ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের মধ্যস্থতা করে পাকিস্তান মধ্য এশিয়ায় দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হতে চেয়েছিল। সে গুড়ে বালি। কূটনৈতিক দৌত্যের অন্যান্য দিক সামলাতে গিয়ে নাকানিচোবানি খাচ্ছে। চিন ও ইরানের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ার হাতছানি স্পষ্ট। ভারতের বিদেশনীতিকে সেই সময় তুলোধোনা করেছিলেন যাঁরা, তাঁদেরও নতুন করে ভাবার সময়। লিখছেন কিংশুক বন্দ্যোপাধ্যায়।
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে মধ্যস্থতা করতে গিয়ে পাকিস্তান অগাধ জলে পড়েছে। পরিস্থিতি এমনই যে, যুযুধান কোনও পক্ষের হয়ে সমরে নামলেই, বিপরীত পক্ষের রোষানলে পড়বে ইসলামাবাদ। সংঘাতের শুরুতে ঢাকঢোল পিটিয়ে মধ্যস্থতা করবে বলে আসরে নেমেছিল ইসলামাবাদ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্ন ভোজন করে আসা আসিম মুনিরের হয়তো ধারণা ছিল যে, তিনি আসরে নামলেই যুযুধান দু’-পক্ষই সুড়সুড় করে যুদ্ধ ছেড়ে পাক রাজধানীতে আলোচনার টেবিলে বসে যাবে, আর ইসলামাবাদ এশিয়ার আর-একটি ক্ষমতার ভরকেন্দ্র হয়ে উঠবে। এবং তিনি নিজে হয়ে উঠবেন দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। অর্থাৎ পশ্চিম এশিয়ার এই সাময়িক সামরিক সংঘাতকে পাকিস্তান নিজের কালিমালিপ্ত ভাবমূর্তি উদ্ধারের সোপান রূপে ভেবেছিল।
কিন্তু সে আশা যে গুড়ে বালি, তা অচিরে স্পষ্ট হয়ে গেল। ওয়াশিংটন আর তেহরানের বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠতে লাগল ‘মধ্যস্থতাকারী’ রূপে ইসলামাবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। ইসলামাবাদের প্রথম ঝটকা লাগল, যখন তাদের ছাড়া ওয়াশিংটন-তেহরান প্রাথমিক শান্তিচুক্তি বৈদ্যুতিন মাধ্যমে সারা হয়ে গেল। পরের অবস্থা আরও জটিল। পরিস্থিতি এমনই যে, পাক সেনাকে পরোক্ষে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে হতে পারে। সেটা হলে ইসলামাবাদের বিপদের সম্ভাবনা প্রভূত। ফলে ইসলামাবাদ এই যুদ্ধে মধ্যস্থতা করতে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একই সঙ্গে দিনের আলোর মতো এও স্পষ্ট, এই যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে নয়াদিল্লির নিরপেক্ষ বিদেশনীতি কতখানি সঠিক।
যুদ্ধের শঙ্কায় পাকিস্তান
যুদ্ধের আগুন এখন হরমুজ ছাড়িয়ে লোহিত সাগর আর এডেন উপসাগর সংযোগকারী বাব-এল-মান্ডেব প্রণালীতে ছড়িয়ে পড়েছে। এতেই ঘোরতর সমস্যায় পড়েছে ইসলামাবাদ। কারণ সুয়েজ খালের বাইরে যাওয়ার মুখ রূপে পরিচিত বাব এল-মান্ডেব প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে ইয়েমেনের হুথি জঙ্গি গোষ্ঠী। ইরানি মদতপুষ্ট এই হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সামরিক সংঘাত চলছে। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই সংঘাতের তীব্রতা আরও বেড়েছে। এখন ইসলামাবাদের শঙ্কা: রিয়াধ যদি হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামরিক সাহায্য চেয়ে বসে, তাহলে কী হবে!
সে আশা যে গুড়ে বালি, তা অচিরে স্পষ্ট হয়ে গেল। ওয়াশিংটন আর তেহরানের বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠতে লাগল ‘মধ্যস্থতাকারী’ রূপে ইসলামাবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। ইসলামাবাদের প্রথম ঝটকা লাগল, যখন তাদের ছাড়া ওয়াশিংটন-তেহরান প্রাথমিক শান্তিচুক্তি বৈদ্যুতিন মাধ্যমে সারা হয়ে গেল।
২০২৫ সালে ভারতের কাছে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ জোর ধাক্কা খাওয়ার পরে, সৌদি আরবের সঙ্গে ইসলামাবাদ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। যাতে একটি দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশ সামরিক সাহায্য দেবে। এমনিতেই সৌদির ধর্মীয় স্থান রক্ষার কাজে ও ইয়েমেন সীমান্তরক্ষায় পাক সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকটি ব্যাটেলিয়ন মজুত রয়েছে। নিন্দুকে বলছে, সেই চুক্তিই ইসলামাবাদের এখন মাথাব্যথার কারণ। রিয়াধ যদি পাক বাহিনীকে হুথিদের সঙ্গে যুদ্ধে পাঠানোর কথা বলে, তাহলে!
পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতি কার্যত এখন দু’টি শিবিরে বিভক্ত। ১৯৭৯ সালে ইরানে রাজতন্ত্রকে উৎখাত করে কট্টর শিয়াপন্থীরা ক্ষমতা দখল করলে– উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য সুন্নিপন্থী রাজতন্ত্রগুলি শঙ্কিত হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতি, ১৯৮১ সালে মার্কিন ছত্রছায়ায় সৌদি আরব, ওমান, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার আর বাহরিন– এই ৬টি রাজতান্ত্রিক সুন্নিপ্রধান দেশ ‘গাল্ফ কোঅপারেশন কাউন্সিল’ গঠন করে। জর্ডনের হোসেমাইত রাজবংশ মার্কিনপন্থী হলেও সিরিয়ার হাফেজ-অল-আসাদ ও তার পুত্র বসির অল আসাদ ছিলেন মস্কোপন্থী। অবশ্য ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দামাস্কাসে ক্ষমতা দখল করেছে মার্কিনপন্থী আহমেদ হুসেন অল-শারা। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে তেহরান এখন কার্যত একা। অন্যদিকে ওয়াশিংটনপন্থী ব্লক। কাগজে-কলমে ইরান ও মার্কিন উভয়ের সঙ্গেই দোস্তি রয়েছে। অবশ্য পাক অর্থনীতির যা হাল তাতে এটা না করেও উপায় নেই।
বারুদের স্তূপে পাকিস্তান
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। দক্ষিণ-পশ্চিমে দেশের সর্ববৃহৎ প্রদেশ বালোচিস্তান স্বাধীনতার জন্য রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে নেমেছে। বালোচ লিবারেশন আর্মি রীতিমতো গেরিলা যুদ্ধে নেমেছে পাক সেনার বিরুদ্ধে। উত্তরের পাক-অধিকৃত কাশ্মীরেও বিদ্রোহের আগুন। সেখানে দীর্ঘ দিনের শোষণ আর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষ গর্জে উঠেছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন তথৈবচ, সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের অঙ্গুলিহেলনে চলা শাহবাজ শরিফের সরকারও ঘরেবাইরে নাকাল হচ্ছে তখন। প্রধান বিরোধী নেতা ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দীর্ঘ দিন ধরে অন্তরিন। তথাপি ইমরানের নেতৃত্বাধীন দেশের প্রধান বিরোধী দল পাকিস্তান তেহরিখ-ই-ইনসাফের আন্দোলনে দেশ উত্তাল। এদের দমনের অজুহাতে পাক সেনা আফগানিস্তানেও বারংবার হামলা চালাচ্ছে। তালিবান কেউ না-মারা গেলেও দরিদ্র আফগানদের প্রাণহানি ও সম্পত্তি ধ্বংস হচ্ছে। ফলে কাবুলও পালটা আক্রমণ করছে।
পঙ্গু পাক অর্থনীতি
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বেহাল পাক অর্থনীতি, যার পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে সৌদি-মার্কিন-চিন নির্ভরতা। পরিসংখ্যান বলছে– সৌদি, চিনা ও আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার এই তিনটি ক্রাচনির্ভর– পাক অর্থনীতি। ২০২৬-’২৭ আর্থিক বছরে পাক বাজেট হল ৬৫ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে বৈদেশিক সাহায্য ২৩.৩৮ বিলিয়ন ডলারের। আবার, এই বৈদেশিক সাহায্যের বেশির ভাগটাই আদতে বৈদেশিক ঋণ। অর্থাৎ হিসাবের পাওয়ার তালিকায় যেমন সাহায্য থাকছে, তেমনই খরচের খাতায় রয়েছে এই সাহায্যরূপী ঋণের সুদ মেটানোর দায়। সে অঙ্কটি হল ৮.৫ বিলিয়ন ডলার।
চলতি বছরের এই ২৩.৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ আদতে এসেছে কোথা থেকে? এর মধ্যে রয়েছে সৌদি ঋণ ৪ শতাংশ সুদে ৮ বিলিয়ন ডলার, চিনের ‘স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফ ফরেন এক্সচেঞ্জ’ বা ‘সেফ’-এর ৬ শতাংশের কম সুদে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ, আর সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ।
অর্থনীতিবিদরা আর-একটি হিসাবের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। ৪০৭.৭৯ বিলিয়ন ডলারের (১ বিলিয়ন = ১০০ কোটি) পাক অর্থনীতির ভাঁড়ারে রয়েছে ১৮ বিলিয়ন ডলার বিদেশি মুদ্রা। কিন্তু সেটা আসল গল্প নয়। গল্প হল– এর মধ্যে চলতি বছরের সাহায্যের মোড়কে সৌদি, চিন আর আমিরশাহির কাছ থেকে পাওয়া
১৫ বিলিয়ন ডলারও ধরা হয়েছে এর মধ্যে। আসলে পাকিস্তানের নিজস্ব জমা সাকুল্যে ৩ বিলিয়ন ডলার।
মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১৫০ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৪৬.৫ বিলিয়ন ডলার এসেছে চিন থেকে, ২৩ বিলিয়ন ডলার সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও কাতার থেকে। আর ৫২ বিলিয়ন ডলার এসেছে বিশ্বব্যাঙ্ক, আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্কের মতো মার্কিন প্রভাবিত আর্থিক
সংস্থা থেকে। পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িয়ে আছে। প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ পাক নাগরিক পুরো পশ্চিম এশিয়া জুড়ে ছড়িয়ে আছে, যারা বছরে ৩০ বিলিয়ন ডলার পাঠায় দেশে। পাক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে এরা মূলত অসুবিধায় পড়বে।
পরিস্থিতি এমনই সঙ্গিন যে, বহু সময়ই ইসলামাবাদকে সৌদি, চিনা, মার্কিনদের কাছে আর্থিক সাহায্য নিতে হয়েছে স্রেফ সুদ দেওয়ার জন্য (এর বড় উদাহরণ হল– সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরশাহি তার দেওয়া ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণের মধ্যে ১.৩ বিলিয়ন ডলার ফেরত চাইলে ইসলামাবাদের মাথায় বাজ পড়ে। কোনওরকমে সৌদি ও চিনা ঋণ দিয়ে পরিস্থিতি সামলানো হয়। এখন ওয়াশিংটনের কাছে আরও ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়েছে ইসলামাবাদ। অর্থাৎ ঋণ পরিশোধের জন্য ফের ঋণ নেওয়া।)। ফলে পরিস্থিতি এমন যে, সুদ দিয়ে আর সেনাবাহিনীর ব্যয় মিটিয়ে ইসলামাবাদের হাতে যা পড়ে থাকে– তা দিয়ে উন্নয়নমূলক কাজ চালানো দুঃসাধ্য। পাক অর্থনীতি এখন মূলত বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর, যা স্পষ্ট ছাপ ফেলেছে দেশের বিদেশনীতির উপর।
বিপদ উভয়ত
রয়েছে রাজনৈতিক ও সামরিক বাধ্যবাধকতাও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ওয়াশিংটন তার রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব প্রসার করতে এশিয়ায় যে-ক’টি দেশ বেছে নেয়, তার মধ্যে পাকিস্তান অন্যতম। এর অন্যতম প্রধান কারণ, পাকিস্তানের গণতন্ত্রের ভিত্তিই নড়বড়ে। পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট মুর্শিদাবাদ নবাব বংশের ইস্কান্দার আলি মির্জা সামরিক উর্দি ছেড়ে প্রেসিডেন্ট হলেন। কিন্তু মির্জার অপশাসনে তাঁর নিজেরই গদি টলমল যখন, তখন কুর্সি বাঁচাতে সেনা সর্বাধিনায়ক আয়ুব খানকে মার্শাল ল প্রশাসক করেন।
কিন্তু ক্ষমতায় এসেই আয়ুব খান মির্জাকে পদচ্যুত করে প্রেসিডেন্ট হয়ে বসলেন। সেই প্রথম পাক সেনাবাহিনী সরাসরি ক্ষমতা পেল। সেই শুরু। তারপর হয় তারা সরাসরি ক্ষমতায় থেকেছে, নয়তো রাষ্ট্রচালনার নিয়ন্ত্রক রূপে কাজ করেছে। পাঁচের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে পাঞ্জা কষতে গিয়ে আরব সাগর সংলগ্ন আর্থিকভাবে রুগ্ণ ভঙ্গুর গণতন্ত্রের দেশটির দিকে পেন্টাগন ও সিআইএ-র নজর পড়ে। চূড়ান্ত দুর্নীতিবাজ সেনাকে মদত দিলেই যে দেশটি ওয়াশিংটনের অনুগত হয়ে পড়বে– তা বুঝতেও হোয়াইট হাউসের দেরি হয়নি। ফলে একদিকে যেমন মার্কিন ডলারের বন্যায় জেনারেলরা ফুলেফেঁপে উঠলেন, তেমনই ইসলামাবাদ কার্যত হোয়াইট হাউসের আজ্ঞাবহ হয়ে উঠল। এই ট্র্যাডিশন এখনও চলছে। তাই মার্কিন শিবিরে থাকা রিয়াধের অনুরোধ মুনিরের পক্ষে ফেলা কঠিন।
কিন্তু বিপদ অন্যদিকে। হুথির সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়া মানে সরাসরি তেহরানের রোষের পাল্লায় পড়া। আর তেহরান বলেই রেখেছে যারা মার্কিনিদের পক্ষে যাবে, তারা-ই ইরানি ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানা হবে। তবে এর চেয়েও বড় চিন্তা বেজিংয়ের সরাসরি তেহরানের পিছনে থাকা। পশ্চিম এশিয়ায় মরীচিকার পিছনে দৌড়েছিল ইসলামাবাদ। সংবিৎ আসার পর এখন ফেরার পথ মরিয়া হয়ে খুঁজছে।
(মতামত নিজস্ব)
