রূপক দিয়ে মুড়ে নারীকে বারবার গৃহবন্দি করে রাখার মানসিকতাই গত কয়েক দশক ধরে প্রতিফলিত। পিতৃতন্ত্রের চিন্তাভাবনার উপর লোক দেখানো প্রলেপ পড়েছে মাত্র, মনোভাব বদলায়নি কিছুই। লিখছেন, মালিনী ঘোষ।
মেয়েদের ‘সুগৃহিণী’ হতে হবে। হতে হবে ‘আদর্শ মা’। তাহলেই তাদের জীবন হবে পূর্ণ। কখনও কাউকে বলতে দেখা যায় না, তোমাকে ‘আদর্শ মেয়ে’ হতে হবে। কারণ সেই আশা বা চাহিদা সবসময়ই থাকে ছেলেদের থেকে। মেয়েদের থেকে সমাজ শুধু চায় একজন ‘আদর্শ স্ত্রী’ ও ‘আদর্শ মা’। সম্প্রতি, উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল আনন্দিবেন প্যাটেল মেয়েদের আইএএস অফিসার হওয়ার আগে একজন ‘পারদর্শী’ বা ‘কুশলী মা’ হওয়ার উপর জোর দিয়েছেন। এই ভাবনাতেই সমাজের গড়পড়তা ধারণার প্রকাশ। আনন্দিবেন জোর দিয়েছেন পারিবারিক মূল্যবোধ, সন্তানের চরিত্রগঠন এবং মায়ের দায়িত্ববোধের উপর। একজন মেয়ের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল ‘আদর্শ মা’ হওয়া।
লক্ষ করলে দেখা যাবে, ভারতের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অনেকেই বরাবরই মেয়েদের দ্বিতীয় সারিতে রাখতে চেয়েছেন। মেয়েদের রূপকের মোড়কে উঁচু স্থানে বসিয়ে বাস্তবে ক্ষমতাহীন করে রাখার প্রবণতা দেখা গিয়েছে সেই উনিশ শতকের শেষ থেকেই। কিছু দিন আগে বিহারের শিক্ষামন্ত্রী মিথিলেশ তিওয়ারির একটি মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক বাধে। অভিযোগ, তিনি মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন। যদিও মন্ত্রী দাবি করেছেন– তিনি আসলে বলেছেন, মেয়েদের রাস্তায় নেমে আন্দোলনের কী প্রয়োজন? সেই সঙ্গেই ওই মন্ত্রী আর-একটি কথা বলেছিলেন। তিনি বলেন: ‘আমাদের ঘরের মেয়েরা আমাদের শক্তি, আমাদের সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি। তাদের অধিকারের জন্য তাদের রাস্তায় নামতে হবে না। তারা এমনিই তাদের অধিকার পাবে। দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব তাদের ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করছে।’
আবার, সম্প্রতি পাঞ্জাবে একটি দুর্ঘটনায় এক গৃহিণীর মৃত্যু-সংক্রান্ত মামলায় শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণও প্রণিধানযোগ্য। আদালত জানায়, সারা দেশে লক্ষ-লক্ষ বধূ সংসারের জন্য যে কাজ করে, তা সেভাবে লক্ষ্যই করা হয় না। তার মূল্যও দেওয়া হয় না। তাই তাকে শুধু ‘হোমমেকার’ বলা উচিত নয়। দেশের ‘নির্মাতা’ বলা দরকার। শীর্ষ আদালতের বক্তব্য, দেশের নির্মাণকারী হিসাবে একজন বধূর ভূমিকা বিবেচনা করে দেখা গিয়েছে, পরিবারের লোকজনকে সেবাদান, সংসারের কাজকর্মের ন্যূনতম মাসিক মূল্য ৩০ হাজার টাকা।
