এক করে পড়াশোনা করতেন চাটার্ড অ্যাকাউন্ট হওয়ার জন্য। ভোর চারটের সময় যখন দিদির পড়া শেষ হত, তখন ভাই বেরোতেন অনুশীলনের জন্য। ঘরের আলো বন্ধ করা নিয়ে প্রায়ই ঝামেলা হত। তবে পড়াশোনায় তেমন মন ছিল না প্রফুলের। খেলার মাঠই সব, বাইশ গজই জীবন। বাবা প্রকাশও একসময় পেসার ছিলেন। তবে উচ্চ পর্যায়ে কখনও খেলা হয়নি। প্রথম দিকে ছেলের ক্রিকেট খেলা গুরুত্ব দিয়ে দেখেননি। সোমবার ম্যাচের পর এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে তিনি বলেন, "ও আমাকে একদিন বলে কোনও ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করে দিতে। কিন্তু ক্রিকেট তো খুব খরচসাপেক্ষ খেলা। তাই আমি বারবার বলি, পড়াশোনায় মন দাও। কিন্তু প্রফুল কথা শোনেনি। পরে অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করার পর ভেবেছিলাম, ক্লান্ত হলে সব বন্ধ করে দেবে। কিন্তু ও কখনও ক্লান্ত হয়নি। মাঠ হল ওর দ্বিতীয় বাড়ি। সারাদিন মাঠে কাটিয়ে দিতে পারে ও।"
নাগপুরের শিমবাগ জিমখানা থেকে সফর শুরু। বাবা এরপর সমর্থন জুগিয়ে এসেছেন। কিন্তু প্রফুলকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন। অনুশীলনে ছেড়ে দিয়ে বলতেন, "এবার নিজে বুঝে নাও। আমাকে অফিস যেতে হবে।" কখনও ছেলের খেলাও দেখেননি। স্কুলের শিক্ষকরা প্রায়ই বকাঝকা করতেন। বাবাকে ডেকে বলতেন, ক্রিকেটের প্রতি এই পাগলামির 'সর্বনাশা' দিক কী কী আছে। তবে প্রফুলের স্বপ্নে কখনও বাধা পড়তে দেয়নি তাঁর পরিবার।
অনূর্ধ্ব-১৯ বিভাগে খেলার সময়ই অনেকের নজরে পড়েন প্রফুল। চলে আসেন এমআরএফ পেস ফাউন্ডেশনে। কোভিডের সময় সেখানে পড়ে থেকে বোলিংয়ের খুঁটিনাটি শুধরেছেন। বছর তিনেক আগে বিরাট চোটে কেরিয়ার প্রায় শেষ হয়ে যেতে পারত। বিদর্ভের হয়ে সারা বছর দারুণ খেলার পরও ফাইনাল দেখতে হয় ঘরে বসে। গুমরে কাঁদতেন। তাহলে কি ক্রিকেটের স্বপ্ন শেষ? সেই সময় এগিয়ে আসেন বরুণ অ্যারন ও গ্লেন ম্যাকগ্রাথ। কঠিন সময়ে বরুণ পাশে দাঁড়ান। তাঁর নিজের কেরিয়ারও বারবার চোটের জন্য বিপাকে পড়েছে। ঘটনাচক্রে বরুণ এখন সানরাইজার্সের বোলিং কোচ। এরপর ম্যাকগ্রাথ প্রফুলকে নিয়ে যান ব্রিসবেনে। তার জন্য একটা পয়সাও খরচ করতে হয়নি। তাঁর লাইন-লেংথে খুশি হন অজি কিংবদন্তি। তারপর রনজি, বিদর্ভ প্রিমিয়ার লিগ হয়ে আইপিএল।
ক্রিকেট খুব খরচসাপেক্ষ খেলা। তাই আমি বারবার বলি, পড়াশোনাও মন দাও। কিন্তু প্রফুল কথা শোনেনি। পরে অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করার পর ভেবেছিলাম, ক্লান্ত হলে সব বন্ধ করে দেবে। কিন্তু ও কখনও ক্লান্ত হয়নি। মাঠ হল ওর দ্বিতীয় বাড়ি। সারাদিন মাঠে কাটিয়ে দিতে পারে।
শুধু লাইন-লেংথ নয়। কিংবা ১৪৪-১৪৫ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টার গতি নয়। প্রফুলর আরেকটি অস্ত্র আছে। সেটা হল আত্মবিশ্বাস। পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে অভিষেক হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি। সেখানে একেবারে বৈভবের মুখে। যে কি না জশপ্রীত বুমরাহ বা জশ হ্যাজেলউডকেও ভয় পায় না। কিন্তু প্রফুল আগেই বলে রেখেছিল, "আমি ওকে প্রথমেই বাউন্সার দিয়ে আউট করব। ওকে যেভাবেই হোক প্রথম বলে আউট করতে হবে।" তাহলে কি বৈভবের 'ওষুধ'ও আবিষ্কার করে ফেলল প্রফুল?
