shono
Advertisement

Breaking News

Married Women

বিবাহিত মেয়েদের শ্বশুরবাড়ি যাত্রা, বিবাহ-পরবর্তী উদ্বাসন নিয়ে আমরা কি চিন্তিত?

মন কি প্রথা বোঝে? মন কি দূরত্ব মেপে পা ফেলতে পারে?
Published By: Biswadip DeyPosted: 03:25 PM Apr 09, 2026Updated: 03:25 PM Apr 09, 2026

বিবাহিত মেয়েদের শ্বশুরবাড়ি যাত্রা ‘প্রথা’র নামে একপ্রকার উচ্ছেদ। একটা ভূগোল, অসংখ্য ইতিহাস, হাজারো স্মৃতি অঁাকড়ে ধরে এক উদ্বাস্তু-জীবন বেঁচে চলেছে সমস্ত ঘরহারা বিবাহিতারা। নারীর বিবাহ-পরবর্তী উদ্বাসন নিয়ে আমরা কি খুব চিন্তিত? লিখছেন দেবযানী ঘোষ।

Advertisement

পৃথিবীতে এমন মানুষ কি আছে, যে, নিজেকে ভালবাসে না? ভালোবাসা পেতে ভালোবাসে না? নিজের শিকড় অঁাকড়ে ধরতে চায় না? নিশ্চয়ই এমন মানুষ নেই। কিন্তু সেই ভালোবাসার মানুষ, ভালোবাসা, শিকড়কে যদি প্রথার নামে ভুলে থাকতে হয় তাহলে? তাহলে একটা অবুঝ যন্ত্রণা সারা জীবন ধরে বুকের নিচে গোঙাতে থাকে। বলে তোমার কিছু হারিয়ে গিয়েছে। আর ফিরে পাবে না, কিছুতেই পাবে না। চাইলেও যেমন শৈশবে ফিরে যাওয়া যায় না, তেমনই চাইলেও সেই ঘর, সেই উঠোন, সেই পাড়ার মোড়ের জলের কল, সেই ছাদ, বারান্দা তোমার থেকে অনেক দূরে। তুমি ফিরতে পারো। কিন্তু সে ফেরা হবে উদ্বাস্তুর ক্ষণিকের ঘরে ফেরা। তোমার জমিন বদলে গিয়েছে। তোমার অস্তিত্ব বদলে গিয়েছে। সবাই তোমাকে গ্রহণ করবে, আদর করবে, সম্মান করবে হয়তো, কিন্তু ‘নিজের’ করে তুলবে না। মাঝের ফাটলটা কঁাটার মতো বিঁধবে বুকে। আপন যখন পরের মতো আচরণ করে, তখন তা শত্রুর আঘাতের থেকেও বেশি লাগে। মন কি প্রথা বোঝে? মন কি দূরত্ব মেপে পা ফেলতে পারে?

আমি তখন খুব ছোট। পুজোয় বেড়াতে গিয়েছিলাম ছোটপিসির বাড়ি। আমাকে পেয়ে পিসির সেই ক’টা দিন কত আদর! সেই সময় একদিন একজন বৈষ্ণবী এসেছিল গান শুনিয়ে ভিক্ষে করতে। পিসি বারান্দায় দঁাড়িয়েছিল। গান শুনে তাড়াহুড়ো করে এসে জিজ্ঞেস করল– কোন গ্রাম থেকে এসেছ গো? পিসি নাকি সমস্ত ফেরিওয়ালা, ভিখিরিদেরই ডেকে ডেকে জিজ্ঞেস করে, তারা কোন গ্রাম থেকে এসেছে। একটা নাম খুঁজত পিসি। তার ফেলে আসা গ্রামের নাম। যদি কোনও দিন পেয়ে যেত গ্রামের গন্ধ বয়ে আনা কাউকে, তাহলে সেই ভিখিরির কপাল সেদিন খুলে যেত। আবোলতাবোল কথার উত্তর দিয়ে, অনেকটা বেলা কাটিয়ে, বেশ খানিকটা এটা সেটা ভিক্ষা নিয়ে ‘আসি গো মা’ বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিদায় নিত বৈষ্ণবী।

