শিক্ষা, উন্নয়ন ও লাদাখের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সোনম ওয়াংচুক নিজেকে ঢেলে দিয়েছেন নিঃস্বার্থভাবে। যে-ব্যক্তি ‘ম্যাগসাইসাই’ পুরস্কারে সম্মানিত, এবং রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে প্রশংসিত হয়েছেন– তিনিই হঠাৎ করে কখনও ‘দেশদ্রোহী’, কখনও আবার ‘সরকারের এজেন্ট’ হয়ে ওঠেন? রাজনৈতিক মতামতে ভিন্ন অবস্থানে থাকার মাশুল গুনছেন কি? লিখছেন রাজদীপ সরদেশাই।
দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বরাবরই বিকশিত হয়েছে। কিন্তু হালে তীব্র মেরুকরণ-আশ্রিত ভারতে এ আর নিছক অলস আড্ডার ঠেকে সীমিত নয়। এখন তা রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত– যেমন প্রতিপক্ষকে অবৈধ প্রতিপন্ন করা, আন্দোলনের বিশ্বাসযোগ্যতায় চিড় ধরানো বা অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া এড়িয়ে যাওয়ার অন্যতম হাতিয়ার।
এই মুহূর্তে সেই ষড়যন্ত্র তত্ত্বের নিশানায় রয়েছেন সোনম ওয়াংচুক এবং ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। রাজধানী দিল্লিতে সারা ফেলে দেওয়া ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সবচেয়ে পরিচিত দুই বলয়। হাজার-হাজার তরুণ কেন ‘নিট’ প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা নিতে দেরি ও ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকা কর্মজগত নিয়ে ক্ষুব্ধ– সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার বদলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে– যেন আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীদের ‘আসল উদ্দেশ্য’ খুঁজতেই তারা বেশি ব্যস্ত।
কংগ্রেসের কিছু মহলে বহুল প্রচারিত একটি তত্ত্বের মত, ওয়াংচুক এবং সিজেপি নাকি মোদি সরকারের তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’-এর অংশ। উদ্দেশ্য, ‘নিট’ পরীক্ষার অনিয়মের বিষয়টি প্রথম এবং জোরালোভাবে তুলে ধরার রাজনৈতিক কৃতিত্ব যেন কংগ্রেস না পায় তা নিশ্চিত করা। এত অসাধারণ এক দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ কার্যত নেই বললেই চলে! কিন্তু হালে এমন এক সময়, যখন তথ্যের চেয়ে সন্দেহ দ্রুত ‘ভাইরাল’ হয়, ফলে এ ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বও খুব সহজে গতি লাভ করে।
হাজার-হাজার তরুণ কেন ‘নিট’ প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা নিতে দেরি ও ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকা কর্মজগত নিয়ে ক্ষুব্ধ– সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার বদলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে– যেন আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীদের ‘আসল উদ্দেশ্য’ খুঁজতেই তারা বেশি ব্যস্ত।
সোনম ওয়াংচুকের ঘটনাই ধরুন। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই লাদাখে অধিকতর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন জোরালো হয় এবং একটি পর্যায়ে সহিংসতার ঘটনাও ঘটে। সেই সময় ‘জাতীয় নিরাপত্তা আইন’-এর (এনএসএ) আওতায় তাঁকে আটক করা হয়। ছ’-মাস হাজতবাসের পর মুক্তি মিললেও সোনমকে ঠিক কী কারণে বা কেন আটক করা হল, তার সদুত্তর মেলেনি। ওই সময় বিজেপির অনলাইন প্রচারযন্ত্রের একাংশ তাঁকে কখনও বিদেশি মদতপুষ্ট, কখনও ‘দেশদ্রোহী’, আবার কখনও ‘চিনপন্থী’ বলতেও পিছপা হয়নি। সোনমের বক্তব্যের বাছাই করা অংশ ব্যবহার করে সুবিধাজনক রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করেও সামাজিক মাধ্যমে বিলিয়ে দেওয়া হয়।
এখন আবার দেখুন, সেই একই ব্যক্তিকে কংগ্রেসের কিছু সদস্য গোয়েন্দা ব্যুরোর ‘হাতের পুতুল’ বলে বর্ণনা করছে! অভিযোগ, রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেসের মোদি-বিরোধী প্রচার থেকে জনমত সরিয়ে দিতেই নাকি তাঁকে মাঠে নামানো হয়েছে। একজন একদা ‘চিনপন্থী’ তকমা পাওয়ার পর আবার ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের ‘এজেন্ট’ হিসাবে অভিযুক্ত হওয়ার আশ্চর্য ঘটনা বোধহয় ভারতেই সম্ভব।
