shono
Advertisement
Rammohan Roy

রামমোহন, বাঙালি বিদ্বৎসমাজ ও ভিটে সম্বাদ

‘ভারতপথিক’ রামমোহনেরও দ্বিশতবর্ষের একটি ঘটনা উল্লেখ করা জরুরি, তাহলেই এ সিদ্ধান্তের যথার্থতা উপলব্ধি করা সম্ভব হবে।
Published By: Kishore GhoshPosted: 07:06 PM May 26, 2026Updated: 07:13 PM May 26, 2026

১৮১৪ সালে রাজা রামমোহন রায় দু’টি বাড়ি কিনেছিলেন। প্রথমটি চৌরঙ্গি-স্থিত একটি দোতলা বাড়ি, ২০,৩১৭ টাকায়। দ্বিতীয়টি মানিকতলায়, ১৩ হাজার টাকায়। ১৮৩০ সাল পর্যন্ত এসব বাড়িতে তিনি বাস করেছিলেন। ১৯৭২ সালে, রামমোহন রায়ের দ্বিশততম জন্মবার্ষিকীতে, এই দু’টি বাড়ির পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু হয়। সৌজন্যে, তৎকালের বাঙালি বিদ্বৎসমাজ। ২২ মে ছিল রামমোহনের জন্মদিন। লিখছেন অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

Advertisement

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে বাঙালি যতখানি নিষ্ঠুর হয়েছে, মনে হয় রামমোহন সেদিক থেকে বেশ কিছুটা রক্ষা পেয়েছেন। সম্ভবত রামমোহনের বিলাত যাত্রাই এক্ষেত্রে তাঁর বাঙালি-জন্মের শাপে কিছুটা বর হয়েছিল। কেন বলছি এ-কথা?

কিংবদন্তি লর্ড অ্যাকটনের (১৮৩৪-১৯০২) ছিল প্রায় ৬০ হাজার বইয়ের একটি ব্যক্তিগত সংগ্রহ, ১৮৯০-এর দশকে আর্থিক সংকটের কারণে যেটিকে রক্ষা করা তাঁর পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছিল। তখন বিশিষ্ট গ্রন্থ পৃষ্ঠপোষক অ্যান্ড্রিউ কার্নেগি লাইব্রেরিটি কিনে নিয়েছিলেন। কার্নেগির অভিপ্রায় ছিল– এটিকে অক্ষত অবস্থায় রক্ষা করা। লর্ড অ্যাকটন মৃত্যুর আগে
পর্যন্ত এই লাইব্রেরি ব্যবহার করার অধিকার পেয়েছিলেন। পরে, কার্নেগি একটি বিশেষ শর্তে জন মর্লিকে এই পুস্তক-সংগ্রহ উপহার দিয়েছিলেন। শর্ত ছিল যে, এটিকে ইংল্যান্ডের কোনও প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করতে হবে। অ্যাকটনের সঙ্গে কেমব্রিজের দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক থাকায় মর্লি শেষ পর্যন্ত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়কেই বেছে নিয়েছিলেন। এখনও গুগ্‌ল সার্চ করলে ওই অংশের ক্যাটালগ পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে বসে দেখা সম্ভব।

অথচ এ-দেশে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে কী হয়েছিল? বিদ্যাসাগরের পুস্তক-সংগ্রহও ছিল ঈর্ষণীয়। তিনি রীতিমতো বই সম্পর্কে যত্নবান ছিলেন। একবার কেউ তাঁর উচ্চমূল্যে বই বাঁধানো নিয়ে কটাক্ষ করলে তিনি বলেছিলেন, ঘড়ির যেমন দড়ি দিয়ে ঝোলালে মর্যাদা-ক্ষয় হয়, সেটির জন্য সোনার চেনই উপযুক্ত, তেমনই সে-কথা বইপত্রের বেলাতেও খাটে। এইরকম বইপ্রেমী ঈশ্বরচন্দ্র যখন বিস্তর ঋণ রেখে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন, তখন তিনি একজনও কার্নেগি পাননি, তাঁর লাইব্রেরি চিরতরে হারিয়ে গিয়েছে। যদিও ধনী বাঙালির সংখ্যাল্পতা আদৌ ছিল না, আদতে ছিল বিদ্যাসাগরের প্রতি উপেক্ষা। সেটারই প্রতিফলন আমরা ২০১৯ সালেও দেখতে পাই, যখন দ্বিশতবর্ষে তাঁর মূর্তিটি ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়।