চাইলেও যেমন শৈশবে ফিরে যাওয়া যায় না, তেমনই চাইলেও সেই ঘর, সেই উঠোন, সেই পাড়ার মোড়ের জলের কল, সেই ছাদ, বারান্দা তোমার থেকে অনেক দূরে। তুমি ফিরতে পারো। কিন্তু সে ফেরা হবে উদ্বাস্তুর ক্ষণিকের ঘরে ফেরা। তোমার জমিন বদলে গিয়েছে। তোমার অস্তিত্ব বদলে গিয়েছে।

পিসি জানতে চাইত, গ্রামের সবাই কেমন আছে। শুধু বাবা-মা, দাদা-বউদি, বোনপো-ভাইঝি নয়, কোন পুকুরে এবার কেমন মাছ হয়েছে, কোন গাছে কেমন আম ধরেছে, মরতে বসা বুড়ো ভোলানাথ বেঁচে আছে কি না, হরিপদর মেয়ের বিয়ে হয়েছে কি না ইত্যাদি। তখন মনে হত, এ পিসির নেহাত আবেগ। বাপের গ্রামের মানুষ তাই আলাদা খাতির করছে। এখন বুঝি, সে নেহাতই অর্থহীন প্রলাপ নয়। হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস আর ভূগোলের প্রতি পিসির হাহাকার। জোর করে উচ্ছেদ করে দেওয়া, অন্য করে দেওয়া একটি মেয়ের হৃদয়-মথিত কাতরতা। আমার ফেলে আসা সব একই আছে তো! সেসব এক থাকলে আমিও যে একই থাকি এই বোধকে একবার ছুঁয়ে দেখার অদম্য পিপাসা। মন দিয়ে চেটেপুটে শেষ রসটুকু গলার নিচে পাঠানো, যেখানে একদলা বেদনা আটকে আছে, না পাওয়ার কাতরতা আছে। বিয়ে পিসিকে পর করে দিয়েছে তার জন্মস্থান আর জন্মসম্পর্ক থেকে। অথচ সেই নতুন পরিবেশ তখনও আপন হয়নি। যেমন করে দেশহারা উদ্বাস্তু মানুষ সারাজীবন দেশ খোঁজে, ঠিক তেমনিভাবে আমার পিসি বোষ্টমীর মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি শব্দে তার গ্রামকে খোঁজে, নিজেকে খোঁজে, অস্তিত্বকে খোঁজে, মূলকে খোঁজে।

এ গল্প আমার পিসির শুধু একার নয়, সমস্ত বিবাহিত মেয়েরই। সমস্ত বাংলার মেয়েরই সারা জীবন মনের মধ্যে এক উথাল-পাথাল করা গ্রাম, শহর, পাড়া, মহল্লা, কিছু মানুষ, কিছু সম্পর্ক পাথরের মতো চেপে বসে থাকে। তাকে বঁাচতে হয় এক ভীষণ লুকনো অনতিক্রম্য যন্ত্রণার সমুদ্র বুকে নিয়ে।

বিবাহের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নারীর পতিগৃহে যাত্রা সুনিশ্চিত হয়ে যায়। একত্রবাস, বংশবিস্তার, পরিবার গঠন ইত্যাদি অবশ্য প্রয়োজনীয় কাজগুলি সম্পন্ন হওয়ার জন্য মেয়েদেরই নিজগৃহ ত্যাগ করা ছাড়া অন্য কোনও পন্থার কথা আমাদের পূর্বজরা কল্পনাও করেননি। ভাবার প্রয়োজন অবশ্য হয়নি। কারণ তত দিনে নারী মানুষ থেকে উপকারী উপাদানে পরিণত হয়ে গিয়েছে। ফলে মহতের জন্য ক্ষুদ্রের বলিদান নিয়ে কে-ই বা ভাবে! সেই থেকে এখন পর্যন্ত মেয়েরা উচ্ছেদ বেদনায় ভারাক্রান্ত।

এ গল্প আমার পিসির শুধু একার নয়, সমস্ত বিবাহিত মেয়েরই। সমস্ত বাংলার মেয়েরই সারা জীবন মনের মধ্যে এক উথাল-পাথাল করা গ্রাম, শহর, পাড়া, মহল্লা, কিছু মানুষ, কিছু সম্পর্ক পাথরের মতো চেপে বসে থাকে।

