shono
Advertisement
Electric Car

বৈদ্যুতিক গাড়ি: পুরনো গল্প-নতুন গল্প

১৯৪০ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। কেন? উত্থান কোন পথে?
Published By: Biswadip DeyPosted: 04:31 PM Jun 04, 2026Updated: 04:31 PM Jun 04, 2026

‘ফাডা’-র পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষে এ-দেশে বিক্রি হওয়া মোট দু’-চাকার গাড়ির ৬.৫৪ শতাংশই ছিল বৈদ্যুতিক। যাত্রীবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক গাড়ির অংশীদারিত্ব বেড়ে হয়েছে ৪.২৫ শতাংশ, মোট বাণিজ্যিক গাড়ির ১.৮৩ শতাংশ বৈদ্যুতিক। অথচ, ১৯৪০ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। কেন? উত্থান কোন পথে? লিখছেন অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়।

Advertisement

১৯১৫ থেকে ১৯২৪ সালের মধ্যে চারজন বন্ধু এক অভিনব প্রথার সূচনা করেছিলেন। নিজেদের নাম দিয়েছিলেন ‘চার ভবঘুরে’। শহরের কোলাহল ছেড়ে প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতি গ্রীষ্মে তঁারা দীর্ঘ মোটরভ্রমণে বেরিয়ে পড়তেন, যেটাকে এখন বলা হয় ‘লং ড্রাইভ’। এই যে চারজন বন্ধু, এঁদের পরিচয় কী? এঁরা হলেন টমাস আলভা এডিসন, হেনরি ফোর্ড, জন বারোস এবং হার্ভে ফায়ারস্টোন। একজন বৈদ্যুতিক আলোর বাল্‌ব, গ্রামোফোন এবং মোশন পিকচার ক্যামেরার আবিষ্কারক, একজন মোটরগাড়ি শিল্পপতি, একজন প্রকৃতিবিদ লেখক এবং অন্তিমজন টায়ার নির্মাতা। আর, এইখানেই লুকিয়ে আছে ইতিহাসের এক রোমাঞ্চকর কাহিনি, যাত্রাপথের আখ্যান।

এখন জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ, জীবাশ্ম জ্বালানির সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি আমদানির ক্রমবর্ধমান ব্যয় ইত্যাদি বিবিধ কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। এতটাই বাধ্যতা যে, ভারতের ‘অটোমোবাইল ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন’ সমূহের ফেডারেশন বা ‘ফাডা’-র পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষে দেশে বিক্রি হওয়া মোট দু’-চাকার গাড়ির ৬.৫৪ শতাংশই ছিল বৈদ্যুতিক। যাত্রীবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক গাড়ির অংশীদারিত্ব বেড়ে হয়েছে ৪.২৫ শতাংশ, এবং মোট বাণিজ্যিক গাড়ির ১.৮৩ শতাংশ ছিল বৈদ্যুতিক। ওই অর্থবর্ষে দেশে মোট ২৪.৫২ লক্ষ বৈদ্যুতিক যানবাহন বিক্রি হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চ মাসে বৈদ্যুতিক দুই চাকা ও তিন চাকার গাড়ির বাজার অংশীদারি ৩ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। যাত্রীবাহী বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে যেখানে এই অংশীদারি ছিল ৩.৪৮ শতাংশ, মার্চে তা বেড়ে দঁাড়ায় ৫.১১ শতাংশে। অথচ এর শুরুটা হয়েছিল প্রায় ১৫০ বছর আগে।

১৮৮৯ নাগাদ এডিসন একটি পরীক্ষামূলক বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণও করেছিলেন। তিন চাকার সেই গাড়িতে দু’টি বৈদ্যুতিক মোটর ছিল। তঁাদের ধারণা ছিল, উন্নত ব্যাটারি তৈরি করা গেলে বৈদ্যুতিক গাড়ি আমেরিকার প্রধান পরিবহণ ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে।