সম্প্রতি, উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল আনন্দিবেন প্যাটেল মেয়েদের আইএএস অফিসার হওয়ার আগে একজন ‘পারদর্শী’ বা ‘কুশলী মা’ হওয়ার উপর জোর দিয়েছেন। এই ভাবনাতেই সমাজের গড়পড়তা ধারণার প্রকাশ।
তবে বাস্তবটা আলাদা। তাই রূপক দিয়ে মুড়ে নারীকে বারবার গৃহবন্দি করে রাখার মানসিকতাই যেন গত কয়েক দশক ধরে প্রতিফলিত হয়েছে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও যখন মেয়েদের শিক্ষা বা রাস্তায় নেমে আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন মনে হয় সেই উনিশ শতক থেকে পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে মেয়েদের অর্জিত স্থান, বোধহয় ষোলো আনা বৃথা গেল। পিতৃতন্ত্রের চিন্তাভাবনার উপর লোকদেখানো প্রলেপ পড়েছে মাত্র, বদলায়নি কিছুই।
শিক্ষার জন্য লড়াই হোক, বা, চাকরির জন্য সংগ্রাম– পিতৃতন্ত্র সবসময় মেয়েদের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই রাখতে চেয়েছে। এখনও যখন বলতে শুনি মেয়েরা ‘আমাদের ঘরের শক্তি’ বা ‘সমৃদ্ধির ভিত্তি’ তখন আবারও মনে পড়ে সেই উনবিংশ শতাব্দীর কথা। সেই সময় জাতীয়তাবাদীরা নারীর অবস্থানের কথা আলোচনা করতে পুরাণ অথবা শাস্ত্র থেকে বিভিন্ন ‘প্রতীক’ বা ‘আইকন’ তুলে আনছিলেন। সতী-সাবিত্রী, বা শক্তি ইত্যাদি প্রতীকের মাধ্যমে তাদের আদর্শ ধাঁচে ফেলার চেষ্টা চলতে থাকে।
ভারতে তাদের শাসনকে বৈধতা দিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ধারণা সেই শাসনকে একটা ‘সভ্য করার প্রয়াস’ হিসাবে নির্মাণ করেছিল। সেই বয়ানে ভারতের সমাজ ও নারীর অবস্থান সম্বন্ধে একটা নেতিবাচক ভাবমূর্তি ছিল। বলা হত, তার বদল করতেই ব্রিটিশদের শাসন ও আধুনিক শিক্ষা দরকার। তার পাল্টা হিসাবে জাতীয়তাবাদী বয়ানে নিজেদের একটা জগৎ তৈরি করা হয়। সেই জগতে মেয়েরা ছিল আধ্যাত্মিকভাবে শক্তিশালী ও উন্নত। জাতীয়তাবাদীরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মোকাবিলা করতে গিয়ে নারী ক্ষমতায়নের তত্ত্ব খাড়া করতে চেয়েছেন। কিন্তু তাঁদের বয়ানে নারীকে কল্পনা বা চেতনার জগতে উচ্চস্থান বা গুরুদায়িত্ব আরোপ করা হলেও বাস্তবে তার ক্ষমতায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সারা দেশে লক্ষ-লক্ষ বধূ সংসারের জন্য যে কাজ করে, তা সেভাবে লক্ষ্যই করা হয় না। তার মূল্যও দেওয়া হয় না। তাই তাকে শুধু ‘হোমমেকার’ বলা উচিত নয়। দেশের ‘নির্মাতা’ বলা দরকার।
