ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় বাজারে তাদের ভরতুকিপ্রাপ্ত পণ্য নামমাত্র বা শূন্য শুল্কে রপ্তানি করতে চায়। এদিকে, ভারতের কৃষিক্ষেত্র মূলত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের উপর নির্ভরশীল। এখন আমেরিকার কর্পোরেট ও যান্ত্রিক খামারজাত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামলে কোটি কোটি কৃষকের রুটি-রুজি ধ্বংস এবং গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। লিখছেন দীপঙ্কর দাশগুপ্ত।
যন্তর মন্তরে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র বিক্ষোভ সমাবেশ এবং ছাত্র আন্দোলন ঘিরে রাজধানী দিল্লি-সহ দেশ যখন উত্তাল– ঠিক সেই সময় আবার পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান-সহ অন্যান্য রাজ্যের হাজার হাজার কৃষকও তুমুল বিক্ষোভে শামিল। আগামী ২৪ জুলাই প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের চূড়ান্ত সময়সীমা শেষ হচ্ছে। তার আগেই সেই চুক্তি বাতিলের দাবিতে ‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’-র আহ্বানে দিল্লিতে কিষান মহাপঞ্চায়েতে যোগ দিতে আসার পথে দিল্লি-হরিয়ানা সীমান্তে কৃষকদের পদযাত্রা পুলিশ মঙ্গলবার আটকে দেয়।
বাণিজ্য চুক্তি এখনও সই না হলেও বিভিন্ন কিষান ইউনিয়নের আশঙ্কা– প্রচুর ভর্তুকি পাওয়া মার্কিন কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যে আমদানি শুল্ক কমিয়ে ভারতের বাজারে কম দামে সেগুলির ঢোকার রাস্তা খুলে দিলে দেশের চাষি ও পশু পালকেরা প্রতিযোগিতায় টিকতে না-পেরে পথে বসবে। তাদের দাবি, সইসাবুদ করার আগে আমেরিকার সঙ্গে ঠিক কী চুক্তি হতে চলছে তা জনগণকে জানাতে হবে। কারণ, একবার চুক্তি সই হয়ে গেলে শত আপত্তি বা প্রতিবাদ হলেও তা থেকে পিছু হটার সুযোগ কার্যত আর থাকবে না। সুতরাং দেশের চাষি ও পশুপালক-সহ অগুনতি ছোট ব্যবসায়ীর কাছে প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি মৃত্যু পরোয়ানা। স্মরণ করা যেতে পারে, ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সের্জিও গর সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি একেবারে ‘চূড়ান্ত পর্যায়’– প্রায় ৯৯ শতাংশ কাজই হয়ে গিয়েছে, শুধু ১-২ শতাংশ ক্ষেত্রে আলোচনা চলছে।
এই চুক্তি সই নিয়ে ভারত আর তাড়াহুড়ো করছে না বলে যাবতীয় জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত গর এবং কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল দু’জনেই। লক্ষণীয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২,৫০০ কোটি ডলারের ভারতীয় বিনিয়োগ টেনে দিল্লির মার্কিন দূতাবাস রেকর্ড করেছে। আর ৪ বছরের মধ্যে অর্থাৎ আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক লেনদেনের বহর ৫০ হাজার কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার ‘লক্ষ্যমাত্রা’ রয়েছে। তাহলে দেশের মানুষের স্বার্থরক্ষার তোয়াক্কা না করে ভারত আর আমেরিকা কি তলে তলে এই শুক্রবারের মধ্যেই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি সেরে ফেলতে চায়? আর তা যদি সত্যিই হয় তাহলে তো ‘ফেয়ারলাইফ’, ‘ল্যাক্টএড’, ‘অরগ্যানিক ভ্যালি’, ‘দ্য এ২ মিল্ক কোম্পানি’, ‘প্রেইরি ফার্মার্স’ ইত্যাদি মার্কিন ব্র্যান্ডের দুধ, গুঁড়ো দুধ বা মাখন, পনির ইত্যাদি আরও অন্যান্য ডেয়ারি প্রোডাক্টে অচিরেই ছেয়ে যাবে শপিং মল, পাড়ার মুদির দোকান।
অবশ্য এটিও খেয়াল রাখতে হবে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘ দিন ধরেই এক কৌশলগত দ্বিমুখী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলেছে।
