সরস্বতী পুজো দরজায় করা নাড়ছে। শহরে, গ্রামে বাংলার বাচ্চাদের মধ্যে এবার নাকি সারস্বত ঢেউ অনেক বেশি। এবং চাহিদায় দেখা দিয়েছে নতুন ট্রেন্ড। তারা চাইছে পুতুলের মতো সরস্বতী। কলকাতার কুমোরটুলি বাচ্চাদের মনের ইচ্ছে আঁচ করতে পেরেছে আগে থেকেই। সেখানকার মৃৎশিল্পীরা এই নতুন সরস্বতী স্রোত বা ট্রেন্ডের একটা বাণিজ্যবান্ধব নামও দিয়েছেন। কেউ বলছেন 'কিউট সরস্বতী'। কেউ বলছেন 'ডল' বা 'পুতুল সরস্বতী'। ঘরে ঘরে এই বছর নাকি পুতুল সরস্বতীর প্রতিই বাচ্চাদের মায়ার টান বেশি। খুদে সরস্বতী। ছোট্ট ছোট্ট বাসন্তী রঙের শাড়ি। পুঁচকে হাস। একরত্তি বীণা। বিন্দু-বিন্দু বই। এসব চেনা প্রতীকও আছে
পুতুল সরস্বতীর সঙ্গে। এদের মধ্যে ক্ষুদ্রতম সরস্বতীর দেখা মিলেছে একটি বাদামের খোলার মধ্যে। ওই বাদামের খোলা নাকি পুতুল সরস্বতীর বাড়ি।
ডল সরস্বতী এবং বাদামের খোলার মতো ভঙ্গুর চল'স হাউস, মনে পড়ে যেতে পারে মানুষের সংসারকে ইবসেন তো তাই বলেছিলেন তাঁর ভুবন বিখ্যাত নাটকে। প্রতিমা পুজো, সে যে আকারেই হোক না কেন, একরকমের পুতুল পুজোই তো। ভগবান বা দেব-দেবীকে মানুষের আকারে ভাবতে না না পারলে তাঁদের আমরা ভালোবেসে কাছের করে নিতে পারি না। তাঁদের প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা, মায়া, মমতা, স্নেহ এসব অনুভব করে অনেক দূরের ঈশ্বরকে ঘরের মানুষ করে নিতে পারলে আমাদের যেন একটা নির্ভরযোগ্য আশ্রয় জোটে। ঈশ্বর হয়ে ওঠে মনের মানুষ, নিতাদিনের আত্মীয়।
এদের মধ্যে ক্ষুদ্রতম সরস্বতীর দেখা মিলেছে একটি বাদামের খোলার মধ্যে। ওই বাদামের খোলা নাকি পুতুল সরস্বতীর বাড়ি।
সরস্বতীর কথাই ধরা যাক। তিনি কসমিক শক্তির প্রতীক, যে-শক্তি এই মহাবিশ্বের বুননে রক্ষিত বুদ্ধিমত্তা, যে-শক্তি ধারণ করে আছে এই মহাবিশ্বকে এক বিজ্ঞানসম্মত শৃঙ্খলা, নিয়ম-পদ্ধতির মধ্যে। এইভাবে ভাবলে সেই দেবীকে কি আমরা ঘরের মেয়ে ভেবে লেখাপড়া, পাস-ফেল এসবের সঙ্গে জড়াতে পারি? তার থেকে অনেক সহজ তাঁকে লেখাপড়ার দেবী করে, একটি মুর্তি বানিয়ে পুজো করা এবং স্কুল-কলেজের পাঠ্যবই মূর্তির পায়ের কাছে রেখে প্রার্থনা করা। তবে তাঁকে অবশ্য আমার পুতুল করে রাখি না। প্রার্থনা এবং অঞ্জলির আগে পুরোহিতকে দিয়ে পুতুলের মধ্যে ঐশী প্রাণপ্রতিষ্ঠা করি।
সরস্বতী পুজো বিদ্যাবুদ্ধির আরাধনা থেকে ক্রমেই হয়ে উঠেছিল বঙ্গ কিশোর-কিশোরীর ভরলেন্টাইন'স ডে।
আরাধ্য দেব-দেবীকে নিজের প্রাণের সঙ্গে যুক্ত করার সহজতম পথটি দেখিয়ে গিয়েছেন রামপ্রসাদ তাঁর গানে। তিনি মা কালীকে তাঁর ঘরের মেয়ে ভেবে ভালবেসেছেন। তাঁর গানে প্রাণ ঢেলে ফুটিয়ে তুলেছেন বাৎসল্য রস। শ্রীরামকৃষ্ণর কালী কখনও তাঁর মেয়ে, কখনও তাঁর মা। কালীর সঙ্গে এই সাধকের মা-ছেলের সম্পর্ক। কোনও বিমূর্ততার দূরত্ব নেই এই সম্পর্কে।
সরস্বতী পুজো বিদ্যাবুদ্ধির আরাধনা থেকে ক্রমেই হয়ে উঠেছিল বঙ্গ কিশোর-কিশোরীর ভরলেন্টাইন'স ডে। এবায় নতুন মোচড়, সরস্বতীকে করে তুলল এক সরল, ছোট্ট শিশু, যার ভালবাসায় আছে ছোটদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার অবাধ আনন্দ। পুজো নয়। আছে শৈশব বস্তুতার নির্মলতা। প্রার্থনা নয়। আছে সরস্বতীর সঙ্গে চাহিদাহীন প্রাণের খেলা।