বিচ্ছেদ আর উচ্ছেদের মধ্যে পার্থক্য আছে। বিচ্ছেদে পুনরায় মিলনের এবং উত্তরণের ক্ষীণ হলেও সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু উচ্ছেদ অপরিবর্তনীয়। উচ্ছেদ হয় শিকড় থেকে। টান পড়ে মূলে। আবার সে উচ্ছেদ যদি হয় অন্যের ইচ্ছায় (Forced Displacement)। এই উচ্ছেদের আগে অবশ্য দীর্ঘ প্রস্তুতি থাকে, যাতে মেয়েটি ধীরে ধীরে তাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে পারে। উচ্ছেদ-বেদনাকে তার একান্ত ব্যক্তিগত দুর্বলতা বলে গ্রহণ করে নিতে পারে। তাতে ব্যথা একটু কমে বটে। বিয়ের দিন থেকে নিজের বাড়ি হয়ে যায় বাপের বাড়ি, ভাইয়ের বাড়ি। কাগজে কলমে নাম বদলে যায়, পরিচয় বদলে যায়, ঠিকানা বদলে যায়। কিন্তু যে ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক, পারিবারিক পরিমণ্ডলকে এতদিন সগর্বে নিজের বলে জানা ছিল হঠাৎ করে তা অন্যের হয়ে গেল।

প্রাথমিক থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির অধিকার। কেন্দ্র থেকে পরিধি। কিন্তু এই পরিবর্তন তো বাহ্যিক। নতুন কিছুকে পাওয়ার জন্য পুরনোকে ছেড়ে দিতে হবে শুধু মেয়েদেরই। কিন্তু ছাড়া কি যায়? না কি তাকে দাবিয়ে দুমড়িয়ে-মুচড়িয়ে তালা চাবি দিয়ে বন্ধ করে মনের এক নিভৃত চোরা কুঠুরিতে বন্দি করে দেওয়া হয়? প্রত্যাশা করা হয় তারা জেগে না উঠুক। কিন্তু একান্তে তো তারাই জেগে ওঠে। বার বার জেগে ওঠে। বাকি সারা জীবনটা ধরে জেগে থাকে।

বিয়ের দিন থেকে নিজের বাড়ি হয়ে যায় বাপের বাড়ি, ভাইয়ের বাড়ি। কাগজে কলমে নাম বদলে যায়, পরিচয় বদলে যায়, ঠিকানা বদলে যায়। কিন্তু যে ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক, পারিবারিক পরিমণ্ডলকে এতদিন সগর্বে নিজের বলে জানা ছিল হঠাৎ করে তা অন্যের হয়ে গেল।

১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজন মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উদ্বাসন। মানুষের স্মৃতিতে সেই উদ্বাসন বহুস্তরীয় অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। তা নিয়ে আমরা কত কথা বলি। কিন্তু নারীর বিবাহ পরবর্তী উদ্বাসন নিয়ে খুব কি চিন্তিত? তাদের মানসিক কষ্টকে আমরা কি ব্যবস্থার স্বার্থে স্বাভাবিক বলেই ধরে নিয়েছি? ‘পরের ধন’ মেয়ের আসল জায়গা শ্বশুরবাড়ি। সেটাই তার বাড়ি, ঘর, পরিচয়। সবটাই ঠিক করে দিল অন্য মানুষ। একা করে দিল তাকে হঠাৎ। অন‌্যান্য সমস্ত লিঙ্গ-পরিচয়জনিত সমস্যাগুলির পাশাপাশি যুক্ত হল উচ্ছেদ-বেদনা। একে বলা যায় ‘Inner Diaspora’। দেশ না ছেড়েও নিজ জায়গায় ভিন্ন। একটা ‘আদারনেস’। মনে হতেই পারে মেয়েটি ফিরে এসে কয়েকদিন তার বাবা-মা, ভাই-বোনের কাছে থাকুক, তাহলেই মিটে গেল। কষ্ট কমলে চলে যেতেই পারে। গল্প শেষ।