এডিসন ও ফোর্ডের সম্পর্ক ছিল এক ধরনের ‘গুরু-শিষ্য’ সম্পর্ক, যা পরে গভীর ব্যক্তিগত বন্ধুত্বে পরিণত হয়েছিল। ১৮৯১ সালে হেনরি ফোর্ড আমেরিকার মিশিগানের ডেট্রয়েটে টমাস এডিসন প্রতিষ্ঠিত এডিসন ইলুমিনেটিং কোম্পানিতে চাকরি নিয়েছিলেন। অবশ্য ১৮৯৬ সালে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে একটি সভায় তঁাদের প্রথম দেখা হয়। সেই সময় ফোর্ড নিজের তৈরি গ্যাসোলিন-চালিত গাড়ি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন। এক নৈশভোজে তিনি এডিসন-কে নিজের পরিকল্পনা খুলে বললে, এডিসন খুবই উৎসাহিত হন। আর, তারপর এই ঘটনা গড়াতে গড়াতে পৌঁছে যায় আর-একটা ইতিহাসের কিনারে, যদিও ব্যর্থ, তবুও গায়ে কঁাটা দেয়।
এডিসন ও হেনরি ফোর্ড এক সময়ে সস্তা বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন। এমনকী, ১৮৮৯ নাগাদ এডিসন একটি পরীক্ষামূলক বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণও করেছিলেন। তিন চাকার সেই গাড়িতে দু’টি বৈদ্যুতিক মোটর ছিল। তঁাদের ধারণা ছিল, উন্নত ব্যাটারি তৈরি করা গেলে বৈদ্যুতিক গাড়ি আমেরিকার প্রধান পরিবহণ ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে।

কারণ, তখনকার সীসা-অম্ল ব্যাটারি ভারী ছিল, দ্রুত নষ্ট হয়ে যেত আর দূরপাল্লার জন্য উপযুক্ত ছিল না। এই কারণে এডিসন নতুন ধরনের নিকেল-লোহা ব্যাটারি তৈরি করতে শুরু করেন। ১৯০১ সালে তিনি এডিসন স্টোরেজ ব্যাটারি কোম্পানি শুরু করেন। তঁার লক্ষ্য ছিল দীর্ঘস্থায়ী, হালকা এবং দ্রুত চার্জ হওয়া ব্যাটারি তৈরি করা, বিশেষত বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য।
১৯০৫ সালে তিনি আবার নিজের তৈরি গাড়িটি নিকেল-লোহা ব্যাটারি পরীক্ষা করার জন্য ব্যবহারও করেছিলেন। ফোর্ড বছর দশেকের মধ্যেই প্রায় ১৫ লক্ষ ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু ঘটনা হল সেই পরীক্ষা সফল হয়নি। তবে যেটা ‘জরুরি বিষয়’ সেটা হল তঁারা তখনই জানতেন যে, বিদ্যুৎ-ই ভবিষ্যৎ।

ভারতের ‘অটোমোবাইল ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন’ সমূহের ফেডারেশন বা ‘ফাডা’-র পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষে দেশে বিক্রি হওয়া মোট দু’-চাকার গাড়ির ৬.৫৪ শতাংশই ছিল বৈদ্যুতিক।

নজরটান হল, যে-ফোর্ড মোটর কোম্পানি পরে পেট্রোলচালিত গাড়ির যুগকে সংজ্ঞায়িত করল, সেই হেনরি ফোর্ডের নিজের বাড়ির উঠোনেই বহু বছর ধরে একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি দঁাড়িয়ে ছিল। হেনরি ফোর্ড তঁার স্ত্রী ক্লারা ফোর্ডের জন্য ১৯০৮ সালে নিজের তৈরি মডেলটি না কিনে, একটি ডেট্রয়েট ইলেকট্রিক বৈদ্যুতিক গাড়ি কিনেছিলেন। এমনকী, ১৯০২ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট একটি নজির সৃষ্টি করেছিলেন, কারণ তিনিই প্রথম মার্কিন রাষ্ট্রপতি যিনি জনসমক্ষে বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহার করেছিলেন। আর, এই মডেলটি ছিল কলম্বিয়া কোম্পানির।

যদিও ১৮৮৮ সালে জার্মান উদ্ভাবক আন্দ্রেয়াস ফ্লোকেন নির্মাণ করে ফেলেছিলেন ‘ফ্লোকেন ইলেকট্রোভাগেন’। অনেক ইতিহাসবিদ একে বিশ্বের প্রথম ব্যবহারযোগ্য বৈদ্যুতিক মোটরগাড়ি বলে মনে করেন। তবে ১৮৯৪ সালে বৈদ্যুতিক গাড়ির সূচনা হিসাবে ধরা ঠিক মনে হয়। সেবছর হেনরি জি. মরিস এবং পেদ্রো জি. সালোম নির্মাণ করেন ‘ইলেকট্রোব্যাট’। এটি ছিল বিশ্বের প্রথম বাস্তব ও বাণিজ্যিকভাবে সম্ভাবনাময় বৈদ্যুতিক গাড়িগুলির একটি। মাত্র ৩ বছর পরে, ১৮৯৭ সালে ‘ইলেকট্রোব্যাট’ প্রযুক্তির ভিত্তিতে গড়ে ওঠে ‘ইলেকট্রিক ভেহিকল কোম্পানি’। এই সংস্থা নিউ ইয়র্ক শহরে বৈদ্যুতিক ট্যাক্সি পরিষেবা চালু করে। বিশ্বের প্রথম বৃহৎ বৈদ্যুতিক ট্যাক্সি নেটওয়ার্কগুলির অন্যতম ছিল এই উদ্যোগ।