এই পরস্পরবিরোধী অভিযোগই রাজনৈতিক সন্দেহপ্রবণতার অযৌক্তিকতাকে স্পষ্ট করে। এখানে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। প্রায় দু’-দশক ধরে আমি সোনম ওয়াংচুক-কে চিনি। ২০০৮ সালে প্রথম তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়, যখন শিক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণে পথপ্রদর্শক কাজের জন্য সিএনএন-আইবিএন তাঁকে ‘রিয়েল হিরো’ সম্মানে ভূষিত করে।
অভিযোগ, রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেসের মোদি-বিরোধী প্রচার থেকে জনমত সরিয়ে দিতেই নাকি তাঁকে মাঠে নামানো হয়েছে। একজন একদা ‘চিনপন্থী’ তকমা পাওয়ার পর আবার ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের ‘এজেন্ট’ হিসাবে অভিযুক্ত হওয়ার আশ্চর্য ঘটনা বোধহয় ভারতেই সম্ভব।
সেদিন দর্শকাসনে উপস্থিত ছিলেন আমির খানও। (পরে তিনি অভিনয় করেন ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবিতে, যেটি অনেকের মতে ওয়াংচুকের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হলেও– নির্মাতারা সেই দাবি অস্বীকার করেছেন) বছরের পর বছর আমি দেখেছি– শিক্ষা, উন্নয়ন ও লাদাখের ভবিষ্যৎ নির্মাণে ওয়াংচুক নিজেকে কীভাবে ঢেলে দিয়েছেন নিঃস্বার্থভাবে। হতেই পারে, তাঁর সমস্ত মতের সঙ্গে হয়তো প্রত্যেকে সহমত নয়, তা তো জরুরিও নয়। কারণ গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিই তো এই স্বীকৃতি যে– মতভেদ রাষ্ট্রদ্রোহ বা বেইমানের সমার্থক নয়। এবং সেজন্যই আবার সেই অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠে আসে। যে-ব্যক্তি এক সময় ‘ম্যাগসাইসাই’ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন এবং রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে প্রশংসিত হয়েছেন, তিনি হঠাৎ করে কীভাবে ‘দেশদ্রোহী’, আবার কখনও ‘সরকারি এজেন্ট’ হয়ে ওঠেন?
বিদ্রুপ আরও প্রকট হয় যখন মনে পড়ে, নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং একাধিকবার প্রকাশ্যে ওয়াংচুকের কাজের প্রশংসা করেছেন। ২০২৩ সালের মার্চে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ‘এক্স হ্যান্ডল’-এ ওয়াংচুক ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের ছবি পোস্ট করে শিক্ষা, অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে তাঁদের অবদানের প্রশংসা করেছিলেন। ৩ বছর পর, ‘নিট’ বিতর্কে জবাবদিহির দাবি এবং সরকারের শিক্ষানীতির সমালোচনায় ওয়াংচুক অন্যতম মুখ হয়ে ওঠার ফলে সেই প্রশংসা কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে। সংলাপের জায়গা নিয়েছে সন্দেহ।
আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হল–
নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং একাধিকবার প্রকাশ্যে ওয়াংচুকের কাজের প্রশংসা করেছেন। ২০২৩ সালের মার্চে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ‘এক্স হ্যান্ডল’-এ ওয়াংচুক ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের ছবি পোস্ট করে শিক্ষা, অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে তাঁদের অবদানের প্রশংসা করেছিলেন।
‘লেহ স্বায়ত্তশাসিত হিল ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল’ (The Leh Autonomous Hill Development Council) প্রথমে ওয়াংচুকের ‘হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অফ অল্টারনেটিভস, লাদাখ’-এর (হিয়াল) জন্য এক ১০০০ বেশি কানাল (১ একর অর্থাৎ প্রায় ৮ কানাল) জমি ইজারা দেওয়ার অনুমোদন দেয়। হিমালয়ের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের লক্ষ্যে গড়ে ওঠা এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের সেই ইজারা গত আগস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘প্রক্রিয়াগত বিলম্ব’-এর কারণ দেখিয়ে বাতিল করা হয়। লাদাখে অনেকেরই ধারণা, স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনে ওয়াংচুকের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠায় তঁার প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করা হয়েছে। ফল দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।