অ্যামাজন, ব্লিনকিট, সুইগি ইনস্টামার্ট-সহ নানা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম খুললে এখনই দেখা যাচ্ছে ‘ওয়াশিংটন রেড ডিলিশাস’, ‘পিঙ্ক লেডি’ বা ‘গ্র্যানি স্মিথ’ ব্র্যান্ডের আমেরিকার আপেল। এরপর আমদানি শুল্ক কমিয়ে দিলে বা তুলে দিলে আমদানি করা সস্তার মার্কিন আপেল ফেলে ক্রেতারা কি কাশ্মীর বা সিমলার আপেল কিনবে? এছাড়াও আমন্ড, আখরোট, টিনজাত খাবার, ফ্রোজেন হাঁস-মুরগি কিংবা টার্কির মাংস, জেনেটিকালি মডিফায়েড সয়াবিন ও ভুট্টার নানা পণ্যও এন্তার ঢুকে পড়বে ভারতীয় বাজারে। দেশি জিনিস ফেলে বিদেশি জিনিস অঁাকড়ে আমাদের খাদ্যাভ্যাসও পাল্টে যাবে। ভারতের বিরাট ভোগ্যপণ্যের বাজার ধরতে আমেরিকা বহু দিন ধরে উঠে পড়ে লেগেছে। এখন শুধু ঝোপ বুঝে কোপ মারার সুযোগের অপেক্ষা।
অবশ্য এটিও খেয়াল রাখতে হবে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘ দিন ধরেই এক কৌশলগত দ্বিমুখী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলেছে। প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে সমন্বয় থাকলেও দুই দেশের অর্থনৈতিক লেনদেন মৌলিক নীতিগত সংঘাতের কারণে আটকে রয়েছে। বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে ২৪ জুলাইয়ের ‘ডেডলাইন’ যত ঘনিয়ে এসেছে, দু’-পক্ষের আলোচনা তত তীব্র হয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে গভীর কাঠামোগত মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। কারণ, চুক্তি স্বাক্ষর এখনও আটকে রয়েছে এক জটিল গোলকধঁাধায়। সাম্প্রতিক মাসগুলিতে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (USTR) জেমিসন গ্রিয়ারের দিল্লি সফরের পরেও কিন্তু কোনও চূড়ান্ত দিনক্ষণ ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি। তাহলে ওয়াশিংটনের দ্রুত চুক্তি সম্পাদন করার তাগিদ থাকলেও, নয়াদিল্লি কি বিচক্ষণতার সঙ্গে অত্যন্ত মুনশিয়ানার সঙ্গে আদতে কঠোর অবস্থান নিয়ে জাতীয় ‘লক্ষণরেখা’ বা রেড লাইনগুলি বজায় রাখতে পারছে? এই মুহূর্তে সেই প্রশ্নই মুখ্য।
ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যবসাকেন্দ্রিক ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বাণিজ্য নীতির বিপ্রতীপে রয়েছে ভারতের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং গ্রামীণ ভোটারদের স্বার্থরক্ষার বাধ্যবাধকতা। সুতরাং ওয়াশিংটনের চাপের কাছে নয়াদিল্লি কতটা মাথা নোয়ায় সেদিকেই থাকবে সকলের নজর। দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া এই অচলাবস্থা কেবল শুল্কের হার নিয়ে কোনও সাধারণ বিরোধ নয়; এটি ভিন্ন দু’টি অর্থনৈতিক মডেলের মধ্যে অন্তর্নিহিত লড়াই– একদিকে বাজারচালিত বিশ্বব্যাপী রফতানি আধিপত্য, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় পরিচালিত কৃষিনির্ভর স্বাবলম্বিতা অর্জনের প্রশ্ন। টেকনিকাল দিক থেকে চুক্তিটি প্রায় চূড়ান্ত হলেও মূলত তিনটি প্রধান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে মার্কিন ও ভারতীয় স্বার্থের সংঘাতের কারণে চূড়ান্ত দস্তাবেজে সই হচ্ছে না বলেই জানা যাচ্ছে। ভারতের মূল দাবি হল, মার্কিন বাজারে অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের (যেমন, চিন বা ভিয়েতনাম) তুলনায় ভারতীয় পণ্য যাতে বাড়তি শুল্ক সুবিধা পায়। একই সঙ্গে ভারত এমন একটি আইনি নিশ্চয়তা চাইছে যাতে চুক্তি স্বাক্ষরের পর মার্কিন প্রশাসন একতরফাভাবে কোনও নতুন কর বা লেভি চাপাতে না পারে। ওয়াশিংটন এই দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দিতে এখনও নারাজ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের বিশাল বাজারে তাদের ভরতুকিপ্রাপ্ত ডাল, সয়াবিন, বাদাম, এবং দুগ্ধজাত পণ্য নামমাত্র বা শূন্য শুল্কে রফতানি করতে চায়।
