ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতা মানেই নগরজীবনের নিঃসঙ্গতা, মগ্ন বিষণ্ণতা, আর আশ্চর্য এক জাদুভাষার উড়াল। সময় পেরিয়েও তঁার কবিতা এখনও সমান প্রাসঙ্গিক, সমান উচ্চারিত। আজ তাঁর মৃত্যুদিনে ‘আকাশ অংশত মেঘলা থাকুক’।
কেন এই দৌড়ে যাওয়া? আমার ভালো লাগে না/ শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব।
ভাস্কর চক্রবর্তীর (১৯৪৫-২০০৫) বিখ্যাত কবিতা ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’-র অংশবিশেষ এটি। এই নামে বইটি সাতের দশকে (১৯৭১ সালে) প্রকাশিত হয়েছিল। বলা বাহুল্য কবিতা-সহ সমগ্র বইটি পাঠককে এমনই বিমোহিত করে যে, কবিতাটির জন্মের ছয় দশক পরে এখনও মুখে মুখে ফেরে তা। শীতের মধ্যে বিষণ্ণতার যে-বোধ লুকিয়ে রয়েছে, সেই বিষাদের কথা লেগে আছে কবিতাটির ছত্রে ছত্রে। অবসাদ, আত্মমগ্নতা, একাকিত্ব তঁার কবিতার অমোঘ বৈশিষ্ট্য।
ভাস্কর চক্রবর্তীর ‘চৌ-রাস্তায় দঁাড়িয়ে আমরা চারজন’ কবিতাটি বলছে– “‘এদিকে স্বর্গের পথ’– বলে একচক্ষু নারী হঠাৎ হারিয়ে গেল–/ চৌ-রাস্তায় দঁাড়িয়ে আমরা চারজন হেসে উঠলাম– এ-ওর মুখের/ দিকে, তাকিয়ে আমরা হেসে উঠলাম/ যেন স্বর্গে যাবো বলে/ সেই ভোরবেলা– অদ্ভুত ছাতা হাতে আমরা বেরিয়েছি, পায়ে/ আশ্চর্য চপ্পল’। আশ্চর্য এক চিত্রকল্পের কুয়াশায় আমরা হারিয়ে যাই যেন। ‘আমাদের স্বর্গ নেই, স্যারিডন আছে’– কবিতার আপাতস্মার্ট পঙ্ক্তিটিও পাঠককে তীব্রভাবে আকৃষ্ট করেছে। এখনও মুখে মুখে ফেরে। এই কবিতায় নিঃসঙ্গতা, আধুনিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা, শারীরিক যন্ত্রণাকে তুলে ধরেছেন তিনি। ‘স্যারিডন’ এখানে ‘ওষুধ’ না– বরং জীবনের একঘেয়েমি ও ব্যর্থতার প্রতীক, যা স্বর্গীয় কল্পনার চেয়েও বেশি বাস্তব।
ভাস্কর চক্রবর্তীর (১৯৪৫-২০০৫) বিখ্যাত কবিতা ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’-র অংশবিশেষ এটি। এই নামে বইটি সাতের দশকে (১৯৭১ সালে) প্রকাশিত হয়েছিল। বলা বাহুল্য কবিতা-সহ সমগ্র বইটি পাঠককে এমনই বিমোহিত করে যে, কবিতাটির জন্মের ছয় দশক পরে এখনও মুখে মুখে ফেরে তা।
সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা কবি ভাস্কর চক্রবর্তী আপন কবিতা প্রসঙ্গে লেখা ‘নিজস্বমাদল’ প্রবন্ধে বলছেন– ‘কবিতা লেখার প্রথম থেকেই ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হতো যে-কোনো লাইন থেকেই একটা কবিতা শুরু হতে পারে, আর যে-কোনো লাইনেই শেষ হয়ে যেতে পারে সেই কবিতা। কবিতা হবে আপাত সরল। হাজারমুখো। বিষয়ের কোনো বাছবিচার থাকবে না। আর কবিতার একটা লাইন থেকে আরেক লাইনের দূরত্ব হবে কয়েকশ কিলোমিটারের। কিন্তু অদৃশ্য একটা তলদেশে থাকবে মিলিমিটারের নিবিড় সম্পর্ক।’