১৮৯৭ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত সময়কে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রথম স্বর্ণযুগ বলা যায়। ১৮৯৭ সালে কলম্বিয়া অটোমোবাইল কোম্পানি বাজারে আসে এবং দ্রুত অন্যতম বৃহৎ বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের ‘ইলেকট্রিক রানঅ্যাবাউট’ মডেল অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৮৯৯ সালে ক্লিভল্যান্ড-ভিত্তিক বেকার মোটর ভেহিকল কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই গাড়িগুলি ধনী পরিবারগুলির মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং পরবর্তীকালে হোয়াইট হাউসেও ব্যবহৃত হয়। একই বছরে রাইকার ইলেকট্রিক মোটর কোম্পানি বৈদ্যুতিক দৌড়গাড়ি নির্মাণ করে এবং গতির নতুন রেকর্ড স্থাপন করে।

১৯০০ সাল ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ির ইতিহাসে এক বিশেষ মুহূর্ত। সে-সময় আমেরিকার মোট গাড়ির প্রায় ৩৮ শতাংশ ছিল বৈদ্যুতিক, ৪০ শতাংশ ছিল বাষ্পচালিত, এবং মাত্র ২২ শতাংশ ছিল পেট্রোলচালিত। অর্থাৎ পেট্রোলচালিত গাড়ি তখনও বাজারের প্রধান শক্তি ছিল না। কলম্বিয়া, বেকার, রাইকার এবং ইলেকট্রিক ভেহিকল কোম্পানির মতো প্রতিষ্ঠান বৈদ্যুতিক প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। ১৯০২ সালে বেকার তাদের ‘টর্পেডো’ নামের বৈদ্যুতিক দৌড়গাড়ি নির্মাণ করে। পরে ডেট্রয়েট ইলেকট্রিক মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে সফল বৈদ্যুতিক গাড়ি-নির্মাতাদের অন্যতম হয়ে ওঠে। ১৯২০ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত কার্যত ডেট্রয়েট ইলেকট্রিক-ই একমাত্র বড় বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা রূপে টিকে ছিল। তাদের হাজার-হাজার গ্রাহকদের মধ্যে ছিলেন টমাস এডিসন এবং জন ডি. রকফেলার জুনিয়রের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯৩৯ সালে ডেট্রয়েট ইলেকট্রিক উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। ১৯৪০ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।

আর এর কারণ হল মূলত দু’টি। এক) বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রযুক্তি নিয়ে মানুষ আর এগতে চায়নি। দুই) টেক্সাসে পেট্রোলের নতুন উৎস আবিষ্কৃত হওয়া ও পুঁজিপতিদের ব্যাপক বিনিয়োগের দরুন একতরফা জীবাশ্ম-জ্বালানিচালিত গাড়ির বিজ্ঞাপন চালিয়ে যাওয়া। ১৮৯৫ সালে ‘দ্য হর্সলেস এজ’ নামে অটোমোবাইল সংক্রান্ত একটা পত্রিকা প্রকাশিত হত। ‘দ্য হর্সলেস’-এর পুরনো সংখ্যায় বৈদ্যুতিক গাড়ি, বাষ্প গাড়ি ও পেট্রোল গাড়ির বহুতর খবর ছাপা হত। পরিবর্তন যে আসছিল বোঝা গিয়েছিল ১৯০৯ সালে যখন ম্যাগাজিনটির নাম বদলে গেল, হল ‘দ্য অটোমোবাইল’। আর তখন থেকে এরা বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির সীমাবদ্ধতা অর্থাৎ কম রেঞ্জ, ধীর গতি ইত্যাদি দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে সস্তার পেট্রোল গাড়ির লাগাতার প্রচার শুরু করেছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বৈদ্যুতিক গাড়ির এই পতন এবং অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনচালিত গাড়ির উত্থানই জলবায়ু সংক্রান্ত আজকের নতুন বিপদের জন্মদাতা।