ট্রাম্প প্রশাসনের একতরফা ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পারস্পরিক শুল্ক নীতির কার্যকারিতাকে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলায় ওয়াশিংটনের নীতিগত ধারাবাহিকতা নিয়ে ভারতের মনে সংশয় তৈরি হয়েছে। আইনি অনিশ্চয়তার কারণে মার্কিন প্রশাসন দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক হ্রাসের প্রতিশ্রুতি কতটা বজায় রাখতে পারবে, তা নিয়ে ভারতীয় আমলারা সন্দিহান। এর উপর আবার ওয়াশিংটন সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের ‘উদ্বৃত্ত শিল্প সক্ষমতা’ (Excess Industrial Capacity) এবং ‘জোর করে খাটানো’ (Forced Labour)-র বিনিময়ে পণ্য উৎপাদনের অভিযোগ এনে ভারতের উপর ৩০১ ধারা অনুযায়ী ১২.৫% পর্যন্ত শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে রেখেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বিমুখী নীতি– একদিকে বাণিজ্য চুক্তির টোপ এবং অন্যদিকে শুল্কের ভয় দেখানো– দিল্লির আলোচকদের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে। এদিকে ম্যানিলায় আয়োজিত এশীয় দেশগুলির বিদেশমন্ত্রীদের সম্মেলনের ফঁাকে জনৈক উচ্চপদস্থ মার্কিন কূটনীতিক মন্তব্য করেছেন, ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির নথিপত্র তৈরি আছে। শুধু ৩০১ ধারা নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে এই সপ্তাহে তদন্ত শেষ হলে অনেক জটিলতা কেটে যাবে এবং আগামী ৩-৪ মাসের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হবে। সংবাদ সংস্থা রয়টার্স বুধবার এই খবর জানিয়েছে। অর্থাৎ, সেই মার্কিন কূটনীতিকের কথা সত্যি হলে ধরে নিতে হয়, আগামী শুক্রবারের মধ্যে চুক্তি হচ্ছে না এবং আমেরিকার সঙ্গে দর কষাকষির আরও কিছুটা সময় পাবে ভারত। দিল্লি সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারে সেটাও দেখার। আমেরিকার তৈরি ‘বাণিজ্যিক ফঁাদে’
পা দিলে ভারতের বেশ কিছু অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং কৌশলগত ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়তে পারে। বিভিন্ন কৃষক গোষ্ঠী তো সেই আশঙ্কাই প্রকাশ করছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের বিশাল বাজারে তাদের ভরতুকিপ্রাপ্ত ডাল, সয়াবিন, বাদাম, এবং দুগ্ধজাত পণ্য নামমাত্র বা শূন্য শুল্কে রফতানি করতে চায়। ভারতের কৃষিক্ষেত্র মূলত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের উপর নির্ভরশীল। আমেরিকার কর্পোরেট ও যান্ত্রিক খামারজাত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামলে ভারতের কোটি কোটি কৃষকের রুটি-রুজি ধ্বংস হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। শুধু তাই নয়, মার্কিন প্রশাসন ভারতের পেটেন্ট আইনের নমনীয়তা এবং জেনেরিক (Generic) বা সুলভ মূল্যের জীবনদায়ী ওষুধ তৈরির নীতির ঘোর-বিরোধী।
মার্কিন বহুজাতিক ওষুধ সংস্থাগুলির ‘একচেটিয়া অধিকার’ (Data Exclusivity) মেনে নিলে ভারতের ফার্মা শিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে, যা দেশের এবং সমগ্র দরিদ্র বিশ্বের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে বিপন্ন করবে। গুগল্, মেটা, অ্যামাজনের মতো মার্কিন সংস্থাগুলি চায় ভারত যেন ‘ডেটা লোকালাইজেশন’-এর কঠোর নিয়ম শিথিল করে এবং ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স (Equalization Levy) প্রত্যাহার করে নেয়।