যখন ট্রাম-ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে আন্দোলন, বা খাদ্য আন্দোলনে উত্তাল সারা দেশ, সেই প্রভাব পড়েছিল সমকালীন তরুণ কবিদের মধ্যে। সেই সময় দু’-একটি সাহিত্য আন্দোলনও হয়। তার মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ‘হাংরি আন্দোলন’ ও ‘শ্রুতি আন্দোলন’। এ দুয়েরই মিলিত অভীষ্ট ছিল কবিতায় নাগরিক কণ্ঠস্বরের চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা। সব মিলিয়ে কবিতায় নগর-যন্ত্রণার ভাব জমছিল অনেক, কিন্তু ভাষাটা ঠিক ফুটছিল না। ছয়ের দশকের কবিদের লেখায় হঠাৎ শোনা গেল আশ্চর্য সব উচ্চারণ। সেই সময় আমরা পাই ভাস্কর চক্রবর্তীর কলমে অদ্ভুত সব লাইন।
কবিতায় নিঃসঙ্গতা, আধুনিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা, শারীরিক যন্ত্রণাকে তুলে ধরেছেন তিনি। ‘স্যারিডন’ এখানে ‘ওষুধ’ না– বরং জীবনের একঘেয়েমি ও ব্যর্থতার প্রতীক, যা স্বর্গীয় কল্পনার চেয়েও বেশি বাস্তব।
তঁার প্রথম দিকের কবিতা থেকে শুরু করে শেষ কাব্যগ্রন্থ অবধি নাগরিক জীবনবোধের প্রকাশ যথাযথ ফুটে উঠেছে। ‘আমাদের নাটক’ কবিতায় লিখেছেন– ‘রান্নাঘরের দরজা থেকে আমাদের নাটকের শুরু। নাটকের/ প্রধান প্রধান চরিত্ররা, যথাক্রমে– খিদে,/ বুকে-ব্যথা, নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা, ভয়, দুশ্চিস্তা ইত্যাদি ইত্যাদি।...’ তিনি লিখেছেন মধ্যবিত্ত মানুষের নৈঃসঙ্গ্য, বিষাদ ও শূন্যতাবোধের অমোঘ ও অকাট্য সব পঙ্ক্তি। সেই কবিতা একদিকে যেমন মধ্যবিত্তর কান্না, স্তব্ধতা ও দীর্ঘশ্বাসের অবিকল ধ্বনিচিত্র; অন্যদিকে নগরজীবনের ক্লেদ, গ্লানি ও হতাশার বিরুদ্ধে এক ক্ষুব্ধ কবি হৃদয়ের নিরন্তর প্রকাশ।
ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতায় শহর কলকাতা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোটিফ। শ্যামবাজার, ভবানীপুর, বরানগর, বি. টি. রোড এসব স্থানের নামও কবিতায় অনেক অংশ জুড়ে। কবি লিখেছেন– ‘আমার সেই ভালোবাসার শহরের ভেতর দিয়ে, এক সুগন্ধের ভেতর দিয়ে, আমি এখন বাড়ি ফিরছি। কলেজ স্ট্রিট থেকে শ্যামবাজারের দিকে একা একাই হেঁটে চলেছি আমি।’ মহানগরী কলকাতার সঙ্গে ভাস্করের সম্পর্ক যেন ছিল প্রেমিকার মতো– অভিমান, রাগ, আবার ভালবাসারও। তিনি লিখলেন– ‘কলকাতা এবার ঠিক আমাকেই ভুলে যাবে/ ভাবি তবু সুপ্রভাত কাছে ডাকবে– পুরুলিয়া বলবে চলে এসো।’ কখনও লিখেছেন– ‘সারা বছর কলকাতার প্রত্যেকটা গলি, কানাগলি ঘুরে বেড়িয়েছি আমি।’ আবার কখনও লিখেছেন–‘তোমাদের কথা, দেয়ালে-দেয়ালে লিখে রাখতে ইচ্ছে করে কলকাতায়।’ এ শহরে ট্রাম, কুয়াশা-ঘেরা ময়দান কবিকে নিয়ে যায় শহর সম্পর্কে অন্য আবেশে, অন্য এক বোধে। তিনি লিখেছেন– ‘সকালবেলার ট্রাম, তুমি কতখানি পারো নিয়ে যেতে/ আমাকে এখন?...’ সারি সারি গাছের মধ্যে দিয়ে ট্রাম চলার ছবিটি অক্ষত, অম্লান।
তঁার প্রথম দিকের কবিতা থেকে শুরু করে শেষ কাব্যগ্রন্থ অবধি নাগরিক জীবনবোধের প্রকাশ যথাযথ ফুটে উঠেছে। ‘আমাদের নাটক’ কবিতায় লিখেছেন– ‘রান্নাঘরের দরজা থেকে আমাদের নাটকের শুরু। নাটকের/ প্রধান প্রধান চরিত্ররা, যথাক্রমে– খিদে,/ বুকে-ব্যথা, নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা, ভয়, দুশ্চিস্তা ইত্যাদি ইত্যাদি।...’