কিন্তু গল্পের দ্বিতীয় পর্বের এখান থেকেই শুরু যে। কিছু পাখিদের মধ্যে একটা নিয়ম আছে। যদি কোনও কারণে কোনও পাখির বাচ্চা তার বাবা মার সঙ্গচ্যুত হয় এবং তাকে কোনও মানুষ যদি ছুঁয়ে দেয় তাহলে সেই বাচ্চাকে শত কষ্ট হলেও তারা আর গ্রহণ করে না। সামনে মরে যেতে দেখবে, কিন্তু গ্রহণ করবে না। বিয়েতে নাম, পরিচয়, গোত্র পরিবর্তন করে মেয়েটিকে দান করা হয়ে গিয়েছে। সে আর বাপের বাড়ির কেউ নয়। যদি বা আসে, আসবে অতিথি হয়ে। আদর বদলে গিয়েছে সম্ভ্রমে। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত যত্নের মধ্যে একটা অপরত্বের অস্বস্তি আছে। মা জিজ্ঞেস করে একা এলি কেন? পাড়া প্রতিবেশী বলে বাড়ি কবে যাবে? তার নিজের ঘরটা কবেই দখল হয়ে গিয়েছে। উঠোনটায় তাকে একবারও না জানিয়ে কতগুলো নতুন পাথর বসানো হয়েছে। আগে এই পরিবারের সব সিদ্ধান্তে সে ছিল একটা কোথাও। এখন ‘তোর শ্বশুরবাড়িতে কত চাপ, তাই আর জানাইনি তোকে কিছু!’ গোছের কথাগুলি চিৎকার করে বলে দিচ্ছে তুমি ‘আউটসাইডার’, তোমাকে জানানোর প্রয়োজন নেই। এই পরিবারের গণ্ডির ভিতর তার মা আছে, বাবা আছে, বিবাহিত ভাই আছে, ভাইয়ের বউ-বাচ্চা আছে, সবাই আগের মতোই আছে। তারা সবাই মিলে এখন একটা বৃত্ত। মেয়েটি এখন সেখানে একমাত্র ‘অতিরিক্ত’। তাকে উচ্ছেদ করা হয়েছে প্রথার নামে। তার এখন বাড়ি, পরিচয় অন্য।

শ্বশুরবাড়ি থেকে যখন কোনও মেয়ে বাপের বাড়ির এলাকায় আসে, তার মনে একাধারে আনন্দ আর দুঃখ। আনন্দ কারণ সেই গলি, রাস্তা, বাগান, জানলা তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এদের দেখলেই সে সেই সব অতীতে ফিরে যায়, রোমাঞ্চ জাগে। আর দুঃখ কারণ এ সব আর তার নেই। সবই হয়তো একরকম আছে, সেই শুধু তাদের আর কেউ নয়। তার স্মৃতি, বেড়ে ওঠার প্রতিটি মুহূর্ত, তার হয়ে ওঠার অণু-পরমাণু, যেগুলি ছড়িয়ে আছে এই ভৌগোলিক পরিসরে– সেখান থেকে বিযুক্তি মানে তো তার আর ইতিহাস, ভূগোল রইল না। সে রইল না। অথচ বাড়ি, পুকুর, গাছ, উঠোন, বারান্দা, জানালা, সামনের রাস্তা এ সবের সঙ্গে অন্তত আঠারো বছরের হাজারো মুহূর্তের আত্মার সম্পর্ক। সেই সম্পর্ককে টান মেরে ছিঁড়ে ফেলতে চাইলেই কি ফেলা যায়? বরং ব্যথা এক বিকৃত রূপ নিয়ে বুকে জমে থাকে। একটা ভূগোল, অসংখ্য ইতিহাস, হাজারো স্মৃতি অঁাকড়ে ধরে এক উদ্বাস্তু-জীবন বেঁচে চলেছে সমস্ত ঘরহারা বিবাহিত মেয়েরা। এর অন্যথার কথা কয়েক হাজার বছর ধরে কেউ ভাবলেন না কেন?

(মতামত নিজস্ব)

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement
toolbarHome ই পেপার toolbarup মহানগর toolbarvideo শোনো toolbarshorts রোববার