shono
Advertisement
Mid-day Meal

মিড-ডে মিল, শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাবার ও বিকল্প সম্ভাবনার দরজা

শিশুদের পুষ্টিকর খাবার যদি একই সঙ্গে হাজার হাজার মায়ের হাতে কাজ, কৃষকের উৎপাদনের ন্যায্য বাজার এবং সমাজের সর্বস্তরের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে, তা কি জনমুখী নীতি নয়?
Published By: Kishore GhoshPosted: 02:12 PM Jul 27, 2026Updated: 02:40 PM Jul 27, 2026

মিড-ডে মিল কর্মসূচিকে স্থানীয় কমিউনিটি কিচেনমুখী করা কি অধিকতর কাম‌্য কার্যকর বিকল্প হতে পারত? শিশুদের পুষ্টিকর খাবার যদি একই সঙ্গে হাজার হাজার মায়ের হাতে কাজ, কৃষকের উৎপাদনের ন্যায্য বাজার এবং সমাজের সর্বস্তরের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে, তা কি জনমুখী নীতি নয়? লিখছেন শেখর সাহা

Advertisement

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সদ্য ঘোষিত বাজেটে ‘প্রধানমন্ত্রী পোষণ’ বা মিড-ডে মিল কর্মসূচিকে নতুন রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উপর থেকে খাদ্য সংগ্রহ, রান্না, হিসাবরক্ষণ এবং প্রশাসনিক দায়িত্বের বড় অংশ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাতেই হয়।

দীর্ঘ দিন ধরে বহু প্রধান শিক্ষক ও সহযোগী শিক্ষক-শিক্ষিকা অভিযোগ করে এসেছেন– পাঠদান ছেড়ে তাঁদের খাদ্যশস্য সংগ্রহ, রান্নার তদারকি, হিসাবনিকাশ, বিল, পরিদর্শন এবং প্রশাসনিক কাজে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। তবে এই ইতিবাচক পদক্ষেপের মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন সামনে এসেছে। রাজ্য সরকার ‘ইসকন’-এর সহায়তায় কেন্দ্রীভূত নিরামিষ খাবারের কথা বলেছে। ‘ইসকন’ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সমাজসেবামূলক ও খাদ্য বিতরণকারী সংস্থা হিসাবে বহু জায়গায় সফলভাবে কাজ করেছে, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু একটি সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্প পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশ্নটি কোনও নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে নয়, বরং রাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থানকে ঘিরে। ভারতের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতার যে আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছে, তার আলোকে সরকারি প্রকল্প এমন একটি কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হওয়াই অধিকতর কাম্য, যা কোনও ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত নয়।

মিড-ডে মিলের মূল ‘লক্ষ্য’ কেবল শিশুদের ক্ষুধা নিবারণ করা নয়, বরং তাদের দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি ও রক্তাল্পতা দূর করে একটি সুস্থ মানবসম্পদ গড়ে তোলা। ‘জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা ৫’ (NFHS 5) অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তাই এই কর্মসূচির খাদ্যতালিকা নির্ধারণের ভিত্তি হওয়া উচিত খঁাটি পুষ্টিবিজ্ঞান এবং স্থানীয় অঞ্চলের চিরাচরিত খাদ্যাভ্যাস, কোনও নির্দিষ্ট মতাদর্শ নয়। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ডিম একটি উচ্চমানের ‘সম্পূর্ণ প্রোটিন’, যাতে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সবক’টি অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন বি ১২ এবং ভিটামিন ডি থাকে।

খাদ্যের গুণগত মান, সতেজতা ও সুরক্ষার দিক থেকেও স্থানীয় স্তরের রান্না মেগা কিচেনের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য ও বৈজ্ঞানিক।

তাই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বাদের গ্রহণযোগ্যতা বিচার করে খাদ্যতালিকায় সয়াবিনের মতো উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের পাশাপাশি ডিমের মতো প্রাণিজ প্রোটিনের উপস্থিতি বজায় রাখা শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ সুরক্ষিত করতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় পড়ে রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীভূত ‘মেগা কিচেন’-এর চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত বিকল্প হতে পারে ব্লক বা গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন স্থানীয় ‘কমিউনিটি কিচেন’ গড়ে তোলা। রাজ্যের হাজার হাজার গ্রামীণ মহিলা ইতিমধ্যেই স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কর্মরত। মিড-ডে মিলের রান্না ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যদি বিকেন্দ্রীকৃত পদ্ধতিতে এই নারী শক্তির হাতে তুলে দেওয়া যায়, তবে গ্রামীণ মহিলাদের একটি বিরাট অংশের নিয়মিত আয়ের স্থায়ী উৎসও তৈরি হবে। এটি সরাসরি গ্রামীণ নারী ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করবে এবং প্রান্তিক পরিবারগুলির অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করতে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করবে।

