ভারতে বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি নতুন নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক প্রস্তাবিত সংশোধন ঘিরে যে-বিতর্ক তৈরি হয়েছে, অনেকের মতে তা গণতান্ত্রিক কাঠামোর মৌলিক নীতিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কেন্দ্র বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর নিয়ম আরোপ করতে চাইছে, এমন আগেও দেখা গিয়েছে, কিন্তু এবার যে-পথে হাঁটার ইঙ্গিত মিলছে, তা শুধু কঠোর নয়, বরং অস্বচ্ছ।
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, কোনও সংস্থা বা ব্যক্তি যদি বিদেশি অনুদান গ্রহণের অনুমতি হারায়, তবে তাদের তৈরি সম্পত্তি– স্কুল, হাসপাতাল কিংবা উপাসনালয় একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতে চলে যেতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, এই প্রক্রিয়াটি হবে প্রায় স্বয়ংক্রিয়, কোনও বিচারকের পর্যালোচনা ছাড়াই। অর্থাৎ যে-সরকার অনুমতি দেয়, সেই সরকারই আবার তা প্রত্যাহার করে নিয়ে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। এই ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি যে লঙ্ঘিত হচ্ছে।
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, কোনও সংস্থা বা ব্যক্তি যদি বিদেশি অনুদান গ্রহণের অনুমতি হারায়, তবে তাদের তৈরি সম্পত্তি– স্কুল, হাসপাতাল কিংবা উপাসনালয় একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতে চলে যেতে পারে।
লোকসভায় বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ সংশোধনী বিল ২০২৬ পাস করাতে মরিয়া কেন্দ্র। চলতি মাসের শুরুতে বিলটি সংসদে পেশ হওয়ার পর থেকেই সেটির কয়েকটি ধারা নিয়ে জোরালো আপত্তি তুলেছে বিরোধী দলগুলি। কেন্দ্রের বক্তব্য অবশ্য, দেশের স্বার্থেই এই বিল আনা হয়েছে যাতে বিদেশি অর্থ ভারতে জঙ্গি তৎপরতা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপে ব্যবহার করা না যায়; জনকল্যাণে বিদেশি অর্থ পেতে সরকার কোনও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে না।
‘বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন’ বা ‘এফসিআরএ’-এর ইতিহাসে দেখা যায়, ১৯৭৬ সালে প্রথম চালু হওয়ার পর থেকে এটি ক্রমশ কঠোর হয়েছে। ২০১০ সালে নতুনভাবে প্রণয়ন এবং ২০২০ সালে সংশোধনের মাধ্যমে বিদেশি অনুদান গ্রহণের ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন, যখন সরকার নিজেই পরিকাঠামো, প্রযুক্তি, বিনোদন বা রিয়েল এস্টেটের মতো ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানায়, তখন সমাজকল্যাণমূলক সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে কঠোরতা কেন? আরও উদ্বেগজনক বিষয়, এই আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতার অভাব। সংসদে প্রশ্ন তুলেও অনেক ক্ষেত্রে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ। ফলে সন্দেহ তৈরি হয়, সরকার কি ইচ্ছামতো কিছু সংস্থাকে বিদেশি অনুদান গ্রহণের অনুমতি দিচ্ছে, আর অন্যদের ক্ষেত্রে সীমিত করছে? এই ধরনের বাছাই করা প্রয়োগ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিপন্থী।
সবচেয়ে বড় কথা, কোনও সংস্থা বৈধভাবে বিদেশি অনুদান নিয়ে যে-সম্পদ তৈরি করেছে, তা পরবর্তী কোনও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কেড়ে নেওয়া ন্যায়সংগত নয়। এটি স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থী এবং আইনের শাসনের উপর আঘাত। বর্তমানে বিলটি স্থগিত থাকলেও সরকার যে এই পথে এগতে বদ্ধপরিকর, তা স্পষ্ট। এই প্রেক্ষাপটে বিলটি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন। বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই জরুরি, কিন্তু তা হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