‘ভারতপথিক’ রামমোহনেরও দ্বিশতবর্ষের একটি ঘটনা উল্লেখ করা জরুরি, তাহলেই এ সিদ্ধান্তের যথার্থতা উপলব্ধি করা সম্ভব হবে। ১৯৭২ সাল মে মাস, সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের মন্ত্রিসভার দু’-মাস সবে পূর্ণ হয়েছে। বলা হচ্ছে– ‘রে-মিনিস্ট্রি ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল মিন্‌স বিজনেস’। এমন এক সময় রাজা রামমোহন রায়ের দু’টি বাড়ি দখলমুক্ত করে উদ্ধারের জন্য আন্দোলনের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হচ্ছে। ১৮১৬ সাল থেকে রামমোহন পাকাপাকিভাবে কলকাতাবাসী হয়েছিলেন। ১৮১৪ সালে যখন ইংরেজ কালেকটর ডিগবি সাহেব রংপুর ত্যাগ করেছিলেন, রামমোহনও তখন তাঁর সঙ্গেই ফিরে এসেছিলেন। সুতরাং কলকাতায় তাঁর বাড়ির প্রয়োজন হয়েছিল। সেই মোতাবেক ১৮১৪ সালেই তিনি দু’টি বাড়ি কিনেছিলেন।

প্রথমটি চৌরঙ্গি-স্থিত একটি দোতলা বাড়ি। এই বাড়িটি তিনি এলিজাবেথ ফেনউইক নাম্নী এক মেমের কাছ থেকে ২০,৩১৭ টাকায় কিনেছিলেন। আর দ্বিতীয় বাড়িটি মানিকতলায় অবস্থিত ছিল, যেটা ১৩ হাজার টাকায় ফ্রান্সিস মেন্ডেস নামের একজন সাহেবের কাছ থেকে কেনা হয়েছিল। রামমোহন এই সময়ই জোড়াসাঁকোর বাড়ি বিক্রিও করেছিলেন। ১৮৩০ সাল পর্যন্ত এসব বাড়িতে তিনি বাস করেছিলেন।

১৯৭২ সালে, তাঁর দ্বিশততম জন্মদিন পালন করার সময়, সকালে সাহিত্যতীর্থ, বিকালে কবিতীর্থ ও সন্ধ্যায় ব্রাহ্ম সমাজের আয়োজিত অনুষ্ঠানের তিনটিতেই বাড়ি দু’টি সম্বন্ধে বিশেষ দাবি তোলা হয়েছিল। কারণ আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িটি, যে-রাস্তার নাম ‘রামমোহন সরণি’, সেটা সে-সময় লোহার কারবারিরা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে দখল করে ফেলেছিল। অন্যদিকে, মানিকতলার বাড়িতে তখন ছিল, এখনও আছে, কলকাতা পুলিশের ডিসি নর্থের হেড কোয়ার্টার। ব্রাহ্ম সমাজের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি দক্ষিণারঞ্জন বসু এ বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছিলেন। প্রফুল্লচন্দ্র সেন সমর্থন করেছিলেন। ১১৩ নম্বর আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় রোডের বাড়ির একটি অংশেই সমাবেশ হয়েছিল। ড. রমা চৌধুরী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, জ্যোতির্ময়ী দেবী, ডাক্তার কালীকিংকর সেনগুপ্ত, মন্মথ রায়, বিচারক জ্যোৎস্নানাথ মল্লিক, গৌরকিশোর ঘোষ, বিচারক সমরেন্দ্র নারায়ণ বাগচী ও দক্ষিণারঞ্জন বসু প্রমুখ প্রত্যেকেই শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে এই দাবি উত্থাপিত করেছিলেন। ‘বনফুল’ স্বরচিত একটি দীর্ঘ কবিতা পাঠও করেছিলেন।

বিদ্যাসাগরের তুলনায় অন্তত রামমোহনের বিষয়ে বাঙালি ক্রুরতা তুলনায় অনেক কম দেখিয়েছে, তবে একদম দেখায়নি সেটা নয়। হুগলি জেলার রাধানগরে অবস্থিত ‘রাধানগর রামমোহন মেমোরিয়াল হল’। এটিই রামমোহনের পৈতৃক বাড়ি।

দক্ষিণারঞ্জন বসুর স্পষ্ট দাবি ছিল যে, পুলিশের হেড কোয়ার্টার অন্যত্র, প্রয়োজনে আরও বড় আরও ভাল জায়গায়, স্থানান্তরিত করা হোক এবং সেটা এই দ্বিশতবর্ষ পেরিয়ে যাওয়ার আগেই ঘটুক। বরং এই বাড়িটিকে ‘আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র’ হিসাবে ঘোষণা করা হোক। এছাড়া মহিলা সদন ও মহিলা শিল্পনিকেতন গড়ার দাবিও তিনি তুলেছিলেন।

আমহার্স্ট স্ট্রিটের যে-বাড়িটি ‘সিমলা হাউস’ নামে পরিচিত, যেটা উড সাহেব ডিজাইন করেছিলেন, রামমোহন ১৮৩০ সালে বিলাতযাত্রার খরচপত্র তোলার সময়ে অন্য সব সম্পত্তি বিক্রি করে দিলেও এই বাড়ি ১৯৬০ সাল অবধি তাঁর বংশধরদের দখলেই ছিল। তারপরে বেহাত হয়ে যায় ও দুর্বৃত্তরা সেটার দখল নেয়। সৌভাগ্যবশে ১৯৭২ সালেই এই বাড়ি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু হয়। শেষমেশ ১৯৮৬ সালে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের যৌথ প্রচেষ্টায় বাড়িটি সম্পূর্ণ অধিগ্রহণ করা হয়। বর্তমানে এই বাড়িটিই ‘রাজা রামমোহন রায় মেমোরিয়াল মিউজিয়ম’ নামে পরিচিত।