এ সময়েই আসে ‘নিউ উওম্যান’ বা ‘নবনারী’-র ধারণা। সেই ধারণায় নারীকে হতে হবে ‘আদর্শ স্ত্রী’, ‘আদর্শ মা’। নতুন করে তৈরি হয় মাতৃত্বের ধারণা। দেশমাতৃকা, মাতৃভূমি, দেবী– এসব অভিধা ওই ধারণার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। কালী, দুর্গার ভাবমূর্তির সঙ্গে বেঁধে তাকে ‘শক্তি’-র রূপক হিসাবে দেখানো হয়। দেখা যায়, এসব অভিধা আরোপ করে মেয়েদের বাড়ির অন্দরমহলে ঠেলে দেওয়া হয়। ‘নব নারী’-র জীবনের দ্বন্দ্বগুলিও সামনে আসে। তাদের শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু স্বাধীনভাবে বাঁচার জন্য সেই শিক্ষাকে কাজে লাগানোর সুযোগ দেওয়া হয় না। ‘দেশমাতা’, ‘মাতৃভূমি’, ‘মায়ের মতো’ নতুন সব সংজ্ঞা মেয়েদের বহির্জগতে রূপক হিসাবে দৃষ্টিগোচর করলেও আদপে প্রকাশ্য কোনও ভূমিকায় তাদের আনা হয় না। তাই উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে যখন ‘ঘর’ ও ‘বাহির’ ক্ষেত্র হিসাবে আলাদা হয়ে গেল, তার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদের সঙ্গে জুড়ে গেল ঘর আর ছেলেদের সঙ্গে জুড়ে গেল বাহির। সেই ধারাবাহিকতা এখনও চলে আসছে। এর প্রতিফলন তখন থেকে চিরবহমান। বিংশ শতাব্দীতে যখন মেয়েদের বাইরের জগতে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা দেখা গেল, তখনও কিন্তু উনিশ শতকের চিন্তারই ছায়া দেখা গিয়েছিল প্রতিটি ক্ষেত্রে।
মেয়েদের শিক্ষার নামে একদিকে দেওয়া হয়েছিল ‘মেয়েলি শিক্ষা’– বিজ্ঞান, প্রযুক্তি শিক্ষা থেকে দূরে শুধুমাত্র ঘর সামলানোর জন্য যতটা প্রয়োজন। আবার, কাজের ক্ষেত্রেও দেখা গেল ‘মেয়েলি কাজ’-এই তাদের ঝোঁক বেশি। পিতৃতান্ত্রিক গঠনের মধ্যে থেকে তারা তখন নিজেরাও সেই ধঁাচে নির্মিত। বাড়িতে সন্তানের, বৃদ্ধদের যত্ন নেওয়া স্ত্রী, মা– যখন বাইরের জগতে কাজে এল তখন বেছে নিল তাদের ‘স্বভাবোচিত’ পেশা। যেমন– শিক্ষকতা, সমাজসেবা বা নার্সিংয়ের মতো যত্নশীল কাজ।
বাইরের জগতে এসেও রইল ‘ঘর’ ও ‘বাহির’-এর পার্থক্য। গান্ধীজি মেয়েদের নিয়ে এলেন স্বাধীনতা সংগ্রামে। সেখানেও ক্রমাগত তিনি মেয়েদের কর্তব্যকে জুড়ে দিলেন তাদের ‘সহজাত’ মায়ের ধর্ম ও স্বভাবের সঙ্গে। ‘ঘর’-এর সঙ্গে। অহিংসা, চরকা কাটা: স্ত্রী-ধন দেশসেবায় সমর্পণ করার ডাক দিলেন। তার সঙ্গে সঙ্গে গান্ধীজি শ্রমের লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনকেও সমর্থন করেন এবং বলতেন, ‘মেয়েরা তাদের গৃহের রানি’। মেয়েদের শিক্ষা দেওয়া মানে একটি পরিবারকে শিক্ষা দেওয়া। নেহরুও বলেছেন, ‘মেয়েদের ক্ষমতায়ন মানে ভারতমাতার ক্ষমতায়ন’। তাই মেয়েদের শিক্ষা বা ক্ষমতায়নকে বারবার পরিবার ও দেশের দায়িত্বের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে দেশের নেতৃত্ব কখনওই তাদের স্বাধীন ভাবে, দায়হীনভাবে বাইরে বেরিয়ে আসতে দেয়নি।
সেই সময় জাতীয়তাবাদীরা নারীর অবস্থানের কথা আলোচনা করতে পুরাণ অথবা শাস্ত্র থেকে বিভিন্ন ‘প্রতীক’ বা ‘আইকন’ তুলে আনছিলেন। সতী-সাবিত্রী, বা শক্তি ইত্যাদি প্রতীকের মাধ্যমে তাদের আদর্শ ধাঁচে ফেলার চেষ্টা চলতে থাকে।