সাতের দশকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল ক্রমউত্তাল, সেই সময় নকশালবাড়ির রাজনৈতিক অভ্যুত্থান, বিপ্লবী আন্দোলন ও প্রতিবিপ্লবী সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, পূর্ববঙ্গের মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা, অতঃপর দেশ জুড়ে ‘জরুরি অবস্থা’-র স্বৈরাচার– অনিবার্যত বেঁধে দিয়েছিল জীবন ও শিল্পের ধ্রুবপদ। সাতের দশকের রাজনৈতিক কবিতালেখকদের অনেকেরই সেই সুযোগ বা অভিজ্ঞতা হয়েছিল। অনেকের কাছেই কবিতা হয়ে উঠেছিল সংগ্রামী রাজনৈতিক কার্যক্রমের হাতিয়ার, রাষ্ট্রবিরোধী জনযুদ্ধে শামিল হওয়ার আহ্বান। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ সে-অর্থে শিক্ষিত নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ ছিলেন না, ছিলেন কৃষক বা শ্রমিক পরিবারের সন্তান। কবিতা এঁদের কাছে ঠিক সুচারু শিল্পচর্চার বিষয় ছিল না। রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন তঁারা। সাতের দশকের রাজনীতির আগ্নেয় আবেগ অনেক স্বপ্নদর্শী যুবককে কবিতায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। শহর, শহরতলি আর জেলখানার দেওয়ালে লেখা হচ্ছিল সমসময়ের কথা-কাহিনি। সমষ্টির উচ্চকিত উচ্চারণ থেকে সম্যক দূরত্বে ব্যক্তির আবেগ-অনুভব, সংশয়-উদ্বেগ, অভিমানের আঙ্গিকসচেতন অনুচ্চকিত কবিতার চর্চা অনেক শক্তিশালী কবিপ্রতিভার জন্ম দিয়েছিল সাতের দশকে। সেই সময় ভাস্কর চক্রবর্তীর এক-একটি কবিতা পড়ে আমরা চমকে উঠেছি। প্রচণ্ড চমকে দেওয়া সব পঙ্ক্তি!
তঁার কাব্যগ্রন্থের নামগুলিও তুমুল খ্যাত। ‘এসো, সুসংবাদ এসো’, বা ‘আকাশ অংশত মেঘলা থাকবে’ কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছে। ‘এসো, সুসংবাদ এসো’ বইয়ের অধিকাংশ কবিতাই গদ্যে লেখা। সাবলীল, স্মার্ট ও জীবন্ত শব্দজালে রচিত যাপনের কথাচিত্র। ‘রাস্তায় আবার’ কাব্যগ্রন্থটির কবিতাগুলিকে ছুঁয়ে আছে কবির দুশ্চিন্তা, বিষণ্ণতা। সব লেখার ভিতরেই মৃত্যুর ছায়া তিনি দেখতে পান, কিন্তু বলেন– ‘আজো, আমি/ বেঁচে থাকতে চাই...’। ‘আকাশ অংশত মেঘলা’ কাব্যগ্রন্থে জীবনের জলছবি নির্মাণ করেন কবি– ‘এই পোড়া/ সময়ে শহরে/ ডিঙি নৌকার মতো আমি শুধু/ একটা বিপদ থেকে/ অন্য আরো বিপদে ভেসেছি।’ অস্থির সময়ে কবি বিপদে ভেসে যাওয়ার ছবি অঁাকেন। অশ্রুবিহীন, ভবিষ্যৎহীন এক নীল মশারিতে কলের পুতুলের মতো নিরুপায় ঢুকে পড়েন। এপিটাফ লেখেন– ‘দুই দীর্ঘশ্বাসের মধ্যিখানে, মৃত্যু, আমি তোমাকে জন্মাতে দেখেছি’।
(মতামত নিজস্ব)