আসলে ভিন্নমত যখন গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ হিসাবে নয়, হয়ে ওঠে শত্রুতার প্রকাশ, তখন এমনটাই ঘটে। যারা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে, তারা ভীতি প্রদর্শন কিংবা চরিত্রহননের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ কিংবা নাগরিক সমাজের কর্মী– রাষ্ট্রক্ষমতার কঠোর ব্যবহারের অভিযোগ থেকে খুব কমজনই রেহাই পেয়েছেন।
অন্যদিকে, কংগ্রেসও যেন নিজের অনিশ্চয়তার ফাঁদে আটকা পড়ে খাবি খাচ্ছে। সরকারের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা– যা কংগ্রেসের মূল দাবি– তার সঙ্গে হালের আন্দোলনের ভাবগতিক অনেকাংশে মিলে গেলেও সোনম-সিজেপির আন্দোলনকে স্বাগত জানানোর বদলে দলের একাংশ এই স্বাধীন প্রতিবাদকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের চোখে দেখতে বদ্ধপরিকর। দলের একাংশের ধারণা, ‘সিজেপি’ আদতে ‘আম আদমি পার্টি’-র একটি প্রক্সি সংগঠন, কারণ এর প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের এক সময় ‘আপ’-এর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। কংগ্রেসের উদ্বেগ পুরোপুরি অযৌক্তিক এমন নয়। ২০১১ সালের আন্না হাজারে আন্দোলনের স্মৃতি এখনও কংগ্রেসকে তাড়া করে বেড়ায়। বিজেপির নীরব সমর্থনপুষ্ট সেই আন্দোলনই অবশেষে আম আদমি পার্টির উত্থানের পথ প্রশস্ত করে ইউপিএ সরকারের পতন ত্বরান্বিত করে। বহু দিন ধরে মোদি সরকার ‘সিজেপি’কে কেবল সামাজিক মাধ্যমের একটি বিচ্ছিন্ন কৌতূহল হিসাবে হাস্যস্পদ করে তুলেছিল। এই সপ্তাহে ছাত্র আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ার পর সেই সরকারই নড়েচড়ে বসেছে।
ইতিহাসের ছায়া দীর্ঘ। কিন্তু ইতিহাস কারাগারে যেন পরিণত না হয়। যে আন্দোলন ধারাবাহিকভাবে সমালোচিত শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতাগুলোকেই সামনে আনছে, তার থেকে দেশের প্রধান বিরোধী দল দূরে থাকবে কেন? কেবলমাত্র কয়েকজন সংগঠকের রাজনৈতিক অতীত অনিশ্চিত বলে তরুণদের সঙ্গে সংলাপ এড়িয়ে যাওয়ার যুক্তি কি আদৌ রয়েছে!
‘সিজেপি’-র একাধিক সদস্যের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত আলাপচারিতা বলছে, তাদের চালিকাশক্তি দলীয় রাজনীতি নয়; বরং ব্যবস্থার প্রতি গভীর হতাশা। তারা হয়তো অনভিজ্ঞ, আদর্শবাদী, কখনও কিছুটা অগোছালো, রাজনৈতিকভাবেও অপরিণত। কিন্তু তারা আসলে কী বলতে চাইছে, তা শোনার চেয়ে তাদের কোনও না কোনও রাজনৈতিক দলের ‘এজেন্ট’ বলে দাগিয়ে দেওয়াই যেন অনেক সহজ। সেটাই বড় দুঃখের।
১২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর মোদি সরকার ক্রমেই একটি ধারণায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে– যেখানে ভিন্নমতকে হয় উপেক্ষা করা যায়, নয়তো দাবিয়ে রাখা হয়। সমালোচক ও প্রতিবাদকারীরা কখনও ‘শত্রু’, কখনও ‘ষড়যন্ত্রকারী’। অথচ অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলি অধরা থেকে যায়। কেন্দ্রীয় দৃষ্টিতে, ‘সিজেপি’ বিদেশি মদতপুষ্ট ‘অসন্তুষ্ট’দের আর-একটি উদ্যোগ, যার লক্ষ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর গড় দুর্বল করা। আর, কংগ্রেসের সমস্যা ভিন্ন। সর্বত্র অদৃশ্য ষড়যন্ত্রের আতঙ্ক তাদের হয়তো সেই তরুণ প্রজন্মের থেকেই দূরে ঠেলে দেবে, যাদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করতে চায় দল।
ভারতের তরুণরা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের দাবার ঘুঁটি হয়ে থাকার চেয়ে অনেক ভাল কিছুর দাবিদার। তারা প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগে বিলম্ব, ভেঙে পড়া সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা ও সংকুচিত কর্মসংস্থানের সুযোগের স্পষ্ট ছবি চায়। তারা এমন সরকার চায়, যাদের কানে কথা পৌঁছয়; এমন বিরোধী দল চায়, যারা নেতৃত্ব দিতে জানে। এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চায়, যেখানে প্রকৃত জনরোষের জবাব সন্দেহ নয়, সহমর্মিতা।
তাই ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ কখনও নিরাপদ রাজনীতির আশ্রয়স্থল হতে পারে না। গণতন্ত্র তখনই বিকশিত হয়, যখন প্রতিটি আন্দোলনকে গোপন চক্রান্তের চশমা দিয়ে না দেখে; ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতাপ্রত্যাশী– উভয় পক্ষই ‘অস্বস্তিকর সত্য’-র মুখোমুখি হওয়ার সাহস দেখাতে পারে। কম সন্দেহ। বেশি জবাবদিহি। ভারতের তরুণ নাগরিকদের এতটুকু প্রাপ্য ন্যায্য, প্রয়োজন।
(মতামত ব্যক্তিগত)