জন অ্যাডাম সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বিলোপ করে আদেশনামা জারি করেছিলেন। প্রতিবাদে রামমোহন ‘মিরাৎ’-এ স্বৈরাচারী সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন।

অন্যদিকে ১৫ বিঘা জায়গায় উপর অবস্থিত আপার সার্কুলার রোডের বাড়িটি ১৮৩০ সালেই রামমোহন টুলো এবং কোম্পানির মাধ্যমে নিলামে তুলেছিলেন। ১৮৭৪ সালে সুকিয়া স্ট্রিট থানা স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে পুলিশের সঙ্গে এই বাড়ির সংযোগ শুরু হয়েছিল। ১৯১৮ সালে ১৫,৯০৯ টাকায় অধিগ্রহণের পরে থেকে নয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এটি পুলিশের অফিস ও কোয়ার্টার হিসাবে ছিল। অবশেষে ১৯৯৬ সালে ‘কলকাতা পুলিশের জাদুঘর’ রূপে এর একটি অংশ উদ্বোধন করা হয়। এখানেই নেতাজি সংক্রান্ত ৬৪টি ফাইল রাখা।

সুতরাং এ-কথা বলা অন্যায় হবে না যে, বিদ্যাসাগরের তুলনায় অন্তত রামমোহনের বিষয়ে বাঙালি ক্রুরতা তুলনায় অনেক কম দেখিয়েছে, তবে একদম দেখায়নি সেটা নয়। হুগলি জেলার রাধানগরে অবস্থিত ‘রাধানগর রামমোহন মেমোরিয়াল হল’। এটিই রামমোহনের পৈতৃক বাড়ি। রামমোহনের স্মৃতিবিজড়িত বাসগৃহ, লাইব্রেরি, কাছারি বাড়িকে ‘হেরিটেজ’ ঘোষণা করা হয়েছে, ফলকও বসেছে ঠিক, কিন্তু এর বেশি উদ্যোগ কিছু নেওয়া হয়নি। দক্ষিণারঞ্জন বসু সেদিন প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘আমরা কি রামমোহনকে নিয়ে গৌরব করার অধিকার হারিয়ে ফেলিনি?’

সম্প্রতি, সরকারি কর্মচারীদের সংবাদপত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি পুরনো আইনকে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হল। রামমোহন নিজে সরকারি কর্মচারী ছিলেন। অবসরের পরে তিনি বাংলা ভাষায় ‘সম্বাদ কৌমুদী’ (১৮২১) ও ফারসিতে ‘মিরাৎ-উল-আখবার’ (১৮২২) প্রকাশ করেছিলেন। হেস্টিংসের পরে ১৮২৩ সালে জন অ্যাডাম যখন বাংলার অস্থায়ী গভর্নর নিযুক্ত হন তখন জেমস সিল্ক বাকিংহামের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘ক্যালকাটা জার্নাল’ সরকারের কাজের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেছিল। ফলস্বরূপ সরকারের তরফে ওই কাগজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, একইসঙ্গে সম্পাদককে দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল। জন অ্যাডাম সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বিলোপ করে আদেশনামা জারি করেছিলেন। প্রতিবাদে রামমোহন ‘মিরাৎ’-এ স্বৈরাচারী সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন।

শুধু তা-ই নয়, তিনি সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিলেন ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাহরণের
যে-আদেশনামা, সেটির বিলোপ চেয়েছিলেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই আবেদন উপেক্ষা করলে গভর্নর জেনারেল সেই আদেশটিকে আইনে পরিণত করেন। রামমোহন এবার সুপ্রিম কোর্টের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে উপবিষ্ট চতুর্থ জর্জের কাছে আপিল করেছিলেন। আপিলটি স্বয়ং বাকিংহাম পার্লামেন্টে পৌঁছে দিয়েছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটিও না-মঞ্জুর হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে তীব্র প্রতিবাদ হিসাবে রামমোহন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘মিরাৎ’ কাগজটি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। রামমোহনের যথার্থ ‘উত্তরাধিকারী’ যদি বাঙালি হত– তাহলে দীর্ঘ কংগ্রেস, বাম ও তৃণমূল জমানার পরেও কেন কণ্ঠরোধকারী আইনগুলি বাতিল করা হল না? উপরন্তু সেগুলিকে আরও ধারালো করার প্রস্তুতি নেওয়া হল? এ-ই কি তাঁর উত্তরাধিকার?

সূত্রনির্দেশ
১. যুগান্তর সংবাদপত্র, ব্রিটিশ লাইব্রেরি
২. ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সংবাদপত্রে সেকালের কথা,
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ মন্দির

(মতামত নিজস্ব)
লেখক শিক্ষক
rana.ardh1024@gmail.com

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement