তেল আমদানির জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের উপর বিশ্বের অন্য বহু দেশের মতো ভারতও অনেকটা নির্ভরশীল। তবে কূটনীতিতে এগিয়ে পাকিস্তান।
প্রশ্নের মুখে 'বিশ্বগুরু'-র ভারতের গুরুত্ব। ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইজরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে নানা মহল থেকে ভারতকে 'মধ্যস্থতা' করার অনুরোধ করা হয়েছিল। ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশ, এমনকী ইরানের তরফেও ভারতের উপর আস্থা রাখার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। কিন্তু আমেরিকা, বলা ভালো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চটানোর ভয়ে সে-পথে হাঁটেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার উপর 'বন্ধু' ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের রসায়ন তো ছিলই। মাঝখান থেকে পুরো ক্ষীরটাই খেয়ে গেল চিরশত্রু পাকিস্তান। কূটনীতির মাঠে তারা চুটিয়ে ঝোড়ো ব্যাটিং করে গেল। দর্শকাসন থেকে বসে তা দেখতে হল নয়াদিল্লিকে।
বহু বছর ভারতকে এমন বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়নি। কার্যত ইসলামাবাদের কাছে গোল খেল দিল্লি। বিরাট কূটনৈতিক হারে মোদির বিদেশনীতি এখন প্রশ্নের মুখে।
বস্তুত, ইরান এখনও পাকিস্তানকে 'বিশ্বাসযোগ্য' সঙ্গী বলে মনে করে না। কিন্তু বহু শীর্ষনেতার মৃত্যুর পর যুদ্ধ বন্ধের একটা পথ তাদের দরকার ছিলই। অন্যদিকে, যে 'বেইজ্জতি' এই যুদ্ধে ট্রাম্পকে সহ্য করতে হয়েছে, তা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজেছেন তিনিও। সেখানেই 'প্রতিদান' দিয়েছে পাকিস্তান।
ইরানের তরফেও ভারতের উপর আস্থা রাখার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। কিন্তু আমেরিকা, বলা ভালো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চটানোর ভয়ে সে-পথে হাঁটেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মাঝখান থেকে পুরো ক্ষীরটাই খেয়ে গেল চিরশত্রু পাকিস্তান।
প্রথমত, তাদের অনুরোধে ভারতকে চাপ দিয়ে 'অপারেশন সিঁদুর' বন্ধ করেছিলেন ট্রাম্প। সেই কৃতজ্ঞতার রেশ ছিল। দ্বিতীয়ত, ভারতকে চাপে রাখতে ট্রাম্প যে ইসলামাবাদকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, তা এখন আর গোপন নয়। পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, সেনা সর্বাধিনায়ক আসিম মুনিরকে যেভাবে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে আপ্যায়ন করেছেন, তাতেই তাঁর ইঙ্গিত স্পষ্ট। ইরান যুদ্ধে কার্যত আমেরিকার 'দূত' হিসাবেই কাজ করেছে পাকিস্তান। ফলে ট্রাম্পের থেকে ভবিষ্যতে আরও নানাবিধ সুবিধা পাওয়ার দরজা ইসলামাবাদের সামনে খুলে গেল। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে দিল্লির বহুমুখী সম্পর্ক রয়েছে। তাই দিল্লির মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া উচিত ছিল, যাতে ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের এই মুহূর্তে তাদের একেবারে অনুপস্থিত মনে না হয়। কিন্তু সেই সুযোগ দিল্লি হেলায় হারিয়ে কিছুটা কোণঠাসা হয়েছে।
আরও একটি প্রশ্ন রয়েছে। তেল আমদানির জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের উপর বিশ্বের অন্য বহু দেশের মতো ভারতও নির্ভরশীল। উপসাগরীয় দেশগুলির জোট বহু ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক বা সামরিক টানাপোড়েনের সময় পাশে থেকেছে ইসলামাবাদের। এবারের কূটনৈতিক দৌত্য সফল হোক বা ব্যর্থ, সাময়িক হোক বা দীর্ঘমেয়াদি, ওই দেশগুলির সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা কিন্তু আরও বৃদ্ধি পাবে।
দিল্লির মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া উচিত ছিল, যাতে ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের এই মুহূর্তে তাদের একেবারে অনুপস্থিত মনে না হয়। কিন্তু সেই সুযোগ দিল্লি হেলায় হারিয়ে কিছুটা কোণঠাসা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট সারা বিশ্বেই বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। সব দেশই চাইছে, দ্রুত সংঘর্ষ বন্ধ হোক। স্থিতি আসুক তেলের বাজারে। সেই পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদের ভূমিকা 'সদর্থক' হিসাবেই দেখা হবে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ও সবচেয়ে বড় প্রতিবেশীর এমন উত্থান স্বাভাবিকভাবেই ভারতের অস্বস্তি বাড়াতে চলেছে। এরপরও কি 'বিশ্বগুরু' নীরব ও হতোদ্যম থাকবেন?
(মতামত ব্যক্তিগত)