দিল্লির উচিত পরিস্থিতি যাচাই করে পদক্ষেপ করা। আর সেই প্রসঙ্গে এটিও বলা দরকার, ভারতকে আমেরিকার উপর একক নির্ভরতা কমাতে হবে।
ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের ডিজিটাল ডেটা যদি অবাধে মার্কিন সার্ভারে চলে যায়, তবে তা ভারতের সার্বভৌমত্ব, নাগরিক নিরাপত্তা এবং দেশীয় স্টার্ট-আপ ইকোসিস্টেমের অস্তিত্বকে বিপন্ন করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে যাতে রাশিয়া থেকে সস্তা অপরিশোধিত তেল কেনা ভারত সম্পূর্ণ বন্ধ করে এবং তার বদলে আমেরিকার থেকে চড়া দামে কয়লা ও তরলীকৃত গ্যাস (LNG) আমদানি করে। রাশিয়ার তেলের উপর আমেরিকার গৌণ শুল্ক (Secondary Tariff) ভারতের জ্বালানি সুরক্ষাকে সরাসরি আঘাত করতে চায়,
যা ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থী। মার্কিন ফঁাদে পা না দিতে হলে নয়াদিল্লির উচিত ওয়াশিংটনের কোনও তাড়াহুড়ো বা চাপের কাছে মাথা নত না করে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল অবলম্বন করা। মনে রাখতে হবে, আগামী নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসের অন্তর্বর্তী নির্বাচন। তাতে ট্রাম্পের ভরাডুবির সমূহ সম্ভাবনা এবং সেক্ষেত্রে অবশিষ্ট মেয়াদটুকু তিনি থাকবেন ‘লেম ডাক’ প্রেসিডেন্ট হিসাবে।
কাজেই দিল্লির উচিত পরিস্থিতি যাচাই করে পদক্ষেপ করা। আর সেই প্রসঙ্গে এটিও বলা দরকার, ভারতকে আমেরিকার উপর একক নির্ভরতা কমাতে হবে। ইতিমধ্যেই ভারত– ব্রিটেন (UK), ‘ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য অ্যাসোসিয়েশন’ (EFTA), এবং ওমানের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে সফলভাবে চুক্তি কার্যকর করছে। বাণিজ্যিক সম্পর্কের এই বহুমুখীকরণ ভারতের দর কষাকষির ক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া মার্কিন ডলারের একাধিপত্য এবং সুইফট (SWIFT) ব্যবস্থাকে ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার তৈরির বিরুদ্ধে ভারতকে নিজস্ব রুপি-ভিত্তিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং ‘ব্রিকস’-এর ‘বিকল্প’ আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এতে ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ভয় দেখানো ভোঁতা হয়ে যাবে। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা ‘সেকশন ৩০১’ ট্যারিফ বা জোর করে শ্রমের কাল্পনিক অভিযোগের বিরুদ্ধে ভারতকে ‘ডব্লিউটিও’-র বিশ্বমঞ্চে আইনি লড়াই লড়তে হবে। আমেরিকার ভিতরেও ট্রাম্পের শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে যে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সেই ফাটলকে ভারতের কূটনীতিবিদদের উচিত কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা।
সবমিলিয়ে ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিকে কেন্দ্র করে ভারতের ঘরোয়া রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে মোদি সরকার এটিকে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্যের একটি নতুন মাইলফলক হিসাবে তুলে ধরতে চাইছে– অন্যদিকে দেশের বিরোধী দল, কৃষক সংগঠন এবং আরএসএস-পন্থী দেশীয় অর্থনৈতিক সংগঠনগুলি এই চুক্তির অন্তরালে ভারতের জাতীয় স্বার্থ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছে।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক সাংবাদিক
dipankar.dg62@gmail.com