স্বাধীনতার এত বছর পরেও সেই ধারণার বদল চোখে পড়ে না। মেয়েদের সঙ্গে এই পারিবারিক পরিসরকে জড়িয়ে রাখার প্রবণতা হালের ভারতের সরকারি প্রকল্পগুলিরও বৈশিষ্ট্য। যে কোনও দলের ইস্তাহারে সাধারণ ঝোঁক হল বাড়ির মহিলাদের জন্য একটা প্রকল্প, যা মাসিক কিছু টাকা তাদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি পৌঁছে দেবে। তাই ভোটব্যাঙ্কেও মহিলা ভোটারদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে টাকার পরিমাণ নিয়ে প্রতিযোগিতা চলে।
বর্তমানে দেশজুড়ে অন্তত ১৭টি রাজ্যে মেয়েদের জন্য এই ধরনের প্রকল্প চালু আছে। বিভিন্ন রাজ্যে এর যোগ্যতার মানদণ্ড ভিন্ন। দিল্লিতে রয়েছে ‘মহিলা সমৃদ্ধি যোজনা’, অসমে ‘অরুণোদয়’, কর্নাটকে ‘গ্রুহলক্ষ্মী’, তেলেঙ্গানায় ‘মহালক্ষ্মী’, মধ্যপ্রদেশের ‘লাডলি বহেনা যোজনা’, পশ্চিমবঙ্গে আগের সরকারের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’– যেটি নতুন সরকার বরাদ্দ বাড়িয়ে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ করার কথা বলেছে। এই প্রবণতা আরও বেশি করে চোখে পড়ে যখন কোভিডের সময় বাড়িতে পুরুষরাও বন্দি হয়ে পড়ে। পুরুষ যখন ঘরবন্দি অবস্থায় এসব কাজ করতে বাধ্য হয়, তখনই এই দায়িত্বগুলি ‘কাজ’ হিসাবে চোখে পড়ে। মহিলাদের বেতনহীন পারিবারিক কাজের কদর নিয়ে তর্কবিতর্ক ও লেখালিখিও হয়।
তবে এসব প্রকল্পের টাকার পরিমাণ দেখলে বোঝা যায় প্রকল্পের নির্মাতার মহিলাদের এই পারিবারিক তত্ত্বাবধানের কাজকে সেভাবে গুরুত্ব দেয় না। এসব প্রকল্পের ‘লক্ষ্য’ যেহেতু ‘গৃহিণী’, ‘বিবাহিত মহিলা’ ও ‘মা’-রা, তাই বোঝা যায় সরকার বাস্তবে এই ‘বাড়ির কাজ’-কে সম্মান জানিয়ে টাকা দিচ্ছে না। দিচ্ছে যাতে মহিলারা শুধুমাত্র গৃহিণী হয়েই থাকেন। মহিলারা যাতে মহিলা হয়েই থাকেন ও পরিবার সামলান।
পুরুষ যখন ঘরবন্দি অবস্থায় এসব কাজ করতে বাধ্য হয়, তখনই এই দায়িত্বগুলি ‘কাজ’ হিসাবে চোখে পড়ে। মহিলাদের বেতনহীন পারিবারিক কাজের কদর নিয়ে তর্কবিতর্ক ও লেখালিখিও হয়।
এই টাকা শুধুমাত্র একটা সান্ত্বনা পুরস্কার এই পারিবারিক শ্রমের। এই প্রকল্পগুলি বাড়ির পুরুষের ‘বাড়ির কাজ’-এ সমান অবদানের কথা বলে না, তাদের অনুপস্থিতিকে প্রশ্ন না করে শ্রমের লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনকে আরও জোরদার করে। যখন বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক মেয়েদের শ্রমের বিনিময়ে সরকার টাকা দিয়ে প্রতিদান দেয়, তখন বারবার দাগিয়ে দেওয়া হয়, এটাই তাদের স্বাভাবিক ক্ষেত্র, তাদের বাইরে বেরিয়ে কাজ করার প্রয়োজন নেই। ঘরের কাজের জন্য সরকার তাদের টাকা দিচ্ছে। তাই উনবিংশ শতাব্দীর সেই চেনা কৌশলের প্রতিচ্ছবি এখনও সরকারি প্রকল্পগুলির মধ্যে চোখে পড়ে। এখনকার নানা মন্তব্যও সেই না বদলানো চিন্তারই বর্হিপ্রকাশ।