কারণ ছয়ের দশকে আমেরিকায় নির্মিত গড়পড়তা পেট্রোল গাড়ির ওজন ইউরোপ ও জাপানের গাড়ির তুলনায় প্রায় তিন-চতুর্থাংশ টন বেশি ছিল। একই সঙ্গে আমেরিকান গাড়িগুলিতে ব্যবহৃত ভি-৮ ইঞ্জিনের আয়তন ইউরোপ ও জাপানে প্রচলিত চার-সিলিন্ডার ইঞ্জিনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি ছিল। এর ফলে এই গাড়িগুলি অনেক বেশি জ্বালানি খরচ করত। ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশ থেকে তেল আমদানি করতে হয়। ১৯৭৩ সালের মধ্যে দেশের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২৭ শতাংশই আমদানি-নির্ভর হয়ে পড়েছিল, যার অধিকাংশ আসত মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ইয়োম কিপুর যুদ্ধে ইরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের প্রতিবাদে ‘ওপেক’ বা তেল রফতানিকারক দেশগুলির সংগঠনের মধ্যপ্রাচ্যভুক্ত সদস্য রাষ্ট্রগুলি আমেরিকায় তেল রফতানি বন্ধ করে দেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। সরবরাহ হঠাৎ কমে যাওয়ায় পেট্রলের মূল্য বৃদ্ধি পায়, জ্বালানি রেশনিং চালু করতে হয় এবং পেট্রোল পাম্পগুলির সামনে দীর্ঘ সারি দেখা দেয়। আস্তে-ধীরে মার্কিন দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

১৯৭৩ সালের তেল সংকট ছিল এমন একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যখন আমেরিকা প্রথম উপলব্ধি করল যে, ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর সমাজের ভিত্তি হিসাবে তেলের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা রাজনৈতিক, আর্থনীতিক এবং কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবুও তাদের উৎপাদিত গাড়ির চরিত্রে বড় কোনও পরিবর্তন দেখা যায়নি। সাতের দশকের শেষভাগেও আমেরিকায় নির্মিত গাড়ির প্রায় ৮০ শতাংশে ভি-৮ ইঞ্জিন ব্যবহৃত হত। অর্থাৎ, বড়, শক্তিশালী এবং অধিক জ্বালানি-খরচকারী গাড়ির প্রতি নির্মাতাদের ঝোঁক অব্যাহত ছিল। এরই মধ্যে ১৯৭৯ সালে বিশ্ব আবারও এক নতুন তেল সংকটের মুখোমুখি হয়। এটিই ইতিহাসে ‘দ্বিতীয় তেল-আঘাত’ নামে পরিচিত। ইরানে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হয় এবং তার পরের বছর শুরু হয় ইরান-ইরাক যুদ্ধ। এই ঘটনাগুলি আন্তর্জাতিক তেল বাজারে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। আর তখন সংশোধনের পরিবর্তে আমেরিকা শুরু করে চক্রান্ত। ‘এক্সনমোবিল’ কোম্পানি জীবাশ্ম-জ্বালানি ও বিশ্ব-উষ্ণায়নের সমস্ত খবর জানার পরেও বিভ্রান্তিরকর প্রচার চালিয়ে যায় ও জীবাশ্ম-জ্বালানির ব্যবহার উৎসাহিত করে। ‘জিসিসি’ তৈরি করে ‘আইপিসিসি’-কে চাপ দিয়ে প্রভাবিত করে। ফল কী দঁাড়াল?

বর্তমানে স্থল, জল ও আকাশপথের সব ধরনের পরিবহণ মিলিয়ে বিশ্বের মোট জীবাশ্ম জ্বালানিজনিত কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণের প্রায় ২৪ শতাংশ আসে পরিবহণ খাত থেকে। এর মধ্যে সড়ক পরিবহণ একাই বৈশ্বিক মোট নিঃসরণের প্রায় ১৭ শতাংশের জন্য দায়ী। অর্থাৎ, পৃথিবীর প্রায় প্রতি ৬ ভাগ কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণের ১ ভাগের উৎস– সড়কে চলাচলকারী যানবাহন। সুতরাং এখন আবার বৈদ্যুতিক যানবাহন, উন্নত গণপরিবহণ এবং বিকল্প জ্বালানির প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ বাড়ছে, কারণ ধ্বংস আসন্ন। ইতিহাসের পরিহাস এই যে, যাকে এক সময় অতীতের পরাজিত প্রযুক্তি বলে মনে করা হয়েছিল, এখন সেই বৈদ্যুতিক গাড়িকেই ভবিষ্যতের পরিবহণের অন্যতম প্রধান পথ রূপে দেখা হচ্ছে। ফলে বৈদ্যুতিক গাড়ির বর্তমান উত্থানকে নতুন কোনও বিপ্লবের সূচনা না বলে, বরং বহু পুরনো এক অসমাপ্ত অধ্যায়ের পুনরারম্ভ বলাই অধিকতর যথাযথ। একেই কী বলে, ‘গোড়া কেটে আগায় জল দেওয়া’!

পুনশ্চ: এটাও নজরটান যে, লিথিয়াম প্রযুক্তির আবিষ্কার এই পুনরুত্থানের সুযোগ করে দিয়েছে, এটাও অনস্বীকার্য।

(মতামত নিজস্ব)

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement
toolbarHome ই পেপার toolbarup মহানগর toolbarvideo শোনো toolbarshorts রোববার