স্থানীয় ‘কমিউনিটি কিচেন’-এর আর-একটি বড় দিক হল– গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন ও স্থানীয় বাজারের সক্রিয়তা। কেন্দ্রীভূত বড় রান্নাঘরগুলি সাধারণত দূরবর্তী কোনও কর্পোরেট বা পাইকারি বাজার থেকে একযোগে টন টন কাঁচামাল কেনে, যার সুবিধা স্থানীয় কৃষকরা পায় না। পক্ষান্তরে, বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থা চালু হলে চাল, ডাল, মরশুমি টাটকা শাকসবজি, ফল ও ডিম সরাসরি স্থানীয় ক্ষুদ্র চাষি, হাঁস-মুরগি খামারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। এর ফলে গ্রামীণ বাজারে অর্থের জোগান বাড়বে, কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কমবে,
যা সমগ্র গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্বনির্ভর করে তুলবে।

খাদ্যের গুণগত মান, সতেজতা ও সুরক্ষার দিক থেকেও স্থানীয় স্তরের রান্না মেগা কিচেনের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য ও বৈজ্ঞানিক। মেগা কিচেনে সাধারণত ভোর রাতে বা আগের দিন রান্না করা খাবার দূরদূরান্তের বিদ্যালয়ে পাঠানোর জন্য দীর্ঘ পথ পরিবহণ করতে হয়, যা পশ্চিমবঙ্গের মতো চরম আর্দ্র ও গরম আবহাওয়ায় খাবার নষ্ট হওয়া বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। এর বিপরীতে স্থানীয় কমিউনিটি কিচেন থেকে মাত্র আধ ঘণ্টা বা এক ঘণ্টার মধ্যে সম্পূর্ণ গরম, টাটকা এবং পুষ্টিকর খাবার ছাত্রছাত্রীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে পরিবহণ বাবদ বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও যাতায়াত খরচও সম্পূর্ণ বঁাচানো সম্ভব হবে, যা মিড-ডে মিলের পুষ্টির মান আরও বাড়াতে পুনর্ব্যবহার করা যাবে।
একটি কেন্দ্রীভূত ‘মেগা কিচেন’ ব্যবস্থা দূরবর্তী কোনও এক বন্ধ পরিকাঠামোয় পরিচালিত হওয়ায় সেখানে সাধারণ মানুষের সরাসরি প্রবেশাধিকার থাকে না, ফলে রান্নার উপাদানগুলির গুণমান বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উপর দৈনন্দিন নজরদারি চালানো অভিভাবকদের পক্ষে অসম্ভব।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের অভিজ্ঞতা দেখায়, স্থানীয় অংশগ্রহণভিত্তিক ব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে অধিক কার্যকর।

পক্ষান্তরে, বিকেন্দ্রীকৃত স্থানীয় কমিউনিটি কিচেন মডেলে প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও সামাজিক নজরদারি নিশ্চিত করা অত্যন্ত সহজ। বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিভাবক, স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি এবং স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত প্রতিনিধিরা যে কোনও সময় সরাসরি রান্নাঘরে গিয়ে খাবারের মান পরীক্ষা করতে পারে। কোনও ত্রুটি বা অভাব-অভিযোগ থাকলে তা স্থানীয় স্তরেই অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সংশোধন করা সম্ভব, যা প্রকল্পের জবাবদিহিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে আরও একটি কার্যকর ‘বিকল্প’ হতে পারে স্থানীয় স্বনির্ভর গোষ্ঠীভিত্তিক ‘কমিউনিটি কিচেন’। রাজ্যের হাজার হাজার মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠী ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে। যদি ব্লক বা গ্রাম পঞ্চায়েতভিত্তিক কমিউনিটি কিচেন গড়ে তুলে তাদের হাতে মিড-ডে মিলের দায়িত্ব দেওয়া হয়, এক্ষেত্রে আবারও, একদিকে বিপুল সংখ্যক মহিলার স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে চাল, ডাল, শাকসবজি, ডিম, ফল এবং অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী সরাসরি সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, পরিবহণ ব্যয় কমবে, খাদ্যের সতেজতা বজায় থাকবে এবং বিদ্যালয়, অভিভাবক ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সহজে সামাজিক নজরদারিও নিশ্চিত
করা যাবে।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের অভিজ্ঞতা দেখায়, স্থানীয় অংশগ্রহণভিত্তিক ব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে অধিক কার্যকর। তামিলনাড়ু বহু বছর ধরে ‘কমিউনিটি কিচেন’-এর সফল মডেল অনুসরণ করছে। কেরলে কুডুম্বশ্রী নারী কর্মসংস্থান, পুষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে একসূত্রে বেঁধে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি স্থানীয় সম্প্রদায়কে যুক্ত করে ‘হোম গ্রোন স্কুল ফিডিং’ মডেলের পক্ষে মত দিয়েছে, কারণ এতে শিশুদের পুষ্টির পাশাপাশি স্থানীয় উন্নয়নেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়। কেন্দ্রীভূত রান্নাঘরের কিছু সুবিধা থাকলেও, পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক কাঠামো বিবেচনা করলে স্থানীয় কমিউনিটি কিচেন মডেল অনেক বেশি কর্মসংস্থানমুখী এবং টেকসই বলে মনে হয়। শিশুদের একটি পুষ্টিকর খাবার যদি একই সঙ্গে হাজার হাজার মায়ের হাতে কাজ, কৃষকের উৎপাদনের ন্যায্য বাজার এবং সমাজের সর্বস্তরের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে, তবে সেটিই হবে প্রকৃত অর্থে একটি জনমুখী ও দূরদর্শী নীতি।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক সমাজকর্মী
shekharsms@gmail.com

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